মায়ের শিক্ষাই শিশুর ভবিষ্যতের বুনিয়াদ
শিশুশিক্ষা ও প্যারেন্টিং গবেষক- মুফতি আব্দুল্লাহ আল হাদী [এম.এ, ঢাবি], চেয়ারম্যান- ফিকরাহ
একটি শিশুর জন্মের মধ্য দিয়ে শুধু একটি নতুন প্রাণের আগমন ঘটে না, জন্ম নেয় একটি সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ। সেই ভবিষ্যৎকে সুন্দর, সুশৃঙ্খল ও মানবিক করে গড়ে তোলার প্রথম দায়িত্ব পালন করেন মা। শিশুর জীবনের প্রথম শিক্ষক, প্রথম পথপ্রদর্শক এবং সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য আশ্রয় হলেন মা। জন্মের পর থেকে কথা বলা, হাঁটতে শেখা, আচরণ করা, ভালো-মন্দের পার্থক্য বোঝা, মানুষের সঙ্গে মিশতে শেখা, এমনকি পৃথিবীকে চিনতে শেখার প্রথম পাঠও শিশু মায়ের কাছ থেকেই পায়। তাই বলা হয়, মায়ের শিক্ষাই শিশুর ভবিষ্যতের বুনিয়াদ। একজন শিক্ষিত, সচেতন, নৈতিক ও দায়িত্বশীল মা একটি শিশুকে শুধু ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলেন না, বরং একটি সুন্দর সমাজ ও উন্নত জাতি গঠনের পথও তৈরি করেন।
শিশুর প্রথম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিবার
শিশুর শিক্ষাজীবন বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ থেকে শুরু হয় না, শুরু হয় পরিবারে। আর পরিবারের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকেন মা। শিশুর প্রথম শব্দ উচ্চারণ, প্রথম হাঁটা, প্রথম হাসি কিংবা প্রথম সামাজিক আচরণের পেছনে মায়ের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। শিশু স্বাভাবিকভাবেই অনুকরণপ্রিয়। সে বড়দের কথা, কাজ, আচরণ ও অভ্যাস অনুসরণ করে। মা যদি সত্য কথা বলেন, নিয়ম মেনে চলেন, অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হন এবং মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়ান, তাহলে শিশুর মধ্যেও এসব গুণ বিকশিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
অন্যদিকে, মায়ের আচরণে অসংযম, মিথ্যা, অসহিষ্ণুতা কিংবা নেতিবাচক মনোভাব থাকলে তা শিশুর ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। তাই সন্তানকে ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হলে প্রথমে মাকে নিজের আচরণ ও মূল্যবোধের প্রতি সচেতন হতে হয়।
শিক্ষিত মায়ের গুরুত্ব ও প্রভাব
মায়ের শিক্ষা বলতে শুধু প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি অর্জনকে বোঝায় না। এর মধ্যে রয়েছে জ্ঞান, সচেতনতা, বিবেক, নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ এবং সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা। তবে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা একজন মাকে সন্তান লালন-পালন ও শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে সহায়তা করে।
একজন শিক্ষিত মা শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশ সম্পর্কে সচেতন থাকেন। তিনি শিশুর বয়স অনুযায়ী প্রয়োজন, পুষ্টি, স্বাস্থ্যবিধি ও মানসিক চাহিদা বুঝতে পারেন। শিশুর অসুস্থতা, আচরণগত পরিবর্তন কিংবা মানসিক অস্থিরতা সহজে শনাক্ত করার সক্ষমতাও তাঁর তুলনামূলক বেশি থাকে। পাশাপাশি শিশুর পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ তৈরি, সৃজনশীলতা বিকাশ এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতা বাড়াতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।
শিক্ষিত মা সন্তানকে শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করার জন্য উৎসাহিত করেন না, বরং তাকে যুক্তিবাদী, অনুসন্ধিৎসু ও আত্মবিশ্বাসী হতে শেখান। ফলে শিশুর মধ্যে জ্ঞান অর্জনের আগ্রহ তৈরি হয়, যা ভবিষ্যৎ জীবনে তাকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে।
নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধের শিক্ষা
শিশুর ভবিষ্যৎ শুধু তার শিক্ষাগত যোগ্যতা কিংবা আর্থিক সাফল্যের ওপর নির্ভর করে না। একজন মানুষ কতটা সৎ, দায়িত্বশীল, মানবিক ও বিবেকবান, সেটিও তার জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়। আর এসব গুণের প্রাথমিক বিকাশ ঘটে পরিবারে।
