চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়: পাহাড়-সবুজে বিস্তৃত জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র
১৯৬৬ থেকে ছয় দশকের পথচলা, ৯ অনুষদে বিস্তৃত উচ্চশিক্ষা, বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। পাহাড়, টিলা, বনভূমি ও সবুজের সমারোহে গড়ে ওঠা এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, বরং চট্টগ্রাম অঞ্চলের শিক্ষা, গবেষণা, সংস্কৃতি ও জ্ঞানচর্চার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। প্রায় ছয় দশকের পথচলায় প্রতিষ্ঠানটি দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির পাশাপাশি গবেষণা ও জ্ঞান সৃষ্টিতে নিজস্ব অবস্থান তৈরি করেছে।
১৯৬৬ সালের ১৮ নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। চট্টগ্রাম শহর থেকে প্রায় ২২ কিলোমিটার উত্তরে হাটহাজারী উপজেলার ফতেহপুর এলাকায় পাহাড়ি ও প্রাকৃতিক পরিবেশে গড়ে ওঠে এর মূল ক্যাম্পাস। শহরের ব্যস্ততা থেকে কিছুটা দূরে বিস্তৃত সবুজ ও পাহাড়ঘেরা পরিবেশ বিশ্ববিদ্যালয়টিকে দেশের অন্যান্য উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে।
প্রতিষ্ঠার সময় বাংলা, ইংরেজি, ইতিহাস ও অর্থনীতি বিভাগ নিয়ে একাডেমিক কার্যক্রম শুরু হলেও সময়ের সঙ্গে এর শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হয়েছে। বর্তমানে কলা ও মানববিদ্যা, বিজ্ঞান, ব্যবসায় প্রশাসন, সামাজিক বিজ্ঞান, আইন, জীববিজ্ঞান, প্রকৌশল, শিক্ষা, সামুদ্রিক বিজ্ঞান ও মৎস্য এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ে পড়াশোনার সুযোগ রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসিয়াল তথ্য অনুযায়ী বিভিন্ন অনুষদ, বিভাগ, ইনস্টিটিউট ও গবেষণাকেন্দ্রে স্নাতক, স্নাতকোত্তর এবং গবেষণাভিত্তিক উচ্চশিক্ষার সুযোগ রয়েছে।
বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার। বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তিনি ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন এবং বিভাগের চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করেছেন।
অধ্যাপক ইয়াহ্ইয়া আখতার রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। পরে কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ওয়াটারলু থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মাস্টার্স এবং অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব সিডনি থেকে পিএইচডি অর্জন করেন। তাঁর পিএইচডি গবেষণার বিষয় ছিল বাংলাদেশের নির্বাচন ও নির্বাচনী দুর্নীতি।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর শিক্ষকতা জীবন শুরু হয় ১৯৮২ সালে। পরে সহকারী অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক ও অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী তিনি ২০২২ সালে অধ্যাপক পদ থেকে অবসর নেন। পরবর্তী সময়ে ২০২৪ সালে উপাচার্যের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
রাষ্ট্রবিজ্ঞান, প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ, নির্বাচন, রাজনৈতিক দুর্নীতি ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি তাঁর গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সাময়িকীতে তাঁর গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে। তিনি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশেও গবেষণা ফেলো হিসেবে কাজ করেছেন।
কোন কোন বিষয়ে পড়ানো হয়
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক পরিসর অত্যন্ত বিস্তৃত। বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান অফিসিয়াল তালিকা অনুযায়ী এখানে ৯টি প্রধান অনুষদ রয়েছে। এগুলো হলো:
১. কলা ও মানববিদ্যা অনুষদ
২. বিজ্ঞান অনুষদ
৩. ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদ
৪. সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ
৫. আইন অনুষদ
৬. জীববিজ্ঞান অনুষদ
৭. প্রকৌশল অনুষদ
৮. শিক্ষা অনুষদ
৯. সামুদ্রিক বিজ্ঞান ও মৎস্য অনুষদ।
