মহাবিশ্ব ক্রমেই সম্প্রসারিত হচ্ছে: কোরআনের আয়াত ও আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান
রাতের আকাশে অসংখ্য নক্ষত্র, গ্রহ ও ছায়াপথের দিকে তাকালে মহাবিশ্বের বিশালতা উপলব্ধি করা যায়। কিন্তু এই মহাবিশ্ব কি স্থির, নাকি প্রতিনিয়ত বড় হচ্ছে? আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার হলো, মহাবিশ্ব ক্রমাগত সম্প্রসারিত হচ্ছে। প্রায় ১৪০০ বছর আগে অবতীর্ণ পবিত্র কোরআনের সুরা আয-যারিয়াতের ৪৭ নম্বর আয়াতে আকাশ নির্মাণ এবং তা সম্প্রসারণের একটি তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্য পাওয়া যায়। এই আয়াত, এডউইন হাবলের পর্যবেক্ষণ এবং আধুনিক মহাকাশবিজ্ঞানের আবিষ্কার মানুষের সামনে মহাবিশ্বের সৃষ্টি ও বিস্তৃতি নিয়ে নতুন করে ভাবনার সুযোগ তৈরি করেছে।
মানুষ প্রাচীনকাল থেকেই আকাশের রহস্য জানার চেষ্টা করছে। দিনের সূর্য, রাতের চাঁদ, অসংখ্য নক্ষত্র এবং দূরবর্তী ছায়াপথ মানুষের কৌতূহল বাড়িয়েছে যুগে যুগে। একসময় ধারণা করা হতো, মহাবিশ্ব স্থির এবং এর কাঠামো অপরিবর্তনীয়। কিন্তু বিংশ শতাব্দীতে জ্যোতির্বিজ্ঞানের কয়েকটি যুগান্তকারী আবিষ্কার সেই ধারণা বদলে দেয়। বিজ্ঞানীরা প্রমাণ পান, মহাবিশ্ব শুধু বিশালই নয়, এটি সময়ের সঙ্গে সম্প্রসারিতও হচ্ছে।
এই বৈজ্ঞানিক বাস্তবতার সঙ্গে পবিত্র কোরআনের একটি আয়াতের ভাষাগত ও ভাবগত মিল নিয়ে মুসলিম চিন্তাবিদদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে। সুরা আয-যারিয়াতের ৪৭ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি আকাশ নির্মাণ করেছি আমার ক্ষমতাবলে এবং নিশ্চয়ই আমি এর সম্প্রসারণকারী।’ (সুরা আয-যারিয়াত, আয়াত ৪৭)।
আয়াতটির আরবি অংশে ব্যবহৃত হয়েছে ‘ওয়া ইন্না লামূসিঊন’। আরবি ‘মূসিঊন’ শব্দটি প্রশস্তকারী, সম্প্রসারণকারী কিংবা সামর্থ্যবান অর্থে ব্যাখ্যা করা হয়ে থাকে। অনেক আধুনিক অনুবাদ ও তাফসিরে এখানে মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। তবে আয়াতটির ব্যাখ্যায় প্রাচীন ও আধুনিক তাফসিরের মধ্যে ভাষাগত ও ব্যাখ্যাগত কিছু পার্থক্য রয়েছে। তাই একে আধুনিক মহাকাশবিজ্ঞানের সঙ্গে আলোচনার ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক একটি আয়াত হিসেবে দেখা যুক্তিযুক্ত।
হাবলের পর্যবেক্ষণে বদলে যায় মহাবিশ্বের ধারণা
মহাবিশ্ব সম্প্রসারণের বৈজ্ঞানিক ধারণা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন মার্কিন জ্যোতির্বিজ্ঞানী এডউইন হাবল। ১৯২০-এর দশকে তিনি দূরবর্তী ছায়াপথ নিয়ে পর্যবেক্ষণ চালান। তাঁর গবেষণায় দেখা যায়, অধিকাংশ দূরবর্তী ছায়াপথের আলো লাল বর্ণালির দিকে সরে যাচ্ছে। জ্যোতির্বিজ্ঞানে এই ঘটনাকে বলা হয় ‘রেডশিফট’ বা লোহিত অপসরণ।
লোহিত অপসরণের অর্থ হলো, কোনো আলোক উৎস থেকে আসা আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য বেড়ে যাওয়া। মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের কারণে দূরবর্তী ছায়াপথ থেকে আসা আলো চলার পথে প্রসারিত হয়। ফলে তার তরঙ্গদৈর্ঘ্য দীর্ঘতর হয়ে লাল অংশের দিকে সরে যায়।
