fbpx fbpx fbpx
দাওয়াতুল ইসলাম ২৪
বুধবার, ০৪, নভেম্বর, ২০২৬ , ২০ কার্তিক ১৪৩৩
কুরআন প্রজেক্টে হাদিয়া দিন

বিদ্যালয়ে ঝরে পড়ছে হাজারো শিশু, দায় কার?

মুফতি আব্দুল্লাহ আল হাদী (এম.এ, ঢাবি), শিশুশিক্ষা ও প্যারেন্টিং গবেষক, চেয়ারম্যান ফিকরাহ 

দারিদ্র্য, পারিবারিক অসচেতনতা, শিক্ষার ব্যয়, বাল্যবিয়ে ও বিদ্যালয়ের নানা সীমাবদ্ধতায় মাঝপথেই থেমে যাচ্ছে অনেক শিশুর শিক্ষাজীবন। যে বয়সে বই-খাতা নিয়ে বিদ্যালয়ে যাওয়ার কথা, সে বয়সে কেউ কাজে যাচ্ছে, কেউ সংসারের দায়িত্ব নিচ্ছে, আবার কেউ হারিয়ে যাচ্ছে শিক্ষাব্যবস্থার বাইরে। শিশুদের ঝরে পড়া শুধু শিক্ষা খাতের সমস্যা নয়, এটি দেশের ভবিষ্যৎ, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও সামাজিক অগ্রগতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

একটি শিশুর হাতে বই তুলে দেওয়া যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার হাতে সেই বই ধরে রাখার সুযোগ নিশ্চিত করাও ততটাই জরুরি। বাংলাদেশে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়লেও বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া সব শিশু শেষ পর্যন্ত পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারছে না। বিভিন্ন আর্থসামাজিক বাস্তবতা, পারিবারিক সংকট ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সীমাবদ্ধতা অনেক শিশুকে শিক্ষাজীবনের মাঝপথে থামিয়ে দিচ্ছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, শিশুদের বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ার জন্য দায়ী কে? পরিবার, সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, নাকি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা?

ঝরে পড়ার পেছনে দারিদ্র্যের নির্মম বাস্তবতা

শিশুদের বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ার অন্যতম বড় কারণ দারিদ্র্য। নিম্ন আয়ের পরিবারের অনেক অভিভাবকের কাছে সন্তানের পড়াশোনার চেয়ে দৈনন্দিন খাবার ও পরিবারের খরচ জোগানো বেশি জরুরি হয়ে ওঠে। ফলে শিশুকে বিদ্যালয়ে পাঠানোর পরিবর্তে কাজে পাঠাতে বাধ্য হন তারা।

শহরের হোটেল, রেস্তোরাঁ, ওয়ার্কশপ, পরিবহন, দোকান, কারখানা ও ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে বহু শিশুকে শ্রম দিতে দেখা যায়। গ্রামাঞ্চলেও কৃষিকাজ, মাছ ধরা, গৃহস্থালি কাজসহ নানা পেশায় যুক্ত হচ্ছে শিশুরা। অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের আয় বাড়ানোর জন্য শিশুর উপার্জনের ওপর নির্ভর করতে হয় অভিভাবকদের।

শুধু বিদ্যালয়ে ভর্তি বা বিনা মূল্যে বই পেলেই শিক্ষার ব্যয় শেষ হয় না। পোশাক, জুতা, যাতায়াত, খাতা-কলম, প্রাইভেট পড়া এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ দরিদ্র পরিবারের জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। এসব ব্যয় বহন করতে না পেরে অনেক অভিভাবক সন্তানকে বিদ্যালয় থেকে সরিয়ে নেন।

শিক্ষার প্রতি অভিভাবকদের অসচেতনতা

শিশুর শিক্ষাজীবন ধরে রাখার ক্ষেত্রে পরিবারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অনেক পরিবারে শিক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতনতা নেই। বিশেষ করে যেসব অভিভাবক নিজেরা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ পাননি, তাদের কেউ কেউ সন্তানের পড়াশোনাকে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করতে পারেন না।

