সন্তানকে সময় দিচ্ছেন তো? অভিভাবকের ব্যস্ততায় একাকী শৈশব
মুফতি আব্দুল্লাহ আল হাদী (এম.এ, ঢাবি), শিশুশিক্ষা ও প্যারেন্টিং গবেষক, চেয়ারম্যান ফিকরাহ
একটি শিশুর জীবনে সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় তার পরিবার। বাবা-মায়ের স্নেহ, ভালোবাসা, সান্নিধ্য ও যত্নের মধ্যেই ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে তার ব্যক্তিত্ব, চিন্তাভাবনা এবং মানসিক জগৎ। অথচ আধুনিক জীবনের ব্যস্ততায় অনেক পরিবারেই শিশুরা প্রয়োজনীয় সময় ও মনোযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। জীবিকার তাগিদে বাবা-মায়ের কর্মব্যস্ততা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসক্তি, পারিবারিক যোগাযোগের ঘাটতি এবং প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাপনের কারণে অনেক শিশুর শৈশব কাটছে একাকিত্বে।
একই ছাদের নিচে থেকেও পরিবারের সদস্যদের মধ্যে তৈরি হচ্ছে দূরত্ব। বাবা-মা ব্যস্ত নিজেদের কাজ নিয়ে, আর শিশুরা সময় কাটাচ্ছে মোবাইল ফোন, টেলিভিশন কিংবা ভিডিও গেমের পর্দায়। বাইরে থেকে সবকিছু স্বাভাবিক মনে হলেও শিশুর মনের ভেতরে জমতে পারে অভিমান, হতাশা ও নিঃসঙ্গতা। প্রশ্ন হচ্ছে, সন্তানের জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছু নিশ্চিত করতে গিয়ে আমরা কি তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চাহিদা, অর্থাৎ নিজেদের সময় ও সান্নিধ্যটুকু দিতে পারছি?
উপহারের চেয়ে বেশি প্রয়োজন বাবা-মায়ের সান্নিধ্য
সন্তানের ভালো ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে বাবা-মা নিরলস পরিশ্রম করেন। ভালো স্কুল, উন্নত পোশাক, পুষ্টিকর খাবার, খেলনা কিংবা আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবস্থা করতে গিয়ে অনেকেই মনে করেন, সন্তানের প্রতি দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছেন। কিন্তু শিশুর চাহিদা কেবল বস্তুগত সুবিধার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তার প্রয়োজন নিরাপত্তাবোধ, ভালোবাসা, স্বীকৃতি এবং মন খুলে কথা বলার মতো একজন আপন মানুষ।
একটি শিশু যখন স্কুল থেকে ফিরে দিনের অভিজ্ঞতা বলতে চায়, কোনো নতুন বিষয় শিখে আনন্দ ভাগাভাগি করতে চায় কিংবা সামান্য কোনো সমস্যায় মন খারাপ করে বসে থাকে, তখন তার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন বাবা-মায়ের মনোযোগ। কিন্তু অনেক সময় কর্মস্থল থেকে ফিরে ক্লান্ত অভিভাবকরা সন্তানের কথা শোনার মতো মানসিক অবকাশ পান না। কেউ ব্যস্ত মুঠোফোনে, কেউ টেলিভিশনে, আবার কেউ পরদিনের কাজের প্রস্তুতিতে।
এভাবে দিনের পর দিন শিশুর সঙ্গে কথোপকথনের সুযোগ কমতে থাকে। একসময় সে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতেও আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারে।
একাকিত্বের প্রভাব পড়ে মানসিক বিকাশে
শৈশব মানুষের মানসিক বিকাশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়। এ সময়ে শিশুর মধ্যে আত্মবিশ্বাস, সামাজিক দক্ষতা, আবেগ নিয়ন্ত্রণ এবং অন্যের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরির সক্ষমতা গড়ে ওঠে। পরিবার থেকে পর্যাপ্ত স্নেহ ও মনোযোগ না পেলে এসব ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, দীর্ঘদিন একাকিত্ব ও আবেগীয় অবহেলার মধ্যে থাকা শিশুর মধ্যে অনিরাপত্তাবোধ, আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি, অতিরিক্ত রাগ, ভয়, উদ্বেগ এবং আচরণগত পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। কেউ নিজের মধ্যে গুটিয়ে যায়, কেউ আবার অল্পতেই বিরক্ত বা আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। কোনো কোনো শিশু মনোযোগের অভাব পূরণ করতে অস্বাভাবিক আচরণও করতে পারে।
বিশেষ করে ছোট শিশুরা সব সময় নিজেদের কষ্ট ভাষায় প্রকাশ করতে পারে না। ফলে তাদের আচরণ, ঘুম, খাওয়াদাওয়া কিংবা পড়াশোনায় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে মানসিক অস্বস্তি প্রকাশ পেতে পারে। অভিভাবকরা এসব লক্ষণকে অনেক সময় দুষ্টুমি কিংবা অবাধ্যতা ভেবে ভুল করেন। অথচ এর পেছনে থাকতে পারে ভালোবাসা ও মনোযোগ পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা।
প্রযুক্তি কি হয়ে উঠছে বিকল্প অভিভাবক?