১৯২৯ সালে হাবল দূরবর্তী ছায়াপথগুলোর দূরত্ব ও তাদের লোহিত অপসরণের মধ্যে একটি সম্পর্ক তুলে ধরেন। তাঁর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সাধারণভাবে কোনো ছায়াপথ যত দূরে, তার দূরে সরে যাওয়ার বেগও তত বেশি। এই সম্পর্ক পরবর্তী সময়ে ‘হাবলের সূত্র’ নামে পরিচিতি পায়।
তবে মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের তাত্ত্বিক ভিত্তি হাবলের পর্যবেক্ষণের আগেই তৈরি হয়েছিল। ১৯২২ সালে রুশ পদার্থবিজ্ঞানী আলেকজান্ডার ফ্রিডম্যান আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বের সমীকরণ থেকে সম্প্রসারণশীল মহাবিশ্বের গাণিতিক মডেল উপস্থাপন করেন। ১৯২৭ সালে বেলজিয়ামের বিজ্ঞানী ও ধর্মযাজক জর্জ লেমেত্র একই ধরনের ধারণা তুলে ধরেন। হাবলের পর্যবেক্ষণ এসব তাত্ত্বিক ধারণার পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ দেয়।=
মহাবিশ্ব সম্প্রসারণের অর্থ কী?
মহাবিশ্ব সম্প্রসারিত হচ্ছে বলতে সাধারণভাবে বোঝায়, মহাকাশের মধ্যবর্তী দূরত্ব বাড়ছে। অর্থাৎ ছায়াপথগুলো শুধু কোনো নির্দিষ্ট কেন্দ্র থেকে চারদিকে ছুটে যাচ্ছে, বিষয়টি এমন নয়; বরং ছায়াপথগুলোর মধ্যবর্তী স্থান নিজেই প্রসারিত হচ্ছে।
বিষয়টি বোঝার জন্য একটি বেলুনের উদাহরণ দেওয়া যায়। একটি বেলুনের গায়ে কয়েকটি বিন্দু আঁকা হলো। বেলুনে বাতাস প্রবেশ করালে সেটি ফুলে উঠবে এবং বিন্দুগুলোর মধ্যবর্তী দূরত্ব বাড়বে। কোনো একটি বিন্দুকে কেন্দ্র ধরে অন্য বিন্দুগুলো দূরে সরে যাচ্ছে বলে মনে হবে। মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ বোঝাতেও বিজ্ঞানীরা অনেক সময় এই উদাহরণ ব্যবহার করেন। তবে মহাবিশ্বের প্রকৃত জ্যামিতি বেলুনের পৃষ্ঠের মতো নয়।
এই সম্প্রসারণের অর্থ আবার এই নয় যে সৌরজগৎ, পৃথিবী কিংবা পরমাণুর মতো মহাকর্ষ বা অন্যান্য বল দিয়ে আবদ্ধ সবকিছু ক্রমাগত বড় হচ্ছে। মহাকর্ষের প্রভাবে সৌরজগৎ ও ছায়াপথের মতো কাঠামো নিজেদের মধ্যে আবদ্ধ থাকে। সম্প্রসারণের প্রভাব মূলত বৃহৎ মহাজাগতিক দূরত্বে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
বিগ ব্যাং তত্ত্ব ও মহাবিশ্বের সূচনা
মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের আবিষ্কার বিগ ব্যাং তত্ত্বের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, প্রায় ১৩৮০ কোটি বছর আগে মহাবিশ্ব ছিল অত্যন্ত উত্তপ্ত ও ঘন অবস্থায়। এরপর স্থান নিজেই সম্প্রসারিত হতে শুরু করে। সময়ের সঙ্গে মহাবিশ্ব ঠান্ডা হয় এবং ধীরে ধীরে মৌলিক কণা, পরমাণু, নক্ষত্র ও ছায়াপথের মতো কাঠামো তৈরি হয়।