অনেক অভিভাবক মনে করেন, ছোট বয়স থেকেই সন্তান কোনো কাজে যুক্ত হলে পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতি হবে। আবার কেউ কেউ মনে করেন, মেয়েদের বেশি পড়াশোনার প্রয়োজন নেই। এ ধরনের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি শিশুদের শিক্ষাজীবনকে বাধাগ্রস্ত করে।

অন্যদিকে, অনেক কর্মজীবী অভিভাবক সময়ের অভাবে সন্তানের পড়াশোনার খোঁজ রাখতে পারেন না। নিয়মিত বিদ্যালয়ে যাচ্ছে কি না, পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়ছে কি না, কোনো সমস্যায় পড়ছে কি না, এসব বিষয়ে পর্যাপ্ত নজরদারি না থাকায় শিশুরা ধীরে ধীরে পড়াশোনা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

বাল্যবিয়ে থামিয়ে দিচ্ছে কিশোরীদের শিক্ষাজীবন

বাংলাদেশে কিশোরীদের শিক্ষাজীবন বাধাগ্রস্ত হওয়ার অন্যতম কারণ বাল্যবিয়ে। দারিদ্র্য, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা, পারিবারিক চাপ এবং প্রচলিত সামাজিক রীতির কারণে অনেক মেয়েকে অল্প বয়সেই বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয়।

অনেক পরিবার মনে করে, মেয়েকে দ্রুত বিয়ে দিলে সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে এবং পরিবারের দায়িত্ব কমবে। কিন্তু এর ফলে একটি মেয়ের শিক্ষা, ব্যক্তিগত বিকাশ, কর্মসংস্থান ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা সংকুচিত হয়ে যায়।

বিশেষ করে মাধ্যমিক পর্যায়ে ওঠার পর অনেক কিশোরী বিদ্যালয় ছেড়ে দেয়। বিয়ের পর সংসারের দায়িত্ব, মাতৃত্ব এবং সামাজিক বিধিনিষেধের কারণে তাদের পক্ষে আবার পড়াশোনায় ফিরে আসা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে একটি শিশুর শিক্ষাজীবনের সমাপ্তি ঘটে অনেক সময় তার নিজের সিদ্ধান্তের বাইরেই।

বিদ্যালয়ের পরিবেশ ও শিক্ষার মানও দায় এড়াতে পারে না

শিশুদের বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ার দায় শুধু পরিবারের ওপর চাপিয়ে দিলে সমস্যার প্রকৃত কারণ আড়াল থেকে যাবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ, পাঠদানের পদ্ধতি, শিক্ষকদের আচরণ এবং শিক্ষার মানও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

অনেক বিদ্যালয়ে শিক্ষকসংকট, শ্রেণিকক্ষের স্বল্পতা, পর্যাপ্ত শিক্ষা উপকরণের অভাব এবং দুর্বল ব্যবস্থাপনা রয়েছে। কোথাও কোথাও শিক্ষার্থীদের প্রতি শিক্ষকদের অসহিষ্ণু আচরণ, শারীরিক শাস্তি কিংবা অপমানজনক মন্তব্য শিশুদের বিদ্যালয়বিমুখ করে তোলে।

আবার অনেক শিশু শ্রেণি অনুযায়ী পড়াশোনার সক্ষমতা অর্জন করতে পারে না। প্রাথমিক স্তরেই পড়া ও গণিতে দুর্বলতা তৈরি হলে পরবর্তী শ্রেণিতে গিয়ে তারা আরও পিছিয়ে পড়ে। একপর্যায়ে পড়াশোনাকে কঠিন মনে করে বিদ্যালয়ে যাওয়া বন্ধ করে দেয়।