বর্তমান সময়ে শিশুদের বিনোদন ও অবসর কাটানোর অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠেছে স্মার্টফোন, ট্যাবলেট ও টেলিভিশন। বাবা-মায়ের ব্যস্ততা সামলাতে অনেক পরিবারে শিশুর হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে মোবাইল ফোন। কান্না থামাতে, খাওয়াতে কিংবা নিজের কাজ নির্বিঘ্নে করতে শিশুকে দেওয়া হচ্ছে ভিডিও দেখার সুযোগ।
শুরুতে বিষয়টি সহজ সমাধান মনে হলেও ধীরে ধীরে শিশু পর্দানির্ভর হয়ে উঠতে পারে। দীর্ঘ সময় স্ক্রিনে কাটানোর ফলে তার ঘুম, শারীরিক সক্রিয়তা, মনোযোগ এবং সামাজিক মিথস্ক্রিয়ায় সমস্যা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বয়স অনুযায়ী অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহার ভাষা শেখা ও সামাজিক দক্ষতা বিকাশের সুযোগও কমিয়ে দিতে পারে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, অনেক সময় একই ঘরে বসে বাবা-মা ও সন্তান প্রত্যেকে নিজ নিজ পর্দায় ব্যস্ত থাকেন। ফলে পারিবারিক কথোপকথন, একসঙ্গে খাওয়া, গল্প করা কিংবা খেলাধুলার মতো স্বাভাবিক সম্পর্ক তৈরির সুযোগ কমে যায়।
প্রযুক্তি অবশ্যই প্রয়োজনীয়। কিন্তু তা কখনো বাবা-মায়ের সান্নিধ্য, পারিবারিক সম্পর্ক কিংবা সরাসরি কথোপকথনের বিকল্প হতে পারে না।
মানসম্মত সময়ই সন্তানের বড় প্রাপ্তি
সন্তানকে সময় দেওয়ার অর্থ সারাক্ষণ তার পাশে বসে থাকা নয়। বরং অল্প সময় হলেও সেই সময়টুকু সম্পূর্ণভাবে তার জন্য বরাদ্দ রাখা। প্রতিদিন ২০ থেকে ৩০ মিনিট মনোযোগ দিয়ে সন্তানের সঙ্গে কথা বলা, খেলাধুলা করা কিংবা গল্প শোনার মধ্য দিয়েও সম্পর্কের গভীরতা বাড়ানো সম্ভব।
সন্তানের সঙ্গে সময় কাটানোর ক্ষেত্রে কয়েকটি অভ্যাস গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। যেমন:
- প্রতিদিন অন্তত একবেলা পরিবারের সবাই একসঙ্গে খাবার খাওয়া।
- স্কুল থেকে ফিরে সন্তানের দিনের অভিজ্ঞতা মনোযোগ দিয়ে শোনা।
- প্রতিদিন কিছু সময় মোবাইল ও টেলিভিশন বন্ধ রেখে পারিবারিক কথোপকথন করা।
- ঘুমানোর আগে গল্প বলা কিংবা বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা।
- ছুটির দিনে সন্তানকে নিয়ে বাইরে ঘুরতে যাওয়া বা ঘরেই আনন্দদায়ক কাজে অংশ নেওয়া।
- পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা, ছবি আঁকা, গান কিংবা সৃজনশীল কাজে উৎসাহ দেওয়া।
- সন্তানের ভুল হলে বকাঝকা না করে তার কারণ বোঝার চেষ্টা করা।
এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সন্তানের কথা বলার সময় তাকে বাধা না দেওয়া। তার ছোট ছোট অনুভূতি, আনন্দ, ভয় কিংবা অভিযোগকে গুরুত্ব দিতে হবে। বড়দের কাছে তুচ্ছ মনে হওয়া কোনো ঘটনা শিশুর কাছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
শাসন নয়, প্রয়োজন বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক
সন্তানকে ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে শাসন ও নিয়মকানুনের প্রয়োজন রয়েছে। তবে শাসনের নামে ভয় দেখানো, অপমান করা কিংবা সব সময় অন্যের সঙ্গে তুলনা করা শিশুর মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
অনেক অভিভাবক সন্তানের ফলাফল, পড়াশোনা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে এতটাই উদ্বিগ্ন থাকেন যে তার ব্যক্তিগত পছন্দ, অনুভূতি ও আগ্রহকে গুরুত্ব দিতে ভুলে যান। সন্তান কী হতে চায়, কোন বিষয়টি তার ভালো লাগে, কোথায় সে ভয় পায় কিংবা কী কারণে মন খারাপ করে, এসব জানার চেষ্টা করা জরুরি।
বাবা-মায়ের সঙ্গে সন্তানের সম্পর্ক এমন হওয়া উচিত, যেখানে সে কোনো ভুল করলেও নির্ভয়ে নিজের কথা বলতে পারে। ভুলের জন্য তাকে অপমান না করে বোঝানো এবং ভালো কাজের জন্য প্রশংসা করা প্রয়োজন। এতে শিশুর মধ্যে আত্মবিশ্বাস তৈরি হয় এবং বাবা-মায়ের প্রতি আস্থা বাড়ে।