বিগ ব্যাং কোনো নির্দিষ্ট স্থানে সংঘটিত সাধারণ বিস্ফোরণ ছিল না। এটি ছিল স্থানকালের সম্প্রসারণ। মহাবিশ্বের সব স্থান থেকেই এই সম্প্রসারণের ধারণা বোঝা যায়। আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানে মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের পাশাপাশি মহাজাগতিক পটভূমি বিকিরণ এবং হালকা মৌলের প্রাচুর্য বিগ ব্যাং তত্ত্বের গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
১৯৬৫ সালে বিজ্ঞানী আর্নো পেনজিয়াস ও রবার্ট উইলসন মহাজাগতিক পটভূমি বিকিরণ শনাক্ত করেন। এটি প্রাথমিক মহাবিশ্বের উত্তপ্ত অবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অবশিষ্ট চিহ্ন। পরবর্তী সময়ে কৃত্রিম উপগ্রহ ও উন্নত টেলিস্কোপের সাহায্যে এই বিকিরণ নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা হয়েছে। এসব পর্যবেক্ষণ মহাবিশ্বের উৎপত্তি ও বিবর্তন সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের ধারণাকে আরও শক্তিশালী করেছে।
সম্প্রসারণ কি আগের চেয়ে দ্রুত হচ্ছে?
মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ নিয়ে গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার হলো, এর সম্প্রসারণের হার বর্তমানে ত্বরান্বিত হচ্ছে। ১৯৯০-এর দশকের শেষ দিকে দূরবর্তী সুপারনোভা বা বিস্ফোরিত নক্ষত্র পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা এ তথ্য পান। ২০১১ সালে এই আবিষ্কারের জন্য শৌল পার্লমাটার, ব্রায়ান শ্মিট ও অ্যাডাম রিস পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পান।
মহাবিশ্বের এই ত্বরিত সম্প্রসারণের পেছনে কী কাজ করছে, তা এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি। বিজ্ঞানীরা সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হিসেবে ‘ডার্ক এনার্জি’ বা অন্ধকার শক্তির ধারণা ব্যবহার করেন। এটি মহাবিশ্বের শক্তি ও সম্প্রসারণের গতিবিদ্যা বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। তবে ডার্ক এনার্জির প্রকৃত স্বরূপ এখনো গবেষণার বিষয়।
অর্থাৎ মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের বিষয়টি পর্যবেক্ষণ ও গাণিতিক হিসাবের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হলেও এর পেছনের সব রহস্য এখনো উন্মোচিত হয়নি। নতুন নতুন টেলিস্কোপ, মহাকাশযান ও বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রতিনিয়ত এই রহস্যের নতুন দিক তুলে ধরছে।
কোরআনের আয়াত ও বিজ্ঞানের সম্পর্ক
মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ নিয়ে আলোচনায় সুরা আয-যারিয়াতের ৪৭ নম্বর আয়াত বিশেষভাবে আলোচিত হয়। এই আয়াতের ভাষা ও অর্থ নিয়ে মুসলিম গবেষক ও চিন্তাবিদদের অনেকে আধুনিক মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের সঙ্গে সম্পর্ক খুঁজে দেখেন।
তবে এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। কোরআন কোনো জ্যোতির্বিজ্ঞানের পাঠ্যবই নয়। এর প্রধান উদ্দেশ্য মানুষকে সৃষ্টিকর্তার পরিচয়, নৈতিকতা, জীবনবিধান ও সৃষ্টিজগতের নিদর্শন সম্পর্কে চিন্তা করতে উদ্বুদ্ধ করা। তাই বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের সঙ্গে কোরআনের আয়াতের সামঞ্জস্য আলোচনা করতে হলে আয়াতের মূল আরবি শব্দ, প্রেক্ষাপট ও স্বীকৃত তাফসির বিবেচনা করা প্রয়োজন।
