fbpx fbpx fbpx
দাওয়াতুল ইসলাম ২৪
সোমবার, ০৫, অক্টোবর, ২০২৬ , ২০ আশ্বিন ১৪৩৩

নতুন বৈজ্ঞানিক জাগরণের অপেক্ষায় মুসলিম বিশ্ব, কোথায় সম্ভাবনা?

একসময় বাগদাদ, কায়রো, দামেস্ক, কর্ডোবা ও বুখারা ছিল জ্ঞানচর্চার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান, চিকিৎসাবিজ্ঞান, রসায়ন, ভূগোল ও আলোকবিজ্ঞানে মুসলিম মনীষীদের অবদান বিশ্ববিজ্ঞানের ইতিহাসে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে। আল-খাওয়ারিজমি, ইবনে আল-হাইসাম, ইবনে সিনা ও আল-বিরুনির মতো বিজ্ঞানীরা এমন এক সময়ে গবেষণা করেছেন, যখন বিশ্বের অনেক অঞ্চলে প্রাতিষ্ঠানিক বিজ্ঞানচর্চা এখনও সীমিত ছিল। কিন্তু সেই ঐতিহ্যের সঙ্গে বর্তমান মুসলিম বিশ্বের বৈজ্ঞানিক সক্ষমতার তুলনা করলে একটি বড় প্রশ্ন সামনে আসে: মুসলিম বিশ্ব কি আবার বিজ্ঞান ও উদ্ভাবনের শক্তিশালী কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারবে?

প্রশ্নটির উত্তর খুঁজতে হলে শুধু অতীতের গৌরবের দিকে তাকালে হবে না। প্রয়োজন বর্তমান গবেষণা অবকাঠামো, বিশ্ববিদ্যালয়ের মান, বিজ্ঞান শিক্ষায় বিনিয়োগ, গবেষকদের সুযোগ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং নতুন প্রযুক্তিতে মুসলিম দেশগুলোর অবস্থান বিশ্লেষণ করা। বাগদাদ থেকে আধুনিক গবেষণাগার আব্বাসীয় যুগে বাগদাদের ‘বায়তুল হিকমাহ’ জ্ঞানচর্চার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল।

গ্রিক, ফারসি ও ভারতীয় জ্ঞান আরবিতে অনূদিত হয় এবং মুসলিম পণ্ডিতরা সেই জ্ঞানকে শুধু সংরক্ষণ করেননি, বরং তার ওপর ভিত্তি করে নতুন গবেষণাও করেছেন। গণিতে আল-খাওয়ারিজমির কাজ পরবর্তী সময়ে বীজগণিতের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তার নাম থেকেই ‘algorithm’ শব্দটির উৎপত্তি।

ইবনে আল-হাইসাম আলোকবিজ্ঞান ও দৃষ্টিবিষয়ক গবেষণায় পরীক্ষানির্ভর পদ্ধতির ব্যবহার করেন। ইবনে সিনার চিকিৎসাবিষয়ক গ্রন্থ বহু শতাব্দী ধরে বিভিন্ন অঞ্চলে চিকিৎসাশিক্ষায় ব্যবহৃত হয়েছে। আল-বিরুনি পৃথিবীর পরিমাপ, জ্যোতির্বিজ্ঞান, ভূগোল ও বিভিন্ন সংস্কৃতি নিয়ে গবেষণায় অসাধারণ দক্ষতার পরিচয় দেন। এসব উদাহরণ দেখায়, ইসলামি সভ্যতার গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলোতে ধর্মীয় জ্ঞান ও প্রাকৃতিক জগতের অনুসন্ধানকে পরস্পরবিরোধী হিসেবে দেখা হয়নি।

কেন পিছিয়ে পড়ল মুসলিম বিশ্ব?