মা সন্তানকে ছোটবেলা থেকেই সত্য কথা বলা, বড়দের সম্মান করা, ছোটদের স্নেহ করা, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, অন্যের অধিকার রক্ষা করা এবং নিজের দায়িত্ব পালন করার শিক্ষা দিতে পারেন। ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধের চর্চার মাধ্যমেও শিশুর মধ্যে শৃঙ্খলা, সহমর্মিতা ও আত্মসংযম তৈরি হয়।
একজন মা যদি সন্তানকে বোঝান যে মানুষের পরিচয় তার অর্থসম্পদ কিংবা সামাজিক অবস্থানে নয়, বরং তার চরিত্র ও কর্মে, তাহলে শিশু মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে শেখে। এই শিক্ষা তাকে ভবিষ্যতে একজন দায়িত্ববান নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়তা করে।
মানসিক বিকাশে মায়ের ভূমিকা
শিশুর শারীরিক বিকাশের পাশাপাশি মানসিক বিকাশও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশুর ভয়, আনন্দ, কৌতূহল, অভিমান ও আবেগ প্রকাশের প্রথম নিরাপদ জায়গা হলো মায়ের সান্নিধ্য। মা যদি সন্তানের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনেন, তার অনুভূতিকে গুরুত্ব দেন এবং ভুল করলে অপমান না করে ভালোভাবে বুঝিয়ে দেন, তাহলে শিশুর মধ্যে আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়।
অনেক সময় শিশুরা পড়াশোনায় ব্যর্থতা, বন্ধুদের সঙ্গে বিরোধ কিংবা পারিবারিক পরিবেশের কারণে মানসিক চাপে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে মায়ের সহানুভূতি ও সহযোগিতা শিশুকে মানসিকভাবে শক্তিশালী করে তুলতে পারে। সন্তানকে অন্যের সঙ্গে তুলনা না করে তার নিজস্ব প্রতিভা ও সামর্থ্য অনুযায়ী এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন।
শিশুর প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর দেওয়া সম্ভব না হলেও তার প্রশ্ন করার আগ্রহকে উৎসাহিত করা উচিত। এতে শিশুর চিন্তাশক্তি, কল্পনাশক্তি ও নতুন কিছু শেখার আগ্রহ বাড়ে।
প্রযুক্তির যুগে মায়ের দায়িত্ব
বর্তমান বিশ্ব প্রযুক্তিনির্ভর। শিশুদের জীবনে মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডিজিটাল বিনোদনের প্রভাব ক্রমেই বাড়ছে। প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার যেমন জ্ঞান অর্জনের সুযোগ তৈরি করছে, তেমনি অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে শিশুর সময় নষ্ট, মনোযোগের ঘাটতি ও নেতিবাচক মানসিক প্রভাবের আশঙ্কাও রয়েছে।
এ ক্ষেত্রে মায়ের সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি। সন্তানকে প্রযুক্তি থেকে সম্পূর্ণ দূরে না রেখে এর ইতিবাচক ব্যবহার শেখাতে হবে। কোন বিষয় দেখা উচিত, কোন তথ্য বিশ্বাসযোগ্য, অনলাইনে অপরিচিত মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের ঝুঁকি কী এবং ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা কেন গুরুত্বপূর্ণ, তা বয়স অনুযায়ী বুঝিয়ে বলা প্রয়োজন।
পাশাপাশি বই পড়া, খেলাধুলা, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো এবং সৃজনশীল কাজে অংশ নেওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। মা নিজেও যদি অপ্রয়োজনীয়ভাবে মোবাইল ফোন ব্যবহারে সময় ব্যয় করেন, তাহলে সন্তানের কাছে ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন কঠিন হয়ে পড়ে।
কন্যাশিশু ও পুত্রসন্তানের সমান গুরুত্ব
একটি শিশুর ভবিষ্যৎ নির্মাণে ছেলে ও মেয়ের মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকা উচিত নয়। কিন্তু সমাজের কিছু প্রচলিত ধারণা ও বৈষম্যের কারণে এখনো অনেক পরিবারে কন্যাশিশুর শিক্ষা ও বিকাশ যথাযথ গুরুত্ব পায় না। এ ক্ষেত্রে মায়ের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একজন সচেতন মা সন্তানকে বোঝাতে পারেন, শিক্ষা, মেধা, যোগ্যতা ও স্বপ্নের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমান অধিকার রয়েছে। কন্যাসন্তানকে আত্মনির্ভরশীল হতে উৎসাহিত করার পাশাপাশি পুত্রসন্তানকেও নারীর প্রতি সম্মান, সমতা ও দায়িত্বশীল আচরণ শেখাতে হবে।