প্রাচীন তাফসিরকারদের কেউ কেউ আয়াতটির অর্থ আকাশকে প্রশস্ত করার ক্ষমতা বা মহান আল্লাহর অসীম সামর্থ্যের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। আধুনিক অনেক অনুবাদক ও ব্যাখ্যাকারী সম্প্রসারণের অর্থকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। ফলে আয়াতটি নিয়ে ভাষাতাত্ত্বিক ও ধর্মতাত্ত্বিক আলোচনা এখনো গুরুত্বপূর্ণ।
এখানে বিজ্ঞানের কোনো নতুন আবিষ্কারকে জোর করে কোরআনের আয়াতের সঙ্গে মিলিয়ে ফেলা যেমন সমীচীন নয়, তেমনি মহাবিশ্বের বিশালতা ও সৃষ্টির রহস্য নিয়ে কোরআনের চিন্তাশীল আহ্বানকেও উপেক্ষা করা উচিত নয়। ধর্মীয় ব্যাখ্যা ও বৈজ্ঞানিক প্রমাণের নিজস্ব পদ্ধতি রয়েছে। উভয়কে যথাযথ মর্যাদা দিয়ে আলোচনা করাই ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি।
সৃষ্টিজগতের রহস্য জানার আহ্বান
পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন আয়াতে আকাশমণ্ডলী, পৃথিবী, দিন-রাতের পরিবর্তন এবং সৃষ্টিজগতের নিদর্শন নিয়ে চিন্তা করতে বলা হয়েছে। সুরা আলে ইমরানের ১৯০ নম্বর আয়াতে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টি এবং রাত-দিনের পরিবর্তনের মধ্যে জ্ঞানীদের জন্য নিদর্শন থাকার কথা বলা হয়েছে।
এই আহ্বান মানুষকে পর্যবেক্ষণ, চিন্তা ও জ্ঞান অনুসন্ধানে উৎসাহিত করে। আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানও সেই অনুসন্ধানের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে মানুষ জানতে পেরেছে, দৃশ্যমান মহাবিশ্ব স্থির কোনো কাঠামো নয়; এটি প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে।
এডউইন হাবলের পর্যবেক্ষণ থেকে শুরু করে আধুনিক মহাকাশ টেলিস্কোপের গবেষণা পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা মহাবিশ্বের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে জানার চেষ্টা করছেন। অন্যদিকে কোরআন মানুষকে এই বিশাল সৃষ্টিজগতের দিকে তাকিয়ে স্রষ্টার ক্ষমতা ও প্রজ্ঞা উপলব্ধির আহ্বান জানায়।
সব মিলিয়ে, মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ আধুনিক বিজ্ঞানের অন্যতম প্রতিষ্ঠিত আবিষ্কার। সুরা আয-যারিয়াতের ৪৭ নম্বর আয়াতের আলোচনাও মুসলিম সমাজে এ বিষয়ে গভীর আগ্রহ তৈরি করেছে। তবে এ দুইয়ের সম্পর্ক ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তথ্যের নির্ভুলতা, আয়াতের যথাযথ অর্থ এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণার সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। মহাবিশ্ব যতই সম্প্রসারিত হোক, তার রহস্য জানার মানুষের আগ্রহও ততই বিস্তৃত হচ্ছে। আর সেই অনুসন্ধান মানুষকে প্রতিনিয়ত নতুন জ্ঞান অর্জন ও সৃষ্টিজগত নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে অনুপ্রাণিত করছে।
মন্তব্য