মদ নিষিদ্ধ করার পেছনে স্বাস্থ্যবিজ্ঞান ইসলামে মদ নিষিদ্ধ কেন? আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান কী বলছে
ইসলামে মদ বা অ্যালকোহলকে শুধু একটি পানীয় হিসেবে দেখা হয় না; বরং এটি মানুষের বিবেক, স্বাস্থ্য, পরিবার ও সামাজিক জীবনের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে এমন একটি বিষয় হিসেবে বিবেচিত। কোরআনে ধাপে ধাপে মদ্যপানের নিষেধাজ্ঞা এসেছে এবং শেষ পর্যন্ত মুসলিমদের তা সম্পূর্ণভাবে বর্জনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান ও জনস্বাস্থ্য গবেষণাতেও অ্যালকোহলের সঙ্গে বিভিন্ন শারীরিক ও মানসিক ঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
কোরআনে মদ সম্পর্কে নির্দেশনা
কোরআনে প্রথমদিকে মদ ও জুয়ার ক্ষতির দিকটি তুলে ধরা হয়েছে। আল্লাহ বলেন:
“তারা তোমাকে মদ ও জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বলো, উভয়ের মধ্যে রয়েছে মহাপাপ এবং মানুষের জন্য কিছু উপকারও; তবে তাদের পাপ তাদের উপকারের চেয়ে বড়।”
— সুরা আল-বাকারা, ২:২১৯
পরবর্তী সময়ে নামাজের সময় মদ্যপ অবস্থায় উপস্থিত হওয়ার বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়:
“হে মুমিনগণ! তোমরা নেশাগ্রস্ত অবস্থায় নামাজের নিকটবর্তী হয়ো না, যতক্ষণ না তোমরা যা বলো তা বুঝতে পারো।”
— সুরা আন-নিসা, ৪:৪৩
অবশেষে মদ ও জুয়াকে শয়তানের অপবিত্র কাজ হিসেবে উল্লেখ করে তা থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়:
“হে মুমিনগণ! মদ, জুয়া, মূর্তি এবং ভাগ্য গণনার শর—এসব শয়তানের অপবিত্র কাজ। সুতরাং তোমরা তা পরিহার করো, যাতে তোমরা সফল হতে পারো।”
— সুরা আল-মায়িদা, ৫:৯০
এ
র পরের আয়াতে মদ ও জুয়ার সামাজিক ক্ষতির কথাও স্পষ্ট করা হয়েছে। বলা হয়েছে, শয়তান এর মাধ্যমে মানুষের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করতে এবং আল্লাহর স্মরণ ও নামাজ থেকে দূরে রাখতে চায়।
কেন ইসলামে অ্যালকোহল নিষিদ্ধ?
ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য হলো মানুষের জীবন, বুদ্ধি, সম্পদ, পরিবার ও নৈতিকতা রক্ষা করা। অ্যালকোহল মানুষের বিচার-বুদ্ধি ও আত্মনিয়ন্ত্রণকে দুর্বল করতে পারে। একজন মানুষ স্বাভাবিক অবস্থায় যে সিদ্ধান্ত নিতেন না, নেশাগ্রস্ত অবস্থায় সেটিই করে ফেলতে পারেন।
এ কারণে ইসলামে শুধু মাতলামিকে নিষিদ্ধ করা হয়নি; বরং মদের ব্যাপারেই কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে।
হাদিসে রাসুলুল্লাহ হযরত মোহাম্মদ (সা.) বলেছেন:
“প্রত্যেক নেশাদ্রব্যই খামর (মদ), আর প্রত্যেক নেশাদ্রব্য হারাম।”
অর্থাৎ কোনো পানীয় বা পদার্থ মানুষের বুদ্ধি-বিবেচনা আচ্ছন্ন করে নেশা সৃষ্টি করলে তার ব্যাপারে ইসলামের নিষেধাজ্ঞা প্রযোজ্য।
আধুনিক বিজ্ঞান কী বলছে?
আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান অ্যালকোহলকে সম্পূর্ণ ঝুঁকিমুক্ত পানীয় হিসেবে বিবেচনা করে না। দীর্ঘদিন অতিরিক্ত অ্যালকোহল গ্রহণের সঙ্গে লিভারের ক্ষতি, হৃদ্রোগ, বিভিন্ন ধরনের ক্যানসার, স্নায়ুতন্ত্রের সমস্যা এবং মানসিক স্বাস্থ্যের নানা জটিলতার সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
অ্যালকোহল শরীরে প্রবেশের পর প্রধানত লিভারে বিপাকীয় প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়। দীর্ঘদিন অতিরিক্ত পান করলে লিভারে চর্বি জমা, অ্যালকোহলজনিত হেপাটাইটিস এবং পরবর্তী সময়ে সিরোসিসের মতো গুরুতর সমস্যা তৈরি হতে পারে।
এ ছাড়া অতিরিক্ত অ্যালকোহল মস্তিষ্কের কার্যক্রমে প্রভাব ফেলে। প্রতিক্রিয়ার গতি, বিচার-বিবেচনা, স্মৃতিশক্তি ও মোটর নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হতে পারে। ফলে সড়ক দুর্ঘটনা, পড়ে গিয়ে আঘাত পাওয়া কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ আচরণের সম্ভাবনাও বেড়ে যায়।
ক্যানসারের ঝুঁকি
আধুনিক গবেষণায় অ্যালকোহল গ্রহণের সঙ্গে কয়েক ধরনের ক্যানসারের সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বিশেষ করে মুখগহ্বর, গলা, খাদ্যনালি, যকৃত, স্তন ও বৃহদান্ত্রের ক্যানসারের ঝুঁকির সঙ্গে অ্যালকোহলের সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা হয়েছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অ্যালকোহলের ক্ষতি শুধু অতিরিক্ত পানকারীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।
জনস্বাস্থ্যবিষয়ক গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু ক্যানসারের ঝুঁকি অ্যালকোহল গ্রহণের পরিমাণের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং পরিমাণ যত বাড়ে, ঝুঁকিও অনেক ক্ষেত্রে তত বাড়তে পারে।
মানসিক স্বাস্থ্য ও পারিবারিক জীবনে প্রভাব
অ্যালকোহলের প্রভাব শুধু শরীরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দীর্ঘমেয়াদি বা সমস্যাজনক মদ্যপান উদ্বেগ, বিষণ্নতা ও আসক্তির মতো সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
পরিবারেও এর প্রভাব পড়তে পারে। অ্যালকোহল-নির্ভরতা অর্থনৈতিক সংকট, পারিবারিক বিরোধ, দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা এবং সহিংসতার মতো সামাজিক সমস্যার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। ফলে কোরআনে মদকে মানুষের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টির একটি মাধ্যম হিসেবে যে সতর্কতা দেওয়া হয়েছে, তার সামাজিক দিকটি আধুনিক জনস্বাস্থ্য আলোচনাতেও গুরুত্বপূর্ণ।
তাহলে কি অ্যালকোহলের কোনো উপকার নেই?
বিষয়টি এখানে একটু সতর্কভাবে দেখা প্রয়োজন। অতীতে কিছু পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণায় অল্প পরিমাণ অ্যালকোহল পানকারীদের কিছু হৃদ্রোগের ক্ষেত্রে তুলনামূলক সুবিধা থাকার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী গবেষণায় এসব ফলাফলের পেছনে জীবনযাপন, খাদ্যাভ্যাস, আর্থসামাজিক অবস্থা ও অন্যান্য বিভ্রান্তিকর কারণের প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বর্তমান জনস্বাস্থ্য বার্তার মূল বিষয় হলো: স্বাস্থ্যগত সুবিধা পাওয়ার জন্য অ্যালকোহল শুরু করার সুপারিশ করা হয় না। যারা পান করেন না, তাদের শুধু সম্ভাব্য স্বাস্থ্যগত সুবিধার আশায় পান শুরু না করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
ইসলাম ও বিজ্ঞানের আলোকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা
ইসলাম অ্যালকোহল নিষিদ্ধ করার ক্ষেত্রে শুধু শারীরিক ক্ষতির কথা বলেনি। বরং মানুষের বিবেক, ইবাদত, সামাজিক সম্পর্ক, পরিবার ও নৈতিক জীবন রক্ষার বিষয়টিও সামনে এনেছে।
আধুনিক বিজ্ঞান মূলত অ্যালকোহলের শারীরিক ও মানসিক ঝুঁকি পরিমাপ করে।
অন্যদিকে ইসলাম বিষয়টিকে আরও বিস্তৃত নৈতিক ও সামাজিক কাঠামোর মধ্যে বিবেচনা করে। তাই দুটির আলোচনার ক্ষেত্র এক নয়, তবে অ্যালকোহলের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে আধুনিক বৈজ্ঞানিক গবেষণার অনেক ফল ইসলামের দীর্ঘদিনের সতর্কতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, কোরআনের নির্দেশকে আধুনিক কোনো গবেষণার ফলাফলের ওপর নির্ভরশীল করে দেখার প্রয়োজন নেই। মুসলিমদের কাছে মদ বর্জনের মূল কারণ আল্লাহর নির্দেশ। আধুনিক বিজ্ঞান সেই নিষেধাজ্ঞার কিছু স্বাস্থ্যগত ও সামাজিক তাৎপর্য বুঝতে সহায়তা করতে পারে।
মদ সম্পর্কে ইসলামের অবস্থান সুস্পষ্ট: এটি থেকে দূরে থাকতে হবে। কোরআন প্রথমে এর ক্ষতি ও উপকারের তুলনা তুলে ধরে, পরে নামাজের সময় নেশা থেকে বিরত থাকতে নির্দেশ দেয় এবং শেষ পর্যন্ত সম্পূর্ণভাবে বর্জনের আহ্বান জানায়।
আধুনিক বিজ্ঞানও দেখিয়েছে, অ্যালকোহল মানুষের শরীর ও মনের ওপর নানা ধরনের ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি ও অতিরিক্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে ঝুঁকি উল্লেখযোগ্য।
সুতরাং ইসলামের শিক্ষা এবং আধুনিক জনস্বাস্থ্য গবেষণা পাশাপাশি পড়লে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়: মানুষের সুস্থতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, পরিবার ও সমাজের নিরাপত্তার জন্য অ্যালকোহল থেকে দূরে থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা।
ক্যাপশন: কোরআনে মদ্যপান থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে; আধুনিক বিজ্ঞানও অ্যালকোহলের সঙ্গে নানা স্বাস্থ্য ও সামাজিক ঝুঁকির সম্পর্ক তুলে ধরেছে।
মন্তব্য