মায়ের কাছ থেকেই একটি শিশু শিখতে পারে যে পরিবারে প্রত্যেকের মতামতের গুরুত্ব রয়েছে এবং গৃহস্থালির কাজ নারী-পুরুষ সবার দায়িত্ব। এ ধরনের শিক্ষা ভবিষ্যতে বৈষম্যহীন সমাজ গঠনে সহায়ক হতে পারে।
মায়ের শিক্ষা থেকে জাতির উন্নয়ন
একজন শিশুর ভবিষ্যৎ শুধু তার নিজের জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়, বরং তা একটি জাতির সামগ্রিক অগ্রগতির সঙ্গেও যুক্ত। আজকের শিশু আগামী দিনের শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী, সাংবাদিক, উদ্যোক্তা কিংবা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত হবে। তাদের চিন্তা, চরিত্র ও কর্মদক্ষতার ভিত্তি তৈরি হয় শৈশবে।
একজন শিক্ষিত ও সচেতন মা সন্তানকে সুশিক্ষা, নৈতিকতা, দেশপ্রেম, মানবিকতা ও দায়িত্ববোধের শিক্ষা দিতে পারলে তার প্রভাব পরবর্তী প্রজন্মেও ছড়িয়ে পড়ে। এভাবেই একটি পরিবার থেকে সমাজ এবং সমাজ থেকে রাষ্ট্রের উন্নয়নের পথ তৈরি হয়।
এ কারণে নারীশিক্ষাকে শুধু নারীর ব্যক্তিগত অধিকার হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি একটি দেশের মানবসম্পদ উন্নয়ন, সামাজিক অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মানসিক বিকাশের অন্যতম শর্ত। যে সমাজ মায়ের শিক্ষা ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে পারে, সে সমাজের উন্নয়নের ভিত্তিও তত শক্তিশালী হয়।
মায়ের শিক্ষা ও সামাজিক প্রতিবন্ধকতা
বাস্তবতা হলো, সমাজের অনেক মা এখনো শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত। দারিদ্র্য, বাল্যবিবাহ, সামাজিক কুসংস্কার, পারিবারিক অসচেতনতা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সীমিত সুযোগের কারণে অনেক নারী প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সম্পন্ন করতে পারেন না। আবার শিক্ষিত হয়েও অনেক মা কর্মব্যস্ততা, পারিবারিক চাপ কিংবা প্রয়োজনীয় সহযোগিতার অভাবে সন্তানকে পর্যাপ্ত সময় দিতে পারেন না।
এসব সমস্যা সমাধানে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে। নারীর শিক্ষার সুযোগ বাড়ানো, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, কর্মজীবী মায়েদের জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরি এবং অভিভাবকত্ববিষয়ক সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। পাশাপাশি মায়েদের জন্য জীবনব্যাপী শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। কারণ শিক্ষা অর্জনের কোনো নির্দিষ্ট বয়স নেই। একজন মা যেকোনো বয়সে নতুন জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করে সন্তানের জীবন গঠনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারেন।
মা শুধু সন্তানের জন্মদাত্রী নন, তিনি তার জীবনের প্রথম শিক্ষক, চরিত্র গঠনের কারিগর এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণের অন্যতম প্রধান পথপ্রদর্শক। মায়ের কাছ থেকে পাওয়া শিক্ষা, ভালোবাসা, শৃঙ্খলা ও মূল্যবোধ শিশুর জীবনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে। তাই একটি শিশুর সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে হলে মায়ের শিক্ষা, সচেতনতা ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
মনে রাখতে হবে, একটি শিশুকে শিক্ষিত করা মানে শুধু তাকে বইয়ের জ্ঞান দেওয়া নয়, বরং তাকে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা। আর এই মানুষ গড়ার প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন মা। যে মায়ের হাতে জ্ঞানের আলো, হৃদয়ে মানবিকতা এবং আচরণে নৈতিকতার প্রতিফলন রয়েছে, তাঁর সন্তানও সুন্দরভাবে বেড়ে ওঠার অনুপ্রেরণা পায়। তাই একটি উন্নত, মানবিক ও সমৃদ্ধ জাতি গঠনের স্বার্থেই মায়ের শিক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ মায়ের শিক্ষাই শিশুর ভবিষ্যতের বুনিয়াদ, আর শিশুর সুন্দর ভবিষ্যৎই একটি জাতির সম্ভাবনাময় আগামী।
মন্তব্য