ইউনিসেফ ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৫ সালের বহুমাত্রিক সূচকভিত্তিক জরিপ (এমআইসিএস) অনুযায়ী, ৭ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের মাত্র ৫০ দশমিক ২ শতাংশের মৌলিক পাঠদক্ষতা রয়েছে। একই বয়সী শিশুদের মাত্র ৩৯ দশমিক ২ শতাংশের রয়েছে মৌলিক গণিতের দক্ষতা। অর্থাৎ বিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকলেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিশু প্রয়োজনীয় শিখনদক্ষতা অর্জন করতে পারছে না।

পরিসংখ্যানে উদ্বেগজনক চিত্র

বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষায় ঝরে পড়ার হার কমানোর ক্ষেত্রে অতীতে অগ্রগতি থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে আবার উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের বার্ষিক প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিসংখ্যান ২০২৪ অনুযায়ী, প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার ২০২৩ সালের ১৩ দশমিক ১৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৪ সালে দাঁড়িয়েছে ১৬ দশমিক ২৫ শতাংশে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে এই হার বেড়েছে ৩ দশমিক ১০ শতাংশ পয়েন্ট।

অন্যদিকে, ইউনিসেফ ও বিবিএসের ২০২৫ সালের জরিপে প্রাথমিক বিদ্যালয় বয়সী শিশুদের বিদ্যালয়ের বাইরে থাকার হার ৬ দশমিক ৫ শতাংশ, নিম্নমাধ্যমিক বয়সীদের ক্ষেত্রে ১৩ দশমিক ১ শতাংশ এবং উচ্চমাধ্যমিক বয়সীদের ক্ষেত্রে ৩৩ দশমিক ৯ শতাংশ দেখানো হয়েছে। উচ্চতর শ্রেণিতে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যালয়ের বাইরে থাকা শিশুর অনুপাত বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি বিশেষভাবে ভাবনার।

শিশুশ্রমও এ সংকটের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। একই জরিপে ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী ৯ দশমিক ২ শতাংশ শিশু শিশুশ্রমে যুক্ত থাকার তথ্য উঠে এসেছে। দরিদ্র পরিবারের শিশুদের মধ্যে এই প্রবণতা তুলনামূলক বেশি। ফলে শিক্ষার বাইরে চলে যাওয়া এবং শ্রমে যুক্ত হওয়ার মধ্যে একটি স্পষ্ট সম্পর্ক দেখা যায়।

প্রযুক্তি ও সামাজিক পরিবর্তনের প্রভাব

বর্তমান সময়ে শিশুদের শিক্ষাজীবনে প্রযুক্তির প্রভাবও নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন গেম ও ভিডিও দেখার প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি অনেক শিশুর পড়াশোনার সময় কমিয়ে দিচ্ছে। অভিভাবকদের অসচেতনতা এবং প্রযুক্তি ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণের অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে।

তবে প্রযুক্তিকে পুরোপুরি দায়ী করা ঠিক হবে না। যথাযথ তদারকি ও শিক্ষামূলক ব্যবহারের মাধ্যমে প্রযুক্তি শিশুদের শেখার আগ্রহ বাড়াতেও পারে। প্রয়োজন হলো প্রযুক্তির ইতিবাচক ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং শিশুদের জন্য সুস্থ বিনোদন ও খেলাধুলার সুযোগ তৈরি করা।

দুর্যোগ ও ভৌগোলিক বৈষম্য

বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল, চরাঞ্চল, হাওর ও নদীভাঙনপ্রবণ এলাকার শিশুদের শিক্ষাজীবন তুলনামূলক বেশি অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন কিংবা জলাবদ্ধতায় বিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যায়। অনেক পরিবারের বসতভিটা হারিয়ে অন্যত্র চলে যেতে হয়। ফলে শিশুদের পড়াশোনায় দীর্ঘ বিরতি তৈরি হয়।

দুর্গম এলাকায় বিদ্যালয়ের দূরত্ব, যোগাযোগব্যবস্থার দুর্বলতা এবং নিরাপদ যাতায়াতের অভাবও শিশুদের নিয়মিত উপস্থিতিতে বাধা সৃষ্টি করে। বিশেষ করে প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও সহায়ক শিক্ষাব্যবস্থা না থাকলে তাদের বিদ্যালয়ে টিকে থাকা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।