এ ছাড়া চিকিৎসাসংশ্লিষ্ট শিক্ষা ও গবেষণার জন্য মেডিসিন অনুষদ এবং বিভিন্ন বিশেষায়িত ইনস্টিটিউট রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসিয়াল একাডেমিক তালিকায় বিষয় ও ইনস্টিটিউটের বিস্তৃত পরিসর তুলে ধরা হয়েছে।
কলা ও মানববিদ্যা অনুষদ
কলা ও মানববিদ্যা অনুষদে ভাষা, সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শন, ধর্ম, সংস্কৃতি ও শিল্পকলাভিত্তিক নানা বিষয়ে পড়ানো হয়।
এই অনুষদের গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ ও প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে:
বাংলা, ইংরেজি, ইতিহাস, দর্শন, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি, আরবি, ইসলামিক স্টাডিজ, নাট্যকলা, ফারসি ভাষা ও সাহিত্য, পালি, সংস্কৃত, সংগীত, বাংলাদেশ স্টাডিজ, আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট, চারুকলা ইনস্টিটিউট।
অর্থাৎ ভাষা ও সাহিত্য থেকে ইতিহাস, ধর্মতত্ত্ব, সংস্কৃতি, সংগীত, নাট্যকলা ও চারুকলা পর্যন্ত বিস্তৃত মানবিক শিক্ষা এখানে পাওয়া যায়।
বিজ্ঞান অনুষদ
মৌলিক বিজ্ঞান ও প্রয়োগভিত্তিক বিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিষয় নিয়ে বিজ্ঞান অনুষদ গঠিত। এখানে রয়েছে:
পদার্থবিজ্ঞান
রসায়ন
গণিত
পরিসংখ্যান
অ্যাপ্লাইড কেমিস্ট্রি অ্যান্ড কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং
বিজ্ঞানভিত্তিক উচ্চশিক্ষার পাশাপাশি বন ও পরিবেশবিজ্ঞান এবং উন্নত গবেষণার জন্য জামাল নজরুল ইসলাম সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড রিসার্চও বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কাঠামোর অংশ।
ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদ
ব্যবসায় শিক্ষা ও করপোরেট ব্যবস্থাপনার জন্য চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদ গুরুত্বপূর্ণ। এখানে পড়ানো হয়:
হিসাববিজ্ঞান
ব্যবস্থাপনা
অর্থায়ন
মার্কেটিং
মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা
ব্যাংকিং ও বিমা
এই অনুষদের অধীনে স্নাতক পর্যায়ে ব্যবসায় প্রশাসন এবং উচ্চতর পর্যায়ে এমবিএসহ বিভিন্ন প্রোগ্রামের সুযোগ রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসিয়াল তথ্যে ব্যবসায় অনুষদের বিভাগগুলোতে বিবিএ ও এমবিএ কার্যক্রমের কথা উল্লেখ রয়েছে।
সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ
সমাজ, রাষ্ট্র, অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বোঝার জন্য সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এখানে রয়েছে:
অর্থনীতি
রাষ্ট্রবিজ্ঞান
সমাজবিজ্ঞান
লোকপ্রশাসন
নৃবিজ্ঞান
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক
যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা
অপরাধবিজ্ঞান ও পুলিশ সায়েন্স
উন্নয়ন অধ্যয়ন
বাংলাদেশের অর্থনীতি, প্রশাসন, রাজনীতি, সমাজ, গণমাধ্যম, অপরাধ ও উন্নয়ন নিয়ে পড়াশোনা ও গবেষণার সুযোগ এই অনুষদে রয়েছে।
আইন অনুষদ
আইন বিষয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য রয়েছে আইন অনুষদ। এর অধীনে আইন বিভাগ পরিচালিত হয়। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ ১৯৯২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বলে বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যভান্ডারে উল্লেখ রয়েছে।
জীববিজ্ঞান অনুষদ
জীববিজ্ঞান অনুষদে জীবজগত, পরিবেশ, অণুজীব, জৈবপ্রযুক্তি ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে শিক্ষা দেওয়া হয়। বিভাগগুলোর মধ্যে রয়েছে:
প্রাণিবিদ্যা
উদ্ভিদবিজ্ঞান
ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা
প্রাণরসায়ন ও অণুজীববিজ্ঞান
অণুজীববিজ্ঞান
মৃত্তিকাবিজ্ঞান
জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি
মনোবিজ্ঞান
ফার্মেসি
বিশেষ করে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং, বায়োটেকনোলজি, মাইক্রোবায়োলজি, প্রাণরসায়ন ও পরিবেশবিষয়ক গবেষণার কারণে এ অনুষদ আধুনিক বিজ্ঞানচর্চার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র তৈরি করেছে।
প্রকৌশল অনুষদ
প্রযুক্তি ও প্রকৌশল শিক্ষার জন্য চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে প্রকৌশল অনুষদ। এখানে প্রধানত পড়ানো হয়:
কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং
ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং
তথ্যপ্রযুক্তি, সফটওয়্যার, কম্পিউটিং, ইলেকট্রনিকস ও বিদ্যুৎ প্রকৌশলের আধুনিক জ্ঞান অর্জনের সুযোগ রয়েছে এসব বিষয়ে।
শিক্ষা অনুষদ
শিক্ষাবিজ্ঞান ও শিক্ষকতা-সম্পর্কিত উচ্চশিক্ষার জন্য রয়েছে শিক্ষা অনুষদ। এখানে শারীরিক শিক্ষা ও ক্রীড়াবিজ্ঞান এবং ইনস্টিটিউট অব এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চের মাধ্যমে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণভিত্তিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
সামুদ্রিক বিজ্ঞান ও মৎস্য অনুষদ
চট্টগ্রামের ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনায় এই অনুষদটির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। এখানে রয়েছে:
সামুদ্রিক বিজ্ঞান
সমুদ্রবিজ্ঞান
মৎস্য
বঙ্গোপসাগর, সামুদ্রিক সম্পদ, সমুদ্রের পরিবেশ, মৎস্যসম্পদ ও নীল অর্থনীতির মতো বিষয় নিয়ে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ এই ক্ষেত্রকে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
চিকিৎসাবিজ্ঞান ও বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে চিকিৎসাবিষয়ক শিক্ষা ও গবেষণারও সংযোগ রয়েছে। অফিসিয়াল একাডেমিক তালিকায় মেডিসিন অনুষদের অধীনে পেডিয়াট্রিকস এবং কমিউনিটি অপথালমোলজির মতো ক্ষেত্রের উল্লেখ রয়েছে। পাশাপাশি ইনস্টিটিউট অব কমিউনিটি অপথালমোলজি বিশেষায়িত চিকিৎসা ও গবেষণার সঙ্গে যুক্ত।
গবেষণার বিস্তৃত ক্ষেত্র
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান একাডেমিক কাঠামো শুধু শ্রেণিকক্ষের শিক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে গবেষণা ও প্রকাশনা সেল, গবেষণা কেন্দ্র, সেন্টার অব এক্সিলেন্স, বিশ্ববিদ্যালয় জার্নাল, স্নাতক ও স্নাতকোত্তর গবেষণা, গবেষণা তহবিল এবং আন্তঃবিষয়ক গবেষণার আলাদা কাঠামো রয়েছে।
চট্টগ্রামের ভৌগোলিক অবস্থান বিশ্ববিদ্যালয়টিকে গবেষণার ক্ষেত্রে বাড়তি সুবিধা দিয়েছে। পাহাড়, বন, জীববৈচিত্র্য, সমুদ্র, উপকূল, মৎস্য, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বিষয় এখানে গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় সামাজিক বিজ্ঞান, অর্থনীতি, রাজনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, সাংবাদিকতা, জীববিজ্ঞান, পরিবেশ, সমুদ্রবিজ্ঞান, প্রকৌশল ও মানবিক বিদ্যার বিভিন্ন শাখাও যুক্ত।
প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যের ক্যাম্পাস
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি এর প্রাকৃতিক পরিবেশ। পাহাড়ি ভূমি, টিলা, গাছপালা ও বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদ-প্রাণীর উপস্থিতির কারণে ক্যাম্পাসটি একটি গুরুত্বপূর্ণ জীববৈচিত্র্যপূর্ণ অঞ্চল হিসেবেও পরিচিত।
বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ওয়েবসাইটে ক্যাম্পাসের জন্য ‘Biological Hotspot’ নামে আলাদা অংশ রাখা হয়েছে। এর ফলে প্রকৃতি শুধু ক্যাম্পাসের সৌন্দর্যের অংশ নয়, শিক্ষা ও গবেষণারও গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
বিশেষ করে প্রাণিবিদ্যা, উদ্ভিদবিজ্ঞান, পরিবেশবিদ্যা, ভূগোল, মৃত্তিকাবিজ্ঞান, বন ও পরিবেশবিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের জন্য ক্যাম্পাসের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য বাস্তবভিত্তিক শিক্ষা ও গবেষণায় বাড়তি সুযোগ সৃষ্টি করে।
কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার ও একাডেমিক সুবিধা
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাঠামোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার। বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের পাশাপাশি অনলাইন একাডেমিক সেবা, কোর্স কারিকুলাম, শিক্ষার্থী পরামর্শ, বৃত্তি, গবেষণা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার জন্য পৃথক ব্যবস্থা রয়েছে।
শিক্ষার্থীদের জন্য আবাসিক হল, স্বাস্থ্যসেবা, পরিবহন, ক্রীড়া ও বিনোদন, বিভিন্ন ক্লাব, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম এবং ছাত্রসংগঠনের সুযোগও রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ওয়েবসাইটে ক্যাম্পাস লাইফের আওতায় আবাসিক হল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, পরিবহন, ক্লাব, ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও শিক্ষার্থী সংগঠনের পৃথক বিভাগ রাখা হয়েছে।
গবেষণা ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ
বর্তমান উচ্চশিক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আন্তর্জাতিক সহযোগিতা। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাঠামোতে আন্তর্জাতিক অ্যাডজাঙ্ক্ট শিক্ষক, সহযোগিতা ও শিক্ষার্থী বিনিময় কর্মসূচির ব্যবস্থাও রয়েছে। গবেষণার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব ও যৌথ গবেষণার সুযোগ বাড়ানোর ওপর বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিগত গুরুত্ব রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘোষিত ভিশন হলো বৈশ্বিক উচ্চশিক্ষায় আরও উঁচু অবস্থানে পৌঁছানো। এর মিশনের মধ্যে উন্নত জ্ঞান, সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা, গবেষণা, আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারত্ব এবং টেকসই উন্নয়নকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
কেন আলাদা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষত্ব কয়েকটি দিক থেকে আলাদা করে দেখা যায়।
প্রথমত, প্রাকৃতিক পরিবেশ। পাহাড় ও সবুজে ঘেরা বিস্তৃত ক্যাম্পাস শিক্ষার্থীদের জন্য স্বতন্ত্র একাডেমিক পরিবেশ তৈরি করেছে।
দ্বিতীয়ত, বিষয়বৈচিত্র্য। বাংলা, ইংরেজি, ইতিহাস, দর্শন থেকে পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, গণিত, কম্পিউটার বিজ্ঞান, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং, ফার্মেসি, আইন, অর্থনীতি, সাংবাদিকতা, ব্যবসায় প্রশাসন, সমুদ্রবিজ্ঞান ও মৎস্য পর্যন্ত বিস্তৃত বিষয়ে পড়ার সুযোগ রয়েছে।
তৃতীয়ত, গবেষণার বৈচিত্র্য। মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞান থেকে পরিবেশ, জীববিজ্ঞান, প্রকৌশল, সামুদ্রিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি পর্যন্ত বিভিন্ন ক্ষেত্রে গবেষণার সুযোগ রয়েছে।
চতুর্থত, চট্টগ্রামের ভৌগোলিক গুরুত্ব।
বন্দর, সমুদ্র, পাহাড়, বন, শিল্প ও বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল চট্টগ্রামে অবস্থিত হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষা ও গবেষণার সঙ্গে দেশের অর্থনীতি ও উন্নয়নের নানা ক্ষেত্রকে যুক্ত করার সুযোগ রয়েছে।
ছয় দশকের ঐতিহ্য, সামনে নতুন সম্ভাবনা
১৯৬৬ সালে চারটি বিভাগ নিয়ে যে প্রতিষ্ঠান যাত্রা শুরু করেছিল, সময়ের সঙ্গে সেটি দেশের অন্যতম বিস্তৃত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে এখানে মানবিক বিদ্যা, বিজ্ঞান, ব্যবসা, সামাজিক বিজ্ঞান, আইন, জীববিজ্ঞান, প্রকৌশল, শিক্ষা, সামুদ্রিক বিজ্ঞান ও চিকিৎসাসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ক্ষেত্রে পড়াশোনা ও গবেষণার সুযোগ রয়েছে।
বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতারের নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে শিক্ষা ও গবেষণার মান আরও উন্নত করা, আন্তর্জাতিক পরিসরে গবেষণার অবস্থান শক্তিশালী করা, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা সম্প্রসারণ এবং প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা বিজ্ঞান, জৈবপ্রযুক্তি, পরিবেশবিজ্ঞান, সামুদ্রিক প্রযুক্তি, জলবায়ু পরিবর্তন ও টেকসই উন্নয়নের মতো উদীয়মান ক্ষেত্রে গবেষণা বাড়াতে পারলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
পাহাড় ও সবুজে ঘেরা এই বিশ্ববিদ্যালয় তাই শুধু অতীতের ঐতিহ্যের স্মারক নয়। ছয় দশকের অভিজ্ঞতা ও বিস্তৃত একাডেমিক কাঠামোকে কাজে লাগিয়ে এটি বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা, গবেষণা ও উদ্ভাবনের ভবিষ্যৎ কেন্দ্রগুলোর একটি হয়ে ওঠার সম্ভাবনা ধারণ করছে।
মন্তব্য