মুসলিম বিশ্বের বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির পথে একক কোনো কারণকে দায়ী করা যায় না। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, যুদ্ধ, ঔপনিবেশিক শাসনের দীর্ঘ প্রভাব, দুর্বল গবেষণা অবকাঠামো, মেধাপাচার এবং অনেক দেশে শিক্ষা ও গবেষণায় সীমিত বিনিয়োগ বিভিন্ন সময়ে ভূমিকা রেখেছে। আরেকটি বড় সমস্যা হলো বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানে গবেষণার পরিবেশ। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অগ্রগতির জন্য শুধু শিক্ষার্থী তৈরি করলেই হয় না; প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা, পরীক্ষাগার, আধুনিক যন্ত্রপাতি, গবেষণা অনুদান এবং স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ। বিশ্বের অনেক মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে উচ্চশিক্ষার বিস্তার ঘটলেও গবেষণার মান ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রকাশিত গবেষণার প্রভাব সব দেশে সমান নয়।

সম্ভাবনার নতুন ক্ষেত্র

তবে পরিস্থিতি পুরোপুরি হতাশাজনক নয়। কয়েকটি মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে বড় ধরনের বিনিয়োগ করছে। বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাত মহাকাশ গবেষণা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও উন্নত প্রযুক্তিতে বড় প্রকল্প হাতে নিয়েছে। দেশটির মহাকাশ কর্মসূচির মাধ্যমে মঙ্গলগ্রহ গবেষণা ও মহাকাশবিজ্ঞানে আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও গড়ে উঠেছে। সৌদি আরবও গবেষণা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জ্বালানি প্রযুক্তি ও বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ানোর চেষ্টা করছে।

তেলনির্ভর অর্থনীতি থেকে প্রযুক্তি ও জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে যাওয়ার পরিকল্পনার অংশ হিসেবেও এসব উদ্যোগকে দেখা হচ্ছে। মালয়েশিয়া দীর্ঘদিন ধরে উচ্চশিক্ষা, প্রকৌশল ও ইসলামি জ্ঞানচর্চার সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছে। তরুণদের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে আগ্রহী করে তুলতে দেশটিতে ইসলামি মূল্যবোধভিত্তিক বিজ্ঞান কর্মসূচিও চালু হয়েছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় নতুন সুযোগ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মুসলিম বিশ্বের জন্য নতুন একটি সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। AI গবেষণা, আরবি ভাষা প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি, জলবায়ু পূর্বাভাস এবং শিক্ষা প্রযুক্তিতে নতুন উদ্যোগ নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে আরবি ভাষাভিত্তিক AI ব্যবস্থার উন্নয়নে মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোর স্বাভাবিক সুবিধা রয়েছে। আরবি ভাষার বিশাল ডিজিটাল ডেটাসেট, ঐতিহাসিক পাণ্ডুলিপি ও ইসলামি জ্ঞানভাণ্ডারকে আধুনিক ভাষা প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত করা গেলে গবেষণার নতুন ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে। তবে এখানে শুধু প্রযুক্তি কেনার পরিবর্তে নিজস্ব গবেষক, প্রকৌশলী ও ডেটা বিজ্ঞানী তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।

মহাকাশ থেকে সবুজ প্রযুক্তি

মুসলিম বিশ্বের সম্ভাবনা শুধু AI-তে সীমাবদ্ধ নয়। মহাকাশ গবেষণা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, পানি ব্যবস্থাপনা, মরুভূমিতে কৃষি, সমুদ্রবিজ্ঞান ও জলবায়ু প্রযুক্তিতেও বড় সুযোগ রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর জন্য পানি সংকট একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ফলে লবণাক্ত পানি পরিশোধন, পানি পুনর্ব্যবহার ও কম শক্তি ব্যবহার করে পানি উৎপাদনের প্রযুক্তি সেখানে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যদিকে বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান ও অন্যান্য মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে জলবায়ু পরিবর্তন, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে গবেষণার বড় সুযোগ রয়েছে। অর্থাৎ মুসলিম বিশ্ব চাইলে নিজেদের বাস্তব সমস্যাকেই ভবিষ্যৎ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির গবেষণার প্রধান ক্ষেত্র বানাতে পারে।

তরুণ প্রজন্মই সবচেয়ে বড় শক্তি

মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার তরুণ জনগোষ্ঠী। বিপুলসংখ্যক তরুণকে যদি মানসম্মত বিজ্ঞান শিক্ষা, গবেষণার সুযোগ ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা দেওয়া যায়, তাহলে আগামী কয়েক দশকে বড় পরিবর্তন সম্ভব। এর জন্য স্কুল পর্যায় থেকেই গণিত, বিজ্ঞান, প্রোগ্রামিং ও গবেষণামুখী শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল নয়, সমস্যা সমাধান, গবেষণা ও উদ্ভাবনের ওপর গুরুত্ব বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে নারী শিক্ষার্থী ও নারী গবেষকদের অংশগ্রহণ বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ। একটি দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীর মেধাকে গবেষণার বাইরে রেখে কোনো দেশ দীর্ঘমেয়াদি বৈজ্ঞানিক শক্তিতে পরিণত হতে পারে না। শুধু অতীতের গৌরব নয়, ভবিষ্যতের গবেষণা মুসলিম বিশ্বের বৈজ্ঞানিক পুনর্জাগরণ নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে সবচেয়ে বড় ভুল হতে পারে শুধু অতীতের গৌরবের গল্প বলা।

আল-খাওয়ারিজমি বা ইবনে আল-হাইসামের অবদান অবশ্যই গর্বের বিষয়; কিন্তু আধুনিক বিশ্বে নেতৃত্ব দিতে হলে নতুন প্রজন্মকে নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করতে হবে। একটি শক্তিশালী গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়, আন্তর্জাতিক মানের পরীক্ষাগার, পর্যাপ্ত গবেষণা অনুদান এবং মেধাবীদের দেশে ধরে রাখার পরিবেশ ছাড়া সেই পুনর্জাগরণ সম্ভব নয়।

ইসলামের জ্ঞানচর্চার ঐতিহ্য

মুসলিম বিশ্বকে অনুপ্রেরণা দিতে পারে। কিন্তু অনুপ্রেরণাকে বাস্তব সাফল্যে রূপ দিতে হলে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি নীতি, গবেষণায় বিনিয়োগ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং প্রশ্ন করার স্বাধীনতা। সামনে যে সুযোগ বিশ্ব এখন চতুর্থ শিল্পবিপ্লব, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কোয়ান্টাম প্রযুক্তি, মহাকাশ গবেষণা, জৈবপ্রযুক্তি ও সবুজ জ্বালানির যুগে প্রবেশ করেছে। এই পরিবর্তনের সময়ে মুসলিম দেশগুলোর সামনে নতুন করে বিজ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে। প্রশ্নটি তাই শুধু ‘মুসলিম বিশ্ব আবার বিজ্ঞানচর্চায় ফিরবে কি না’ নয়। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত—কোন দেশ গবেষণায় বিনিয়োগ করবে, কোন বিশ্ববিদ্যালয় নতুন জ্ঞান তৈরি করবে এবং কোন প্রজন্ম আগামী দিনের বৈজ্ঞানিক সমস্যার সমাধান করবে?

একসময় মুসলিম সভ্যতা জ্ঞান অনুবাদ করে সংরক্ষণ করেছিল, নতুন তত্ত্ব তৈরি করেছিল এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের জ্ঞানকে একত্র করেছিল। আজকের মুসলিম বিশ্বের সামনে সুযোগ হলো সেই ঐতিহ্যকে আধুনিক গবেষণা, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের সঙ্গে যুক্ত করা। তাহলেই অতীতের বৈজ্ঞানিক গৌরব কেবল ইতিহাসের অধ্যায় হয়ে থাকবে না; তা ভবিষ্যতের বৈজ্ঞানিক অগ্রযাত্রার প্রেরণায় পরিণত হতে পারে।

মন্তব্য