ঝরে পড়া রোধে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ

শিশুদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখতে হলে প্রথমেই পরিবারগুলোর আর্থিক সংকট বিবেচনায় নিতে হবে। দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি, শিক্ষা উপকরণ, পোশাক, জুতা ও যাতায়াত সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি। শুধু ভর্তি কার্যক্রম বাড়ালেই হবে না, প্রতিটি শিশুর শিক্ষাজীবন শেষ করা পর্যন্ত সহায়তা দিতে হবে।

বিদ্যালয়ে শিক্ষার মান উন্নয়নের পাশাপাশি আনন্দময় ও শিশুবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে হবে। শিক্ষার্থীদের প্রতি শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন বন্ধ করতে হবে। যারা পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়ছে, তাদের জন্য অতিরিক্ত পাঠদান ও বিশেষ সহায়তার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থাকা শিক্ষার্থীদের তালিকা তৈরি করে শিক্ষক, বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি ও স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে তাদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। কেন শিশুটি বিদ্যালয়ে আসছে না, তা খুঁজে বের করে সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে।

বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ, শিশুশ্রম বন্ধ এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার শিশুদের জন্য বিকল্প শিক্ষা কার্যক্রম চালু করাও জরুরি। পাশাপাশি বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনায় অভিভাবকদের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। শিক্ষা কার্যক্রমের পাশাপাশি খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও সৃজনশীল চর্চার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।

দায় কার, সমাধানই বা কোথায়?

শিশুদের বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ার দায় কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নয়। পরিবার, সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা, প্রত্যেকেরই এখানে দায়িত্ব রয়েছে। দারিদ্র্যের কারণে যে বাবা সন্তানকে কাজে পাঠাতে বাধ্য হন, তার সমস্যার সমাধান না করে শুধু অভিভাবককে দায়ী করলে চলবে না। একইভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা, শিক্ষার ব্যয় এবং সামাজিক বৈষম্য উপেক্ষা করেও শিশুদের ঝরে পড়া বন্ধ করা সম্ভব নয়।

রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো প্রত্যেক শিশুর জন্য মানসম্মত, নিরাপদ ও বৈষম্যহীন শিক্ষা নিশ্চিত করা। শিক্ষার বাজেট, শিক্ষক নিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং দরিদ্র পরিবারের জন্য সহায়তা বাড়ানোর পাশাপাশি ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের পুনরায় বিদ্যালয়ে ফিরিয়ে আনার কার্যকর কর্মসূচি নিতে হবে।

একটি শিশুর বিদ্যালয় ছেড়ে দেওয়া মানে শুধু একজন শিক্ষার্থীর পড়াশোনা বন্ধ হওয়া নয়, বরং একটি সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের পথ সংকুচিত হওয়া। আজ যে শিশু দারিদ্র্যের কারণে বই ছেড়ে শ্রমে যুক্ত হচ্ছে, আগামী দিনে তার দক্ষ ও সম্ভাবনাময় নাগরিক হয়ে ওঠার সুযোগও সীমিত হয়ে পড়ছে।

তাই শিশুদের ঝরে পড়া রোধকে কেবল শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব হিসেবে দেখলে হবে না। এটি জাতীয় উন্নয়ন, মানবসম্পদ গঠন এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন। প্রতিটি শিশুর হাতে বই তুলে দেওয়ার পাশাপাশি সেই বই পড়ার পরিবেশ ও সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। কারণ কোনো শিশুই যেন দারিদ্র্য, বৈষম্য কিংবা অবহেলার কারণে শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত না হয়। 

