শিশুশিক্ষা ও প্যারেন্টিং গবেষক মুফতি আব্দুল্লাহ আল হাদী [এম.এ, ঢাবি] |
পরিচালক: তাকওয়া শিশু একাডেমি ও মাদরাসাতুল ঈমান, ঢাকা।
-----------------------------------------------------------------------------------------------------সন্তান হলো মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে পিতা-মাতার জন্য জীবনের শ্রেষ্ঠ উপহার এবং পবিত্র আমানত। প্রতিটি শিশুর নিষ্পাপ হাসি একটি পরিবারের সুখের কেন্দ্রবিন্দু। কিন্তু বর্তমান যুগে সন্তান প্রতিপালন পিতা-মাতার জন্য অন্যতম বড় এক মানসিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্মার্টফোনের তীব্র আসক্তি, ভার্চুয়াল জগতের মোহ, সামাজিক অবক্ষয় এবং আধুনিক জীবনের চরম ব্যস্ততার মাঝে সন্তানদের সঠিক পথে বড় করে তোলা রীতিমতো এক যুদ্ধ।
অনেক পিতা-মাতা পার্থিব সাফল্যের পেছনে ছুটতে গিয়ে সন্তানের আত্মিক ও নৈতিক বিকাশের কথা ভুলে যান। আবার অনেকে অতিরিক্ত শাসন বা চরম উদাসীনতার মাধ্যমে অজান্তেই সন্তানের ভবিষ্যৎ ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেন। অথচ এই সংকটময় পরিস্থিতিতে আমাদের সামনে রয়েছে সর্বোত্তম ও চিরন্তন এক পথপ্রদর্শক রূপরেখা—মহানবী হযরত মুহাম্মদ ﷺ-এর জীবনাদর্শ।সন্তান প্রতিপালনে মহানবী ﷺযে অনুপম ধৈর্য, অফুরন্ত ভালোবাসা, সম্মান এবং প্রজ্ঞাপূর্ণ কৌশল দেখিয়েছেন, তা ধারণ করলেই বর্তমান সময়েও আমরা একটি শিশুকে আদর্শ, আত্মবিশ্বাসী ও ধার্মিক মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারি।
১. সন্তান প্রতিপালনে নববী আদর্শ কেন অপরিহার্য?
ইসলাম কেবল ইবাদত-বন্দেগির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে পূর্ণাঙ্গ নির্দেশনা দেয়। একজন শিশুর মনস্তাত্ত্বিক বিকাশ, চারিত্রিক দৃঢ়তা এবং আত্মিক পরিশুদ্ধি নিশ্চিত করার জন্য রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর জীবনই সর্বোত্তম মডেল।
মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন:
لَّقَدْكَانَلَكُمْفِيرَسُولِاللَّهِأُسْوَةٌحَسَنَةٌ
"নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসুলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।" (সূরা আল-আহযাব, ৩৩:২১)
আজকের দিনে প্রচলিত পশ্চিমা প্যারেন্টিং তত্ত্বগুলো প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত ও সংশোধিত হচ্ছে। কিন্তু আজ থেকে চৌদ্দশত বছর আগে মানবতার মুক্তির দূত মহানবী ﷺ শিশুদের যে মানবিক মর্যাদা, মানসিক অধিকার ও মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্ব দিয়ে গেছেন, তা আজও আধুনিক মনোবিজ্ঞানীদের বিস্মিত করে। শিশুদের প্রতি ইসলামের শিক্ষা শুধু কিছু নিয়মের সমষ্টি নয়; বরং এটি ভালোবাসা, ইনসাফ ও আত্মিক সম্পর্কের এক মেলবন্ধন।
আরও পড়ুন: ইসলামে ঈসা নবী সম্পর্কে ১০টি বিষয়