পরিবারের দায়িত্ব শুধু মায়ের নয়
সন্তানের যত্ন ও মানসিক বিকাশের দায়িত্ব অনেক পরিবারে এখনো মূলত মায়ের ওপর নির্ভরশীল। কর্মজীবী মায়েদের পাশাপাশি গৃহিণীদেরও সংসারের নানা দায়িত্ব সামলাতে হয়। অন্যদিকে বাবারা কর্মব্যস্ততার কারণে সন্তানের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ কম পান।
কিন্তু শিশুর সুস্থ বিকাশে মা ও বাবা উভয়ের সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রয়োজন। বাবার সঙ্গে খেলাধুলা, গল্প করা কিংবা দৈনন্দিন কাজে অংশ নেওয়া শিশুর জন্য যেমন আনন্দদায়ক, তেমনি মায়ের সঙ্গে সময় কাটানোও তার আবেগীয় নিরাপত্তা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ।
পরিবারের অন্য সদস্যরাও এ ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারেন। দাদা-দাদি, নানা-নানি কিংবা ভাইবোনের সঙ্গে আন্তরিক সম্পর্ক শিশুর সামাজিক দক্ষতা ও পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় করতে সাহায্য করে।
ব্যস্ততার মধ্যেও তৈরি হোক ভালোবাসার সময়
বাস্তবতা হলো, বর্তমান জীবনে কর্মব্যস্ততা পুরোপুরি এড়িয়ে চলা সম্ভব নয়। সংসার পরিচালনা, চাকরি, ব্যবসা কিংবা অন্যান্য দায়িত্বের কারণে অনেক অভিভাবকই পর্যাপ্ত সময় দিতে পারেন না। তবে সময়ের স্বল্পতাকে সন্তানের সঙ্গে দূরত্ব তৈরির অজুহাত বানানো উচিত নয়।
প্রতিদিন সকালে কয়েক মিনিটের আন্তরিক কথোপকথন, কর্মস্থল থেকে ফিরে সন্তানের সঙ্গে কিছুক্ষণ গল্প, রাতে ঘুমানোর আগে তার কথা শোনা কিংবা ছুটির দিনে একসঙ্গে কোনো কাজ করা সম্পর্কের বন্ধন দৃঢ় করতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ হলো, সন্তান যেন অনুভব করে তার কথা শোনার মতো মানুষ পরিবারে আছে।
শিশুরা বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের চাহিদা ও আগ্রহ বদলে যায়। ছোটবেলায় যে সন্তান বাবা-মায়ের কোলে বসে গল্প শুনতে চায়, কৈশোরে সে হয়তো নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি নিয়ে কথা বলতে চাইবে। তাই বয়স অনুযায়ী সন্তানের সঙ্গে যোগাযোগের ধরনও বদলাতে হবে।
শৈশব ফিরে আসে না
সন্তানের শৈশব জীবনের এমন একটি সময়, যা একবার পেরিয়ে গেলে আর ফিরে পাওয়া যায় না। আজ যে শিশু বাবা-মায়ের হাত ধরে হাঁটতে চায়, গল্প শুনতে চায় কিংবা নিজের ছোট্ট আনন্দ ভাগ করে নিতে চায়, একসময় সে বড় হয়ে নিজের জগৎ তৈরি করবে। তখন হয়তো বাবা-মায়ের হাতে অনেক সময় থাকবে, কিন্তু সন্তানের শৈশবের সেই মুহূর্তগুলো আর ফিরে আসবে না।
সন্তানের জন্য অর্থ, সম্পদ ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো এমন একটি পরিবার গড়ে তোলা, যেখানে সে ভালোবাসা পাবে, নিজের কথা বলতে পারবে এবং নিরাপদ বোধ করবে।
মনে রাখতে হবে, সন্তানকে দামি খেলনা দেওয়া যায়, কিন্তু সেই খেলনার সঙ্গে খেলার আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার মানুষটিও তার প্রয়োজন। তাকে ভালো স্কুলে ভর্তি করা যায়, কিন্তু জীবনের প্রথম শিক্ষা আসে পরিবার থেকে। তার জন্য সুন্দর ঘর তৈরি করা যায়, কিন্তু সেই ঘরকে আপন করে তোলে পরিবারের মানুষের ভালোবাসা।
তাই প্রতিটি অভিভাবকের নিজের কাছে প্রশ্ন রাখা প্রয়োজন, সন্তানের জন্য এত আয়োজনের মধ্যে তাকে সময় দেওয়ার বিষয়টি কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে? কারণ সন্তানের জীবনে বাবা-মায়ের সবচেয়ে বড় উপহার কোনো দামি জিনিস নয়, বরং তাদের নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, মনোযোগ এবং পাশে থাকার নিশ্চয়তা। আজকের শিশুর জন্য আপনার দেওয়া সময়ই হতে পারে আগামী দিনের আত্মবিশ্বাসী, সংবেদনশীল ও সুন্দর মানুষ হয়ে ওঠার অন্যতম ভিত্তি।
মন্তব্য