শিশুরা বিদ্যালয় ছাড়ছে কেন, সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার পাশাপাশি তাদের বিদ্যালয়ে ফিরিয়ে আনার দায়িত্বও নিতে হবে সবাইকে। একটি শিশুর শিক্ষাজীবন রক্ষা করা মানে শুধু একটি পরিবার নয়, পুরো দেশের ভবিষ্যৎ রক্ষা করা।বিদ্যালয়ে ঝরে পড়ছে হাজারো শিশু, দায় কার? দারিদ্র্য, পারিবারিক অসচেতনতা, শিক্ষার ব্যয়, বাল্যবিয়ে ও বিদ্যালয়ের নানা সীমাবদ্ধতায় মাঝপথেই থেমে যাচ্ছে অনেক শিশুর শিক্ষাজীবন। যে বয়সে বই-খাতা নিয়ে বিদ্যালয়ে যাওয়ার কথা, সে বয়সে কেউ কাজে যাচ্ছে, কেউ সংসারের দায়িত্ব নিচ্ছে, আবার কেউ হারিয়ে যাচ্ছে শিক্ষাব্যবস্থার বাইরে। শিশুদের ঝরে পড়া শুধু শিক্ষা খাতের সমস্যা নয়, এটি দেশের ভবিষ্যৎ, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও সামাজিক অগ্রগতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

একটি শিশুর হাতে বই তুলে দেওয়া যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার হাতে সেই বই ধরে রাখার সুযোগ নিশ্চিত করাও ততটাই জরুরি। বাংলাদেশে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়লেও বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া সব শিশু শেষ পর্যন্ত পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারছে না। বিভিন্ন আর্থসামাজিক বাস্তবতা, পারিবারিক সংকট ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সীমাবদ্ধতা অনেক শিশুকে শিক্ষাজীবনের মাঝপথে থামিয়ে দিচ্ছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, শিশুদের বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ার জন্য দায়ী কে? পরিবার, সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, নাকি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা?

ঝরে পড়ার পেছনে দারিদ্র্যের নির্মম বাস্তবতা

শিশুদের বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ার অন্যতম বড় কারণ দারিদ্র্য। নিম্ন আয়ের পরিবারের অনেক অভিভাবকের কাছে সন্তানের পড়াশোনার চেয়ে দৈনন্দিন খাবার ও পরিবারের খরচ জোগানো বেশি জরুরি হয়ে ওঠে। ফলে শিশুকে বিদ্যালয়ে পাঠানোর পরিবর্তে কাজে পাঠাতে বাধ্য হন তারা।

শহরের হোটেল, রেস্তোরাঁ, ওয়ার্কশপ, পরিবহন, দোকান, কারখানা ও ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে বহু শিশুকে শ্রম দিতে দেখা যায়। গ্রামাঞ্চলেও কৃষিকাজ, মাছ ধরা, গৃহস্থালি কাজসহ নানা পেশায় যুক্ত হচ্ছে শিশুরা। অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের আয় বাড়ানোর জন্য শিশুর উপার্জনের ওপর নির্ভর করতে হয় অভিভাবকদের।

শুধু বিদ্যালয়ে ভর্তি বা বিনা মূল্যে বই পেলেই শিক্ষার ব্যয় শেষ হয় না। পোশাক, জুতা, যাতায়াত, খাতা-কলম, প্রাইভেট পড়া এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ দরিদ্র পরিবারের জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। এসব ব্যয় বহন করতে না পেরে অনেক অভিভাবক সন্তানকে বিদ্যালয় থেকে সরিয়ে নেন।

শিক্ষার প্রতি অভিভাবকদের অসচেতনতা

শিশুর শিক্ষাজীবন ধরে রাখার ক্ষেত্রে পরিবারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অনেক পরিবারে শিক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতনতা নেই। বিশেষ করে যেসব অভিভাবক নিজেরা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ পাননি, তাদের কেউ কেউ সন্তানের পড়াশোনাকে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করতে পারেন না।

অনেক অভিভাবক মনে করেন, ছোট বয়স থেকেই সন্তান কোনো কাজে যুক্ত হলে পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতি হবে। আবার কেউ কেউ মনে করেন, মেয়েদের বেশি পড়াশোনার প্রয়োজন নেই। এ ধরনের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি শিশুদের শিক্ষাজীবনকে বাধাগ্রস্ত করে। অন্যদিকে, অনেক কর্মজীবী অভিভাবক সময়ের অভাবে সন্তানের পড়াশোনার খোঁজ রাখতে পারেন না। নিয়মিত বিদ্যালয়ে যাচ্ছে কি না, পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়ছে কি না, কোনো সমস্যায় পড়ছে কি না, এসব বিষয়ে পর্যাপ্ত নজরদারি না থাকায় শিশুরা ধীরে ধীরে পড়াশোনা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

বাল্যবিয়ে থামিয়ে দিচ্ছে কিশোরীদের শিক্ষাজীবন

বাংলাদেশে কিশোরীদের শিক্ষাজীবন বাধাগ্রস্ত হওয়ার অন্যতম কারণ বাল্যবিয়ে। দারিদ্র্য, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা, পারিবারিক চাপ এবং প্রচলিত সামাজিক রীতির কারণে অনেক মেয়েকে অল্প বয়সেই বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয়।

অনেক পরিবার মনে করে, মেয়েকে দ্রুত বিয়ে দিলে সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে এবং পরিবারের দায়িত্ব কমবে। কিন্তু এর ফলে একটি মেয়ের শিক্ষা, ব্যক্তিগত বিকাশ, কর্মসংস্থান ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা সংকুচিত হয়ে যায়।

বিশেষ করে মাধ্যমিক পর্যায়ে ওঠার পর অনেক কিশোরী বিদ্যালয় ছেড়ে দেয়। বিয়ের পর সংসারের দায়িত্ব, মাতৃত্ব এবং সামাজিক বিধিনিষেধের কারণে তাদের পক্ষে আবার পড়াশোনায় ফিরে আসা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে একটি শিশুর শিক্ষাজীবনের সমাপ্তি ঘটে অনেক সময় তার নিজের সিদ্ধান্তের বাইরেই।

বিদ্যালয়ের পরিবেশ ও শিক্ষার মানও দায় এড়াতে পারে না

শিশুদের বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ার দায় শুধু পরিবারের ওপর চাপিয়ে দিলে সমস্যার প্রকৃত কারণ আড়াল থেকে যাবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ, পাঠদানের পদ্ধতি, শিক্ষকদের আচরণ এবং শিক্ষার মানও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

অনেক বিদ্যালয়ে শিক্ষকসংকট, শ্রেণিকক্ষের স্বল্পতা, পর্যাপ্ত শিক্ষা উপকরণের অভাব এবং দুর্বল ব্যবস্থাপনা রয়েছে। কোথাও কোথাও শিক্ষার্থীদের প্রতি শিক্ষকদের অসহিষ্ণু আচরণ, শারীরিক শাস্তি কিংবা অপমানজনক মন্তব্য শিশুদের বিদ্যালয়বিমুখ করে তোলে। আবার অনেক শিশু শ্রেণি অনুযায়ী পড়াশোনার সক্ষমতা অর্জন করতে পারে না। প্রাথমিক স্তরেই পড়া ও গণিতে দুর্বলতা তৈরি হলে পরবর্তী শ্রেণিতে গিয়ে তারা আরও পিছিয়ে পড়ে। একপর্যায়ে পড়াশোনাকে কঠিন মনে করে বিদ্যালয়ে যাওয়া বন্ধ করে দেয়।

ইউনিসেফ ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৫ সালের বহুমাত্রিক সূচকভিত্তিক জরিপ (এমআইসিএস) অনুযায়ী, ৭ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের মাত্র ৫০ দশমিক ২ শতাংশের মৌলিক পাঠদক্ষতা রয়েছে। একই বয়সী শিশুদের মাত্র ৩৯ দশমিক ২ শতাংশের রয়েছে মৌলিক গণিতের দক্ষতা। অর্থাৎ বিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকলেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিশু প্রয়োজনীয় শিখনদক্ষতা অর্জন করতে পারছে না।

পরিসংখ্যানে উদ্বেগজনক চিত্র

বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষায় ঝরে পড়ার হার কমানোর ক্ষেত্রে অতীতে অগ্রগতি থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে আবার উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের বার্ষিক প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিসংখ্যান ২০২৪ অনুযায়ী, প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার ২০২৩ সালের ১৩ দশমিক ১৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৪ সালে দাঁড়িয়েছে ১৬ দশমিক ২৫ শতাংশে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে এই হার বেড়েছে ৩ দশমিক ১০ শতাংশ পয়েন্ট।

অন্যদিকে, ইউনিসেফ ও বিবিএসের ২০২৫ সালের জরিপে প্রাথমিক বিদ্যালয় বয়সী শিশুদের বিদ্যালয়ের বাইরে থাকার হার ৬ দশমিক ৫ শতাংশ, নিম্নমাধ্যমিক বয়সীদের ক্ষেত্রে ১৩ দশমিক ১ শতাংশ এবং উচ্চমাধ্যমিক বয়সীদের ক্ষেত্রে ৩৩ দশমিক ৯ শতাংশ দেখানো হয়েছে। উচ্চতর শ্রেণিতে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যালয়ের বাইরে থাকা শিশুর অনুপাত বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি বিশেষভাবে ভাবনার।

শিশুশ্রমও এ সংকটের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। একই জরিপে ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী ৯ দশমিক ২ শতাংশ শিশু শিশুশ্রমে যুক্ত থাকার তথ্য উঠে এসেছে। দরিদ্র পরিবারের শিশুদের মধ্যে এই প্রবণতা তুলনামূলক বেশি। ফলে শিক্ষার বাইরে চলে যাওয়া এবং শ্রমে যুক্ত হওয়ার মধ্যে একটি স্পষ্ট সম্পর্ক দেখা যায়।

প্রযুক্তি ও সামাজিক পরিবর্তনের প্রভাব

বর্তমান সময়ে শিশুদের শিক্ষাজীবনে প্রযুক্তির প্রভাবও নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন গেম ও ভিডিও দেখার প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি অনেক শিশুর পড়াশোনার সময় কমিয়ে দিচ্ছে। অভিভাবকদের অসচেতনতা এবং প্রযুক্তি ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণের অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে।

তবে প্রযুক্তিকে পুরোপুরি দায়ী করা ঠিক হবে না। যথাযথ তদারকি ও শিক্ষামূলক ব্যবহারের মাধ্যমে প্রযুক্তি শিশুদের শেখার আগ্রহ বাড়াতেও পারে। প্রয়োজন হলো প্রযুক্তির ইতিবাচক ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং শিশুদের জন্য সুস্থ বিনোদন ও খেলাধুলার সুযোগ তৈরি করা।

দুর্যোগ ও ভৌগোলিক বৈষম্য

বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল, চরাঞ্চল, হাওর ও নদীভাঙনপ্রবণ এলাকার শিশুদের শিক্ষাজীবন তুলনামূলক বেশি অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন কিংবা জলাবদ্ধতায় বিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যায়। অনেক পরিবারের বসতভিটা হারিয়ে অন্যত্র চলে যেতে হয়। ফলে শিশুদের পড়াশোনায় দীর্ঘ বিরতি তৈরি হয়।

দুর্গম এলাকায় বিদ্যালয়ের দূরত্ব, যোগাযোগব্যবস্থার দুর্বলতা এবং নিরাপদ যাতায়াতের অভাবও শিশুদের নিয়মিত উপস্থিতিতে বাধা সৃষ্টি করে। বিশেষ করে প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও সহায়ক শিক্ষাব্যবস্থা না থাকলে তাদের বিদ্যালয়ে টিকে থাকা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।

