fbpx fbpx fbpx
দাওয়াতুল ইসলাম ২৪
সোমবার, ০৫, অক্টোবর, ২০২৬ , ২০ আশ্বিন ১৪৩৩

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়: বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার ঐতিহাসিক কেন্দ্র

শতবর্ষের বেশি সময় ধরে শিক্ষা, গবেষণা, সংস্কৃতি ও জাতীয় জীবনে নেতৃত্বের প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার ইতিহাসে যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নাম সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাদের শীর্ষে। প্রতিষ্ঠার পর এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে দেশের শিক্ষা, গবেষণা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, রাজনীতি, ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে এই বিশ্ববিদ্যালয় গভীরভাবে যুক্ত।

জ্ঞানচর্চার পাশাপাশি জাতীয় চেতনা ও সামাজিক পরিবর্তনের বিভিন্ন পর্যায়েও প্রতিষ্ঠানটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ১৯২১ সালের ১ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠার সময় বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিল তিনটি অনুষদ, ১২টি বিভাগ, ৬০ জন শিক্ষক এবং ৮৭৭ জন শিক্ষার্থী। সময়ের সঙ্গে শিক্ষার পরিধি বাড়ার পাশাপাশি নতুন নতুন অনুষদ, বিভাগ, ইনস্টিটিউট ও গবেষণাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ ও বহুমাত্রিক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠার পেছনের ইতিহাস ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের পেছনে তৎকালীন পূর্ববঙ্গের শিক্ষা ও প্রশাসনিক বাস্তবতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের পর ঢাকাকে কেন্দ্র করে পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশ গঠিত হলে এ অঞ্চলে উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণের দাবি জোরালো হয়। বঙ্গভঙ্গ রদ হওয়ার পর ঢাকায় একটি আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন আলোচনা ও পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি হয়। ১৯২০ সালের ভারতীয় আইনসভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আইন পাস হয়। এর ভিত্তিতে ১৯২১ সালের ১ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয় আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে। প্রতিষ্ঠার সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাব্যবস্থায় আবাসিক হল গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে ছিল। পুরোনো ঢাকার বাইরে রমনা এলাকার বিস্তৃত সবুজ পরিবেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও আবাসিক অবকাঠামো গড়ে ওঠে।

ঐতিহাসিক কার্জন হলসহ বিভিন্ন স্থাপনা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাথমিক সময়ের স্থাপত্য ও শিক্ষা-ঐতিহ্যের স্মারক হয়ে রয়েছে। প্রথম দিকের একাডেমিক কাঠামো প্রতিষ্ঠার সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কলা, বিজ্ঞান ও আইনসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাক্ষেত্রের কার্যক্রম শুরু হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে বাংলা, সংস্কৃত, ইংরেজি, দর্শন, ইতিহাস, অর্থনীতি ও রাজনীতি, আরবি ও ইসলামি শিক্ষা, ফারসি ও উর্দুসহ মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয় পড়ানো হতো। বিজ্ঞান শিক্ষার ক্ষেত্রেও শুরু থেকেই পদার্থবিজ্ঞান, গণিত ও রসায়নের মতো মৌলিক বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল। সময়ের সঙ্গে এসব বিষয়ের পাশাপাশি জীববিজ্ঞান, ভূবিজ্ঞান, কম্পিউটার ও তথ্যপ্রযুক্তি, পরিসংখ্যানসহ নানা শাখায় শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারিত হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাঠামো ক্রমে এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞান থেকে শুরু করে বিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান, ব্যবসায় শিক্ষা, আইন, চারুকলা, প্রকৌশল ও প্রযুক্তি এবং আন্তঃবিষয়ক গবেষণার নানা ক্ষেত্র অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

কলা অনুষদ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচীনতম একাডেমিক ধারাগুলোর অন্যতম কলা অনুষদ। বাংলা ও সংস্কৃত, ইংরেজি, দর্শন, ইতিহাস, শিক্ষা, অর্থনীতি ও রাজনীতি, আরবি ও ইসলামি শিক্ষা এবং ফারসি ও উর্দুর মতো বিষয় দিয়ে এই অনুষদের একাডেমিক যাত্রা শুরু হয়।

বর্তমানে কলা অনুষদের অধীনে বাংলা, ইংরেজি, ইতিহাস, দর্শন, ইসলামিক ইতিহাস ও সংস্কৃতি, আরবি, ফারসি ভাষা ও সাহিত্য, উর্দু, সংস্কৃত, পালি ও বৌদ্ধ স্টাডিজ, তথ্যবিজ্ঞান ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন বিভাগ রয়েছে। বাংলা ভাষা, সাহিত্য, দর্শন, ইতিহাস ও সংস্কৃতি গবেষণায় এই অনুষদের দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। দেশের সাহিত্যিক, গবেষক, শিক্ষক, সাংবাদিক ও সংস্কৃতিকর্মী তৈরিতেও এর ভূমিকা উল্লেখযোগ্য।

বিজ্ঞান অনুষদ

বিজ্ঞান অনুষদের প্রাথমিক ভিত্তি ছিল পদার্থবিজ্ঞান, গণিত ও রসায়ন। পরবর্তীকালে বিজ্ঞান শিক্ষার ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটে। বর্তমানে মৌলিক বিজ্ঞান, প্রয়োগিক বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ রয়েছে।

পদার্থবিজ্ঞান, গণিত, রসায়ন, পরিসংখ্যান, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশলসহ বিভিন্ন শাখায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

মৌলিক বিজ্ঞান

গবেষণার পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তি ও আধুনিক বৈজ্ঞানিক গবেষণার ক্ষেত্রেও বিশ্ববিদ্যালয়টি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। জীববিজ্ঞান ও চিকিৎসাসংশ্লিষ্ট শিক্ষা জীববিজ্ঞানভিত্তিক উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায়ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে।

জীববিজ্ঞান

অনুষদের বিভিন্ন বিভাগে উদ্ভিদবিজ্ঞান, প্রাণিবিদ্যা, অণুজীববিজ্ঞান, প্রাণরসায়ন ও আণবিক জীববিজ্ঞান, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং ও বায়োটেকনোলজিসহ বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষা ও গবেষণা পরিচালিত হয়। স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের সঙ্গে সম্পর্কিত গবেষণাতেও এসব বিভাগের ভূমিকা রয়েছে।

জীবপ্রযুক্তি, জেনেটিক্স, অণুজীব, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্র ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে। সামাজিক বিজ্ঞান ও অর্থনীতি বাংলাদেশের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা বোঝার ক্ষেত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। অর্থনীতি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, সমাজবিজ্ঞান, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা, লোকপ্রশাসন, নৃবিজ্ঞান, উন্নয়ন অধ্যয়ন, জনসংখ্যাবিজ্ঞানসহ বিভিন্ন বিষয়ে এখানে শিক্ষা ও গবেষণা পরিচালিত হয়।

বিশেষ করে অর্থনীতি, রাজনীতি, প্রশাসন, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও গণমাধ্যম নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়টি দীর্ঘদিন ধরে দেশের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।

ব্যবসায় শিক্ষা

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বিকাশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যবসায় শিক্ষার পরিধিও বিস্তৃত হয়েছে। ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের অধীনে ব্যবস্থাপনা, হিসাববিজ্ঞান, মার্কেটিং, ফিন্যান্স, ব্যাংকিং ও বীমা, আন্তর্জাতিক ব্যবসা, ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমসসহ বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষা দেওয়া হয়। দেশের ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, করপোরেট খাত, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও উদ্যোক্তা তৈরিতে এ অনুষদের সাবেক শিক্ষার্থীদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে।

আইন শিক্ষা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন শিক্ষা বাংলাদেশের আইন ও বিচারব্যবস্থার ইতিহাসের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। আইন বিষয়ে স্নাতক ও উচ্চতর পর্যায়ের শিক্ষা ও গবেষণার মাধ্যমে বহু আইনজীবী, বিচারক, শিক্ষক, প্রশাসক ও নীতিনির্ধারক তৈরি হয়েছে। দেশের সংবিধান, আইন, মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক আইন এবং বিচারব্যবস্থা নিয়ে গবেষণায়ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

চারুকলা ও সৃজনশীল শিক্ষা

চারুকলা শিক্ষার ক্ষেত্রেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষ ঐতিহ্য রয়েছে। চিত্রকলা, ভাস্কর্য, গ্রাফিক ডিজাইন, প্রিন্টমেকিং, কারুশিল্পসহ বিভিন্ন সৃজনশীল শাখায় শিক্ষার্থীরা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। বাংলাদেশের চারুশিল্প, গ্রাফিক শিল্প ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ইতিহাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বাংলা নববর্ষের মঙ্গল শোভাযাত্রার মতো সাংস্কৃতিক আয়োজনও এই সৃজনশীল ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত।

শিক্ষা ও গবেষণার বিস্তৃত পরিসর

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈশিষ্ট্য শুধু এর বিপুল সংখ্যক বিভাগে নয়, বরং বিভিন্ন শাখার মধ্যে জ্ঞানচর্চার সংযোগেও। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, মানবিকবিদ্যা, সামাজিক বিজ্ঞান, ব্যবসা, আইন, চারুকলা ও জীববিজ্ঞানের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ইনস্টিটিউট ও গবেষণাকেন্দ্রে বিশেষায়িত শিক্ষা ও গবেষণা পরিচালিত হয়। তথ্যপ্রযুক্তি, পরিবেশ, জলবায়ু পরিবর্তন, উন্নয়ন, জনস্বাস্থ্য, ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে গবেষণার সুযোগ রয়েছে।

ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ আন্দোলনকে ব্যাপক গতি দেয়। ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম পরবর্তী সময়ে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে। ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন পর্যায়েও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর দমন-পীড়নের অন্যতম লক্ষ্য ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ বহু মানুষকে হত্যা করা হয়। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণ তাই একদিকে যেমন জ্ঞানচর্চার প্রতীক, অন্যদিকে তেমনি আত্মত্যাগ ও প্রতিরোধের স্মারক।

আবাসিক হল ও ক্যাম্পাস সংস্কৃতি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাজীবনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য এর আবাসিক হলভিত্তিক সংস্কৃতি। শিক্ষার্থীদের একাডেমিক জীবনের পাশাপাশি হলগুলোতে বিতর্ক, সাহিত্যচর্চা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, খেলাধুলা ও সামাজিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়। কার্জন হল, অপরাজেয় বাংলা, রাজু ভাস্কর্য, টিএসসি, কলাভবন, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থাপনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের পরিচিত প্রতীক হয়ে উঠেছে। টিএসসি দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। বিভিন্ন সংগঠন, বিতর্ক, নাটক, সংগীত ও সাংস্কৃতিক আয়োজন শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল বিকাশে ভূমিকা রাখে। জাতীয় জীবনে প্রভাব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা দেশের প্রশাসন, রাজনীতি, