ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল: আশা, আস্থা ও মানবসেবার প্রতীক
রাজধানীর পুরান ঢাকার বকশীবাজার এলাকায় অবস্থিত ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল। দেশের চিকিৎসাসেবা ও চিকিৎসাশিক্ষার ইতিহাসে প্রতিষ্ঠানটির অবস্থান অনন্য। প্রতিদিন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে অসংখ্য রোগী এখানে আসেন চিকিৎসার আশায়। কারও প্রয়োজন জরুরি অস্ত্রোপচার, কেউ দুর্ঘটনায় আহত, কেউবা দীর্ঘদিনের জটিল রোগে আক্রান্ত। আর্থিক সামর্থ্য সীমিত এমন অনেক পরিবারের কাছেও প্রতিষ্ঠানটি শেষ ভরসার নাম। দীর্ঘ ইতিহাস, দক্ষ চিকিৎসক তৈরি, বিশেষায়িত চিকিৎসা এবং বিপুলসংখ্যক রোগীকে সেবা দেওয়ার মধ্য দিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল পরিণত হয়েছে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাকেন্দ্রে।
তবে রোগীর ক্রমবর্ধমান চাপ, শয্যাসংকট, পুরোনো অবকাঠামো, আবাসন সমস্যা এবং আধুনিক চিকিৎসাসেবার চাহিদা প্রতিষ্ঠানটির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এসব সমস্যা মোকাবিলায় হাসপাতালের সম্প্রসারণ পরিকল্পনার পাশাপাশি ঢাকা মেডিকেল কলেজের পুরোনো ভবন পুনর্নির্মাণ ও আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
যেভাবে শুরু হয়েছিল যাত্রা
ঢাকা মেডিকেল কলেজের যাত্রা শুরু ১৯৪৬ সালের ১০ জুলাই। তৎকালীন পূর্ব বাংলায় আধুনিক চিকিৎসাশিক্ষার প্রসারে প্রতিষ্ঠানটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শুরুর দিকে নিজস্ব ভবন না থাকায় বর্তমানে হাসপাতালের মূল ভবন হিসেবে পরিচিত ঐতিহাসিক স্থাপনাতেই কলেজের কার্যক্রম পরিচালিত হতো।
ভবনটির ইতিহাস আরও পুরোনো। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের পর পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশের সচিবালয় হিসেবে এটি ব্যবহৃত হয়েছিল। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত হওয়া এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মার্কিন সামরিক বাহিনীর হাসপাতাল হিসেবে ব্যবহারের মতো নানা অধ্যায় পেরিয়ে ভবনটি চিকিৎসাশিক্ষা ও চিকিৎসাসেবার কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
প্রতিষ্ঠার সময় মেডিসিন, সার্জারি, স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যা এবং নাক-কান-গলা বিভাগসহ সীমিত পরিসরে কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির পরিধি বেড়েছে। চিকিৎসাশিক্ষা, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তৈরি এবং রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার নানা শাখায় এর কার্যক্রম বিস্তৃত হয়েছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজের সরকারি ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ইতিহাসে প্রতিষ্ঠানটির এই বিবর্তনের বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে।
ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত প্রতিষ্ঠান
ঢাকা মেডিকেল কলেজের ইতিহাস শুধু চিকিৎসাশিক্ষা কিংবা হাসপাতাল পরিচালনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গেও প্রতিষ্ঠানটির গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
১৯৪৮ থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত ভাষা আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকাণ্ডে কলেজের শিক্ষার্থীদের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। সে সময়ের ছাত্রাবাস ও ব্যারাক এলাকায় ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে আন্দোলনকারীদের নানা তৎপরতা চলেছে। ভাষাশহীদদের স্মৃতিবিজড়িত কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের ইতিহাসের সঙ্গেও ঢাকা মেডিকেল কলেজ এলাকার সম্পর্ক রয়েছে।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধেও এ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ও চিকিৎসকেরা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অংশ নেন। যুদ্ধাহত মানুষের চিকিৎসা, আহতদের সহায়তা এবং মুক্তিকামী মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়ে চিকিৎসা পেশার মানবিক দিকটি এখানে বিশেষভাবে প্রকাশিত হয়েছিল।
এই ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার প্রতিষ্ঠানটির পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের উন্নয়ন মানে কেবল চিকিৎসা অবকাঠামো সম্প্রসারণ নয়, একই সঙ্গে দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত একটি প্রতিষ্ঠানকে সংরক্ষণ করাও।
দেশের অন্যতম বৃহৎ সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্র
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল দেশের অন্যতম বৃহৎ সরকারি তৃতীয় স্তরের চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠান। জটিল রোগের চিকিৎসা, দুর্ঘটনায় আহতদের জরুরি সেবা, অস্ত্রোপচার এবং বিভিন্ন বিশেষায়িত বিভাগের চিকিৎসা পেতে প্রতিদিন এখানে রোগীরা আসেন।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিষ্ঠানসংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, হাসপাতালটির অনুমোদিত শয্যাসংখ্যা ২ হাজার ৬০০। তবে অনুমোদিত শয্যার তুলনায় রোগীর চাপ অনেক বেশি হওয়ায় বাস্তবে সেবা দিতে গিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে বাড়তি চাপ সামলাতে হয়।
২০২৬ সালের ৩১ জানুয়ারি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে জানানো হয়, প্রতিদিন প্রায় ৪ হাজার রোগী ভর্তি থাকেন; কোনো কোনো সময়ে এই সংখ্যা ৪ হাজার ৫০০-তে পৌঁছে যায়। অর্থাৎ অনুমোদিত শয্যার তুলনায় রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি। ফলে কিছু রোগীকে শয্যার বাইরে মেঝে, বারান্দা কিংবা ওয়ার্ডের আশপাশের জায়গায় চিকিৎসা নিতে হয়।
এই পরিস্থিতি রোগী ও স্বজনদের জন্য যেমন কষ্টকর, তেমনি চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্যও বাড়তি দায়িত্বের কারণ। সীমিত জায়গায় বিপুলসংখ্যক রোগীকে চিকিৎসা দিতে গিয়ে রোগীর ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, পরিচ্ছন্নতা, চলাচল এবং সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
জরুরি বিভাগে নির্ভরতা
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সেবা হলো জরুরি বিভাগ। সড়ক দুর্ঘটনা, অগ্নিদগ্ধ হওয়া, গুরুতর আঘাত, আকস্মিক অসুস্থতা এবং জীবনসংকটাপন্ন নানা পরিস্থিতিতে রোগীদের এখানে আনা হয়।
জরুরি চিকিৎসার ক্ষেত্রে সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রোগীকে দ্রুত পর্যবেক্ষণ, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা, প্রাথমিক চিকিৎসা এবং প্রয়োজনে অস্ত্রোপচারের ব্যবস্থা করতে হয়। বড় সরকারি হাসপাতাল হিসেবে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে প্রতিদিন এমন বহুমাত্রিক চাপ সামলাতে হয়।
এ ছাড়া মেডিসিন, সার্জারি, নিউরোসার্জারি, অর্থোপেডিকস, হৃদ্রোগ, কিডনি, শিশু, স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যা, চক্ষু, নাক-কান-গলা এবং অন্যান্য বিশেষায়িত বিভাগে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়। হাসপাতালের ওয়েবসাইটে বিভিন্ন চিকিৎসা বিভাগের পাশাপাশি প্যাথলজি, রেডিওলজি, অস্ত্রোপচার ও অন্যান্য সেবার উল্লেখ রয়েছে।
বিশেষায়িত চিকিৎসার এই বিস্তৃত পরিসর রোগীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে সেবার মান বজায় রাখতে প্রয়োজন পর্যাপ্ত চিকিৎসক, নার্স, টেকনোলজিস্ট, আধুনিক যন্ত্রপাতি, পরীক্ষাগারের সক্ষমতা এবং রোগী ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত উদ্যোগ।
চিকিৎসাশিক্ষা ও দক্ষ চিকিৎসক তৈরির কেন্দ্র
ঢাকা মেডিকেল কলেজের আরেকটি প্রধান পরিচয় চিকিৎসাশিক্ষা। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ কলেজ থেকে বহু চিকিৎসক তৈরি হয়েছেন, যাঁরা দেশের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল, চিকিৎসাশিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কাজ করছেন।
এখানে এমবিবিএস শিক্ষার পাশাপাশি স্নাতকোত্তর পর্যায়ের বিভিন্ন চিকিৎসা বিষয়ে প্রশিক্ষণ ও শিক্ষার সুযোগ রয়েছে। ক্লিনিক্যাল শিক্ষা, রোগ নির্ণয়ের বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং হাসপাতালভিত্তিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা চিকিৎসা পেশার জন্য প্রস্তুত হন।
একটি বড় শিক্ষণ হাসপাতালের বিশেষত্ব হলো, এখানে শিক্ষার্থীরা নানা ধরনের রোগী ও জটিল রোগের বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পান। তবে রোগীর অতিরিক্ত চাপ যদি প্রয়োজনীয় তদারকি, পর্যাপ্ত শিক্ষক এবং আধুনিক শিক্ষাসুবিধার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, তাহলে শিক্ষার পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
তাই হাসপাতালের উন্নয়নের পাশাপাশি কলেজের শ্রেণিকক্ষ, পরীক্ষাগার, পাঠাগার, শিক্ষার্থীদের আবাসন এবং শিক্ষকদের কাজের পরিবেশ উন্নত করা জরুরি।
১ হাজার ১৫৪ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প
ঢাকা মেডিকেল কলেজের অবকাঠামো আধুনিকায়নে ২০২৬ সালে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতির খবর সামনে আসে। ২০ আগস্ট প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা প্রতিস্থাপন এবং নতুন অবকাঠামো নির্মাণে ১ হাজার ১৫৪ কোটি ৮৩ লাখ টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে।
প্রকল্পটির নাম ‘ঢাকা মেডিকেল কলেজের অনুপযোগী স্থাপনাসমূহ প্রতিস্থাপন ও পুনর্নির্মাণ’। এতে তিনটি ১৫ তলা এবং দুটি চারতলা ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। নতুন অবকাঠামোর মধ্যে রয়েছে ১৫ তলা একাডেমিক ভবন, শিক্ষার্থীদের জন্য ৮০০ আসনের আবাসিক হল, আবাসিক কোয়ার্টার এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় স্থাপনা।
প্রস্তাবিত সুবিধার মধ্যে চারটি ৩০০ আসনের লেকচার থিয়েটার, পরীক্ষার কক্ষ, আধুনিক সেবা ভবন এবং ৮০০ মুসল্লির ধারণক্ষমতাসম্পন্ন চারতলা মসজিদও রয়েছে। পাশাপাশি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পয়োনিষ্কাশন শোধনাগার, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, অগ্নিনিরাপত্তা, পানি সরবরাহ, আধুনিক বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা ও লিফট স্থাপনের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সময়কাল ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০৩০ সালের আগস্ট পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে কলেজের পুরোনো স্থাপনাগুলোর ওপর চাপ কমানো, শিক্ষার পরিবেশ উন্নত করা এবং শিক্ষার্থীদের আবাসনসংকট মোকাবিলায় সহায়তা পাওয়ার কথা।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। কলেজের একাডেমিক ও আবাসিক অবকাঠামো উন্নয়নের এই প্রকল্প এবং হাসপাতালের শয্যাসংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনা এক নয়। হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণের জন্য আলাদা পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন অগ্রগতি বিবেচনা করতে হবে।
পাঁচ হাজার শয্যার পরিকল্পনা থেকে চার হাজার শয্যার লক্ষ্য
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের রোগীর চাপ কমাতে একসময় ৫ হাজার শয্যায় উন্নীত করার বড় পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সেই প্রকল্প আর এগোয়নি। এর পরিবর্তে হাসপাতালকে ৪ হাজার শয্যায় উন্নীত করার নতুন পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করার কথা জানায় কর্তৃপক্ষ।
হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামানের বক্তব্য উদ্ধৃত করে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ হাসপাতালটিকে একটি শিক্ষণ হাসপাতাল হিসেবে বিবেচনায় রেখে ৪ হাজার শয্যার পরিকল্পনার দিকে এগোচ্ছে। এ জন্য গণপূর্ত অধিদপ্তরকে মাস্টারপ্ল্যান তৈরির দায়িত্ব দেওয়ার কথা জানানো হয়েছিল।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, পুরোনো বহির্বিভাগ ভবনের পরিবর্তে নতুন ভবন নির্মাণের বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে। ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ায় সেখানে বিকল্প অবকাঠামো তৈরির প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
তবে পরিকল্পনা ঘোষণা, নকশা প্রস্তুত, অর্থ বরাদ্দ, দরপত্র, নির্মাণকাজ শুরু এবং রোগীদের জন্য ভবন চালু করা একেকটি পৃথক ধাপ। তাই শয্যাসংখ্যা বৃদ্ধির ঘোষণাকে ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত উন্নয়ন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। প্রকৃত অগ্রগতি নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ তথ্য গুরুত্বপূর্ণ।
রোগীর চাপ কমাতে কী প্রয়োজন
শয্যাসংকট মোকাবিলায় শুধু ভবন নির্মাণ যথেষ্ট নয়। নতুন শয্যার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চিকিৎসক, নার্স, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, পরীক্ষাগারকর্মী এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ ও পদায়ন করতে হবে। প্রয়োজনীয় ওষুধ, অক্সিজেন, অস্ত্রোপচারের সরঞ্জাম, নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র এবং রোগ নির্ণয়ের যন্ত্রপাতির পর্যাপ্ততাও নিশ্চিত করা জরুরি।
একই সঙ্গে রোগী ব্যবস্থাপনায় কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা গেলে জটিল রোগী ছাড়া অন্যদের ঢাকামুখী হওয়ার প্রবণতা কমতে পারে। এতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওপর চাপও কিছুটা কমবে।
পরীক্ষার জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা, চিকিৎসকের পরামর্শ পেতে বিলম্ব, ভর্তি ও ছাড়পত্র প্রক্রিয়ার জটিলতা এবং রোগীদের তথ্য জানার অসুবিধা কমাতে ডিজিটাল ব্যবস্থার ব্যবহার বাড়ানো যেতে পারে। পাশাপাশি হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং রোগী ও স্বজনদের জন্য পর্যাপ্ত শৌচাগার ও অপেক্ষার জায়গা নিশ্চিত করা দরকার।
মানবসেবার ঐতিহ্য ধরে রাখার প্রত্যাশা
ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল দেশের মানুষের কাছে শুধু একটি সরকারি চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠান নয়; এটি আশা, আস্থা ও মানবসেবার প্রতীক। চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে অক্ষম বহু মানুষ এখানে চিকিৎসার সুযোগ খোঁজেন। জটিল রোগের চিকিৎসা, দুর্ঘটনায় আহত মানুষের সেবা এবং চিকিৎসক তৈরির ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটির ভূমিকা তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু দীর্ঘ ইতিহাস ও সুনাম ধরে রাখতে হলে প্রতিষ্ঠানটিকে সময়ের চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোতে হবে। পুরোনো স্থাপনা সংস্কার, নতুন ভবন নির্মাণ, পর্যাপ্ত জনবল, আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং কার্যকর রোগী ব্যবস্থাপনার সমন্বয় প্রয়োজন।
২০২৬ সালে কলেজের অবকাঠামো পুনর্নির্মাণের প্রকল্প এবং হাসপাতাল সম্প্রসারণের পরিকল্পনা সামনে আসায় উন্নয়নের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো এসব উদ্যোগের স্বচ্ছ ও সময়মতো বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা। পাশাপাশি নির্মাণকাজ চলাকালে চিকিৎসাসেবা ও শিক্ষাকার্যক্রম যাতে ব্যাহত না হয়, সেদিকেও নজর দিতে হবে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ভবিষ্যৎ সাফল্য কেবল কতটি নতুন ভবন বা শয্যা যুক্ত হলো, তা দিয়ে বিচার করা যাবে না। রোগী কত দ্রুত প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাচ্ছেন, চিকিৎসার মান কতটা উন্নত হচ্ছে, শিক্ষার্থীরা কেমন পরিবেশে দক্ষতা অর্জন করছেন এবং সাধারণ মানুষ কতটা মর্যাদার সঙ্গে সেবা পাচ্ছেন, সেটিই হবে প্রকৃত সাফল্যের মাপকাঠি। ইতিহাসের গৌরবকে আধুনিক ও মানবিক চিকিৎসাসেবায় রূপান্তর করতে পারলেই প্রতিষ্ঠানটি আগামী দিনেও দেশের মানুষের আস্থার কেন্দ্র হয়ে থাকবে।
মন্তব্য