ঝরে পড়া রোধে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ

শিশুদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখতে হলে প্রথমেই পরিবারগুলোর আর্থিক সংকট বিবেচনায় নিতে হবে। দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি, শিক্ষা উপকরণ, পোশাক, জুতা ও যাতায়াত সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি। শুধু ভর্তি কার্যক্রম বাড়ালেই হবে না, প্রতিটি শিশুর শিক্ষাজীবন শেষ করা পর্যন্ত সহায়তা দিতে হবে।

বিদ্যালয়ে শিক্ষার মান উন্নয়নের পাশাপাশি আনন্দময় ও শিশুবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে হবে। শিক্ষার্থীদের প্রতি শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন বন্ধ করতে হবে। যারা পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়ছে, তাদের জন্য অতিরিক্ত পাঠদান ও বিশেষ সহায়তার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থাকা শিক্ষার্থীদের তালিকা তৈরি করে শিক্ষক, বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি ও স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে তাদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। কেন শিশুটি বিদ্যালয়ে আসছে না, তা খুঁজে বের করে সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে।

বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ, শিশুশ্রম বন্ধ এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার শিশুদের জন্য বিকল্প শিক্ষা কার্যক্রম চালু করাও জরুরি। পাশাপাশি বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনায় অভিভাবকদের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। শিক্ষা কার্যক্রমের পাশাপাশি খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও সৃজনশীল চর্চার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।

দায় কার, সমাধানই বা কোথায়?

শিশুদের বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ার দায় কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নয়। পরিবার, সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা, প্রত্যেকেরই এখানে দায়িত্ব রয়েছে। দারিদ্র্যের কারণে যে বাবা সন্তানকে কাজে পাঠাতে বাধ্য হন, তার সমস্যার সমাধান না করে শুধু অভিভাবককে দায়ী করলে চলবে না। একইভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা, শিক্ষার ব্যয় এবং সামাজিক বৈষম্য উপেক্ষা করেও শিশুদের ঝরে পড়া বন্ধ করা সম্ভব নয়।

রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো প্রত্যেক শিশুর জন্য মানসম্মত, নিরাপদ ও বৈষম্যহীন শিক্ষা নিশ্চিত করা। শিক্ষার বাজেট, শিক্ষক নিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং দরিদ্র পরিবারের জন্য সহায়তা বাড়ানোর পাশাপাশি ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের পুনরায় বিদ্যালয়ে ফিরিয়ে আনার কার্যকর কর্মসূচি নিতে হবে।

একটি শিশুর বিদ্যালয় ছেড়ে দেওয়া মানে শুধু একজন শিক্ষার্থীর পড়াশোনা বন্ধ হওয়া নয়, বরং একটি সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের পথ সংকুচিত হওয়া। আজ যে শিশু দারিদ্র্যের কারণে বই ছেড়ে শ্রমে যুক্ত হচ্ছে, আগামী দিনে তার দক্ষ ও সম্ভাবনাময় নাগরিক হয়ে ওঠার সুযোগও সীমিত হয়ে পড়ছে।

তাই শিশুদের ঝরে পড়া রোধকে কেবল শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব হিসেবে দেখলে হবে না। এটি জাতীয় উন্নয়ন, মানবসম্পদ গঠন এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন। প্রতিটি শিশুর হাতে বই তুলে দেওয়ার পাশাপাশি সেই বই পড়ার পরিবেশ ও সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। কারণ কোনো শিশুই যেন দারিদ্র্য, বৈষম্য কিংবা অবহেলার কারণে শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত না হয়।

শিশুরা বিদ্যালয় ছাড়ছে কেন, সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার পাশাপাশি তাদের বিদ্যালয়ে ফিরিয়ে আনার দায়িত্বও নিতে হবে সবাইকে। একটি শিশুর শিক্ষাজীবন রক্ষা করা মানে শুধু একটি পরিবার নয়, পুরো দেশের ভবিষ্যৎ রক্ষা করা।

মন্তব্য