২. শিশুদের প্রতি মহানবী ﷺ-এর ভালোবাসা ও অন্তহীন স্নেহ
নবীজি ﷺ শিশুদের অন্তর দিয়ে ভালোবাসতেন। শিশুদের দেখলে তাঁর মুখমণ্ডলে আনন্দের দীপ্তি ফুটে উঠত। তিনি পথিমধ্যে শিশুদের দেখলে নিজের সওয়ারিতে তুলে নিতেন এবং তাদের মাথায় স্নেহের পরশ বুলিয়ে দিতেন।
হযরত আনাস (রা.) বর্ণনা করেন:
"আমি পরিবার-পরিজনের প্রতি রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর চেয়ে বেশি দয়ালু আর কাউকে দেখিনি।" (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৩১৬)
তিনি কোনোদিন শিশুদের নিজের থেকে ছোট বা তুচ্ছ মনে করেননি। শিশুদের নিষ্পাপ উপস্থিতি তিনি সবসময় উপভোগ করতেন এবং তাদের সাথে নির্মল বন্ধুত্ব গড়ে তুলতেন।
৩. আদর, স্নেহ ও প্রকাশ্য মমতার শিক্ষা
অনেক পিতা-মাতা মনে করেন সন্তানের প্রতি ভালোবাসা মনে মনে রাখাই যথেষ্ট, প্রকাশ করার প্রয়োজন নেই; কিংবা অতিরিক্ত আদর করলে সন্তান নষ্ট হয়ে যাবে। কিন্তু রাসুলুল্লাহ ﷺ ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশকে ঈমানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে শিখিয়েছেন।
একদা আকরা ইবনে হাবিস (রা.) দেখলেন যে, নবীজি ﷺ তাঁর দৌহিত্র হাসান (রা.)-কে আদর করে চুমু খাচ্ছেন। তা দেখে তিনি বললেন, "আমার দশটি সন্তান রয়েছে, আমি তাদের কাউকেই কখনো চুমু খাইনি।"
রাসুলুল্লাহ ﷺ তার দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বললেন:
مَنْلَايَرْحَمُلَايُرْحَمُ
"যে দয়া করে না, সে দয়া পায় না।" (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৯৯৭; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৩১৮)
অপর এক বর্ণনায় আয়েশা (রা.) বলেন, এক বেদুইন এসে বলল, "আপনারা কি শিশুদের চুমু খান? আমরা তো তাদের চুমু খাই না।"নবীজি ﷺ বললেন: "আল্লাহ যদি তোমার অন্তর থেকে দয়া ও মায়া উঠিয়ে নেন, তবে আমার কি করার আছে?" (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৯৯৮)
আরও পড়ুন: যেখানে আদম (আ:) ও হাওয়াকে জান্নাত থেকে নামানো হয়
বর্তমান পিতা-মাতার জন্য শিক্ষা:
- সন্তানকে নিয়মিত জড়িয়ে ধরুন, মাথায় হাত বুলিয়ে দিন এবং মুখে ভালোবাসার কথা প্রকাশ করুন।
- মানসিক সমর্থন ও শারীরিক স্নেহ সন্তানের মস্তিষ্ক বিকাশ ও আত্মবিশ্বাস বাড়াতে সরাসরি ভূমিকা রাখে।
৪. শিশুদের সাথে সম্মানজনক ও সুন্দর আচরণ
শিশুদের কেবল ‘ছোট’ ভেবে অবহেলা করা নববী তরিকা নয়। রাসুলুল্লাহ ﷺ শিশুদের সাথে এমন মার্জিত ও সম্মানজনক আচরণ করতেন, যা তাদের আত্মমর্যাদাবোধ জাগ্রত করত।
- শিশুদের আগে সালাম দেওয়া:হযরত আনাস (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ শিশুদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তাদের নিজেই প্রথমে সালাম দিতেন এবং তাদের খোঁজখবর নিতেন।(সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬২৪৭)
- মনোযোগ দিয়ে কথা শোনা:কোনো শিশু কথা বলতে এলে নবীজি ﷺ পুরো শরীর তার দিকে ফিরিয়ে মনোযোগ দিয়ে শুনতেন। মাঝপথে কখনো তাদের কথা কেটে দিতেন না।
- শিশুসুলভ কৌতুক ও হাসি-ঠাট্টা:হযরত আনাস (রা.)-এর ছোট ভাই আবু উমায়েরের একটি ছোট পাখি (নুগাইর) মারা গেলে রাসুলুল্লাহ ﷺ তাকে সান্ত্বনা দিয়ে ভালোবেসে বলতেন:"হে আবু উমায়ের! তোমার নুগাইর পাখির কী হলো?" (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬১২৯)
৫. ভুল করলে ধৈর্যের সঙ্গে সংশোধন: নববী সংশোধন পদ্ধতি
শিশুরা ভুল করবে—এটাই তাদের স্বভাব। ভুল না করলে তারা শিখবে কীভাবে? কিন্তু আজকের পিতা-মাতা শিশুর সামান্য ভুলে তীব্র চিৎকার করেন, মারধর করেন বা অপমান করেন। নবীজি ﷺ-এর পদ্ধতি ছিল এর সম্পূর্ণ বিপরীত।
হযরত উমর ইবনে আবি সালামাহ (রা.) বলেন:
"শৈশবে আমি রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর লালন-পালনে ছিলাম। খাওয়ার পাত্রে আমার হাত চারদিকে ঘুরত। তখন রাসুলুল্লাহ ﷺ আমাকে বললেন:
يَاغُلَامُ،سَمِّاللَّهَ،وَكُلْبِيَمِينِكَ،وَكُلْمِمَّايَلِيكَ
‘হে বৎস! বিসমিল্লাহ বলো, ডান হাত দিয়ে খাও এবং তোমার কাছের অংশ থেকে খাও।’ এরপর থেকে আমি সবসময় এভাবেই আহার করতাম।" (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৩৭৬; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২০২২)
হযরত আনাস (রা.) বলেন: "আমি দশ বছর নবীজি ﷺ-এর খেদমত করেছি। আল্লাহর কসম! তিনি কখনো আমার জন্য ‘উহ্’ শব্দ পর্যন্ত করেননি। আমি কোনো কাজ করলে তিনি কখনো বলেননি, ‘তুমি এ কাজ কেন করলে?’ কিংবা কোনো কাজ না করলে কখনো বলেননি, ‘তুমি এ কাজ কেন করলে না?’" (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৩০৯)
বর্তমান পিতা-মাতার জন্য শিক্ষা:
- জনসমক্ষে বা ভাই-বোনের সামনে সন্তানকে বকাঝকা করবেন না।
- রাগের মাথায় কোনো সিদ্ধান্ত বা শাস্তি দেবেন না।
- ভুল আচরণটি কেন ক্ষতিকর, তা একা ডেকে শান্তভাবে বুঝিয়ে বলুন।
৬. ইবাদত ও নৈতিক চরিত্র গঠনের সোনালি তরিকা
সন্তানকে ধার্মিক বানানোর জন্য শুধু নির্দেশ দেওয়াই যথেষ্ট নয়, বরং ধাপে ধাপে তাদের অভ্যস্ত করাতে হয়।
পবিত্র কুরআনে লোকমান হেকিমের উপদেশ উল্লেখ করে আল্লাহ বলেন:
يَابُنَيَّأَقِمِالصَّلَاةَوَأْمُرْبِالْمَعْرُوفِوَانْهَعَنِالْمُنكَرِوَاصْبِرْعَلَىٰمَاأَصَابَكَ
"হে আমার প্রিয় বৎস! সালাত কায়েম করো, সৎকাজের আদেশ দাও, অসৎকাজে নিষেধ করো এবং তোমার ওপর যে বিপদ আসে তাতে ধৈর্য ধারণ করো।" (সূরা লোকমান, ৩১:১৭)
নামাজের অভ্যাসের ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ ﷺ বয়স নির্ধারণ করে চমৎকার মনস্তাত্ত্বিক দিকনির্দেশনা দিয়েছেন:
"তোমাদের সন্তানদের বয়স যখন সাত বছর হয়, তখন তাদের সালাতের নির্দেশ দাও। আর যখন তাদের বয়স দশ বছর হয় (এবং সালাত না পড়ে), তখন তাদের শাসন করো এবং তাদের বিছানা আলাদা করে দাও।" (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৯৫)
এখানে ৭ থেকে ১০ বছর—এই দীর্ঘ ৩ বছরে একজন শিশুকে প্রায় পাঁচ হাজার বার নামাজের জন্য ভালোবাসার সাথে ডাকতে বলা হয়েছে। এটি নির্দেশ করে যে, দ্বীনি শিক্ষা জোরজবরদস্তির বিষয় নয়; বরং তা দীর্ঘমেয়াদি অনুশীলন ও অভ্যাসের বিষয়।
আরও পড়ুন: রাত্রিকালীন ধর্ম: ইসলামে রাতের তাৎপর্য
৭. সন্তানদের মাঝে সমতা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা
পিতা-মাতার অন্যতম মারাত্মক ভুল হলো সন্তানদের পরস্পরের মধ্যে তুলনা করা এবং একজনের চেয়ে অন্যজনকে বেশি সুযোগ-সুবিধা বা সম্পদ দেওয়া। এটি ভাই-বোনের মধ্যে আজীবন হিংসা ও দূরত্বের বীজ বপন করে।
হযরত নোমান ইবনে বশির (রা.)-কে তাঁর পিতা একটি বিশেষ উপহার দিতে চাইলে রাসুলুল্লাহ ﷺ জিজ্ঞাসা করলেন, "তুমি কি তোমার সকল সন্তানকে এরূপ উপহার দিয়েছ?" তিনি বললেন, "না।"
তখন নবীজি ﷺ বললেন:
فَاتَّقُوااللَّهَوَاعْدِلُوابَيْنَأَوْلَادِكُمْ
"তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং তোমাদের সন্তানদের মাঝে ন্যায়বিচার কায়েম করো।" (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৫৮৭; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৬২৩)
বর্তমান পিতা-মাতার জন্য শিক্ষা:
- পড়াশোনায় মেধা, চেহারা বা গায়ের রঙের ভিত্তিতে সন্তানদের মধ্যে পার্থক্য করবেন না।
- কখনো এক সন্তানের সামনে অন্য সন্তানের প্রশংসা করে তাকে ছোট করবেন না।
৮. কন্যাসন্তানের প্রতি বিশেষ ভালোবাসা ও মর্যাদা
জাহেলি যুগে কন্যাসন্তানকে অভিশাপ মনে করে জীবন্ত কবর দেওয়া হতো। মহানবী ﷺ কন্যাসন্তানকে জান্নাতের সুসংবাদ ও রহমত হিসেবে ঘোষণা করে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনেন।
রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন:
"যে ব্যক্তি দুইজন কন্যাসন্তানকে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত লালন-পালন ও উত্তম শিক্ষা প্রদান করল, কিয়ামতের দিন আমি এবং সে এভাবে থাকব—এই বলে তিনি তাঁর দুটি আঙুল মিলিয়ে দেখালেন।" (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬৩১)
নবীজি ﷺ তাঁর প্রিয় কন্যা হযরত ফাতিমা (রা.)-কে দেখলে দাঁড়িয়ে সম্মান জানাতেন, তাঁর কপালে চুমু খেতেন এবং নিজের বসার জায়গায় তাকে বসতে দিতেন। কন্যাদের প্রতি এই সম্মান প্রদর্শন প্রতিটি পিতার জন্য চিরন্তন আদর্শ।
৯. শিশুর মানসিক জগত ও সামর্থ্য বোঝার শিক্ষা
রাসুলুল্লাহ ﷺ কখনো শিশুদের ওপর অতিরিক্ত ভার চাপিয়ে দিতেন না। তিনি শিশুদের শিশুসুলভ আবেগ ও মানসিকতার গভীর যত্ন নিতেন।
- নামাজে শিশুর কান্নার খেয়াল:রাসুলুল্লাহ ﷺ নামাজ দীর্ঘ করার ইচ্ছা নিয়ে দাঁড়াতেন, কিন্তু পেছনের কাতার থেকে কোনো শিশুর কান্নার আওয়াজ পেলে নামাজ সংক্ষেপ করতেন—যাতে ওই শিশুর মায়ের কষ্ট না হয়।(সহিহ বুখারি, হাদিস: ৭০৭)
- সিজদায় নাতিদের খেলার স্বাধীনতা:নবীজি ﷺ সিজদায় থাকা অবস্থায় তাঁর দৌহিত্র হাসান বা হোসাইন (রা.) তাঁর পিঠে উঠে পড়লে, তিনি দীর্ঘক্ষণ সিজদায় থাকতেন এবং নিজে থেকে তাদের নামিয়ে দিতেন না।
১০. বর্তমান যুগের আধুনিক চ্যালেঞ্জ ও নববী আদর্শের বাস্তব প্রয়োগ
আজকের আধুনিক যুগে প্রযুক্তি ও সামাজিক ব্যস্ততা পারিবারিক সম্পর্কগুলোকে দুর্বল করে দিচ্ছে। নববী আদর্শের আলোকে এই সমস্যাগুলোর বাস্তব সমাধান নিচে আলোচনা করা হলো:
| বর্তমান যুগের সংকট | পিতা-মাতার সাধারণ ভুল | নববী আদর্শ অনুযায়ী কার্যকর সমাধান |
| মোবাইল ও স্ক্রিন আসক্তি | সন্তানকে শান্ত রাখতে হাতে ফোন ধরিয়ে দেওয়া | সন্তানকে স্ক্রিনের বিকল্প হিসেবে নিজের কোয়ালিটি সময় দিন ও গঠনমূলক খেলায় যুক্ত করুন। |
| সময়ের অভাব ও ব্যস্ততা | শুধু অর্থ ও খেলনা দিয়ে ভালোবাসা প্রকাশের চেষ্টা | প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় সন্তানের সাথে বসুন, তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনুন এবং একসাথে খাবার খান। |
| পড়াশোনার তীব্র চাপ | সবসময় জিপিএ-৫ বা ক্লাসে প্রথম হওয়ারজন্য মানসিক চাপ দেওয়া | ফলাফলের চেয়ে শিশুর চারিত্রিক সততা, মানবিক গুণ ও আন্তরিক চেষ্টার মূল্যায়ন করুন। |
| অতিরিক্ত ও কঠোর শাসন | সামান্য ভুলেই গায়ে হাত তোলা বা গালাগালি করা | রাগের সময় নিরব থাকুন; ভুল হলে পরবর্তীতে একা ডেকে ভালোবাসা ও যুক্তি দিয়ে বোঝান। |
| তুলনা করার মানসিকতা | "অমুকের সন্তান দেখো কত ভালো!" বলে খোঁচা দেওয়া | প্রতিটি সন্তানের মেধা ও স্বকীয়তাকে সম্মান দিন; তাদের নিজস্ব প্রতিভাকে বিকশিত হতে দিন। |
১১. আজকের বাবা-মায়ের জন্য মহানবী ﷺ-এর ১০টি সোনালি শিক্ষা
১.ভালোবাসা প্রকাশ্যে প্রকাশ করুন:সন্তানকে নিয়মিত জড়িয়ে ধরুন এবং মুখে বলুন যে আপনি তাকে ভালোবাসেন।
২.নিজে রোল মডেল হোন:সন্তানকে যে ভালো কাজের উপদেশ দেবেন, তা আগে নিজের জীবনে আমল করে দেখান।
৩.ধৈর্যের সাথে ভুল শোধরান:রাগান্বিত হয়ে চিৎকার বা মারধর না করে নম্র ভাষায় শিক্ষা দিন।
৪.ইনসাফ বজায় রাখুন:ভালোবাসা ও উপহার বণ্টনে সব সন্তানের প্রতি শতভাগ সমতা বজায় রাখুন।
৫.শিশুর কথা গুরুত্ব দিয়ে শুনুন:সন্তান যখন কোনো কথা বলে, তখন মোবাইল পাশে রেখে পুরো মনোযোগ তার দিকে দিন।
৬.কন্যাসন্তানের যত্ন নিন:কন্যাসন্তানকে পরম আদরে বড় করুন এবং তাকে উচ্চ নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করুন।
৭.ধাপে ধাপে ইবাদতে অভ্যস্ত করুন:শৈশব থেকেই নামাজের অভ্যাস গড়ে তুলুন—ভয় দেখিয়ে নয়, ভালোবাসা ও উৎসাহ দিয়ে।
৮.সন্তানের সামনে মিথ্যা বলবেন না:শিশুদের সাথে কোনো মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেবেন না; যা বলবেন তা পূরণ করুন।
৯.ইতিবাচক প্রশংসা করুন:সন্তানের ছোট ছোট ভালো কাজের অকুণ্ঠ প্রশংসা করুন।
১০.সন্তানের জন্য আন্তরিক দোয়া করুন:পিতা-মাতার দোয়া কখনো ফিরিয়ে দেওয়া হয় না; সন্তানের জন্য সবসময় হেদায়াত ও কল্যাণের দোয়া করুন।
১২. সন্তান প্রতিপালনে যেসব প্রচলিত ভুল থেকে আমাদের বাঁচতে হবে
সন্তান বড় করতে গিয়ে অবচেতনভাবেই আমরা কিছু মারাত্মক ভুল করে ফেলি, যা শিশুর ভবিষ্যৎ জীবনকে ক্ষতিগ্রস্ত করে:
- সন্তানকে অভিশাপ দেওয়া বা বদদোয়া করা:রাগের মাথায় অনেকে সন্তানকে বদদোয়া দেন। নবীজি ﷺ কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন:"তোমরা নিজেদের জন্য, তোমাদের সন্তানদের জন্য এবং তোমাদের সম্পদের জন্য বদদোয়া করো না।"(সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৩০০৯)
- দ্বীন ও দুনিয়ার মধ্যে অসম ভারসাম্য তৈরি করা:সন্তানকে পার্থিব ক্যারিয়ারের জন্য দিনরাত তাগিদ দেওয়া হলেও, সে নামাজ পড়ছে কি না বা কুরআন শিখছে কি না—তা নিয়ে চরম উদাসীন থাকা।
- শিশুকে জনসমক্ষে অপদস্থ করা:আত্মীয়স্বজন বা বন্ধুদের সামনে সন্তানের দোষত্রুটি নিয়ে কথা বলা তার আত্মবিশ্বাস স্থায়ীভাবে ভেঙে দেয়।
- অবাস্তব প্রত্যাশার বোঝা চাপিয়ে দেওয়া:নিজের অপূর্ণ স্বপ্নগুলো সন্তানের ওপর জোর করে চাপিয়ে দেওয়া থেকে বিরত থাকুন।
১৩. উপসংহার: সন্তান আমাদের দুনিয়ার আমানত ও আখিরাতের সম্পদ
সন্তান কেবল একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ নয়, তারা আমাদের ঈমান ও আখিরাতের পরম আমানত। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ পিতা-মাতাকে সতর্ক করে বলেছেন:
يَاأَيُّهَاالَّذِينَآمَنُواقُواأَنفُسَكُمْوَأَهْلِيكُمْنَارًا
"হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করো।" (সূরা আত-তাহরিম, ৬৬:৬)
মৃত্যুর পর যখন মানুষের সমস্ত আমলের দরজা বন্ধ হয়ে যায়, তখন কেবল নেক সন্তানের দোয়াই পিতা-মাতার কবরে আলোর দ্যুতি ছড়ায়। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"মানুষ যখন মৃত্যুবরণ করে তখন তার সমস্ত আমল বন্ধ হয়ে যায় তিনটি ছাড়া—সাদাকায়ে জারিয়া, এমন জ্ঞান যার দ্বারা মানুষ উপকৃত হয় এবং এমন সৎ সন্তান যে তার জন্য দোয়া করে।" (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৬৩১)
আসুন, আমরা আমাদের সন্তানদের পার্থিব সফলতার পাশাপাশি আখিরাতের সফলতার জন্য গড়ে তুলি। আসুন, আধুনিক মনস্তত্ত্বের কৃত্রিমতার পেছনে না ছুটেসন্তান প্রতিপালনে মহানবী ﷺ-এর দেখানো ভালোবাসা, সম্মান ও প্রজ্ঞার পথ অনুসরণ করি। তবেই গড়ে উঠবে একটি শান্তিময় পরিবার ও নৈতিক সমাজ।
বহুল জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)
১. সন্তানকে নামাজের নির্দেশ কোন বয়স থেকে দেওয়া উচিত?
উত্তর:রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহ অনুযায়ী সন্তানের বয়স সাত বছর হলে তাকে ভালোবাসা ও উৎসাহের সাথে নামাজের আদেশ দিতে হবে এবং দশ বছর বয়সে পৌঁছালে নিয়মিত নামাজের জন্য তাগিদ ও শাসন করতে হবে।(সুনানে আবু দাউদ: ৪৯৫)
২. ইসলামে সন্তানকে শারীরিক শাস্তি বা মারধরের ব্যাপারে কী বিধান রয়েছে?
উত্তর:ইসলামে সামান্য ভুলেই গায়ে হাত তোলা বা কঠোর শারীরিক শাস্তিকে কখনোই সমর্থন করা হয়নি। রাসুলুল্লাহ ﷺ কখনো কোনো শিশু বা সেবকের গায়ে হাত তোলেননি। সংশোধন করতে হবে নম্রতা, যুক্তি এবং মানসিক সংযোগের মাধ্যমে।
৩. একাধিক সন্তানের মধ্যে উপহার বা স্নেহের ক্ষেত্রে কীভাবে সমতা রাখা উচিত?
উত্তর:হাদিস অনুযায়ী সন্তানদের উপহার, সম্পদ এবং সুযোগ-সুবিধা প্রদানের ক্ষেত্রে শতভাগ ইনসাফ ও সমতা বজায় রাখা পিতা-মাতার জন্য ওয়াজিব। কোনো এক সন্তানকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া বা অন্যকে বঞ্চিত করা গুনাহের কাজ।
৪. আধুনিক যুগে সন্তানের মোবাইল আসক্তি কমাতে পিতা-মাতার কী করা উচিত?
উত্তর:সন্তানকে ডিভাইস কেড়ে নিয়ে বকাঝকা করার চেয়ে তাদের সাথে পিতা-মাতার পর্যাপ্ত ‘কোয়ালিটি টাইম’ কাটানো বেশি কার্যকর। নবীজির মতো তাদের গল্প শোনানো, একসাথে খেলাধুলা করা এবং গঠনমূলক কাজে ব্যস্ত রাখা সবচেয়ে সেরা উপায়।
৫. কন্যাসন্তান লালন-পালন করলে ইসলামে কী বিশেষ ফজিলত রয়েছে?
উত্তর:রাসুলুল্লাহ ﷺ সুসংবাদ দিয়েছেন যে, যে ব্যক্তি দুই বা ততোধিক কন্যাসন্তানকে দ্বীনি শিক্ষায় বড় করে তাদের দায়িত্ব পালন করবে, সে কিয়ামতের দিন নবীজি ﷺ-এর সাথে জান্নাতে পাশাপাশি অবস্থান করবে।(সহিহ মুসলিম: ২৬৩১)
আরো বিস্তারিত জানতে: শিশুর চরিত্র গঠনে নবীজির ﷺ সীরাত কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
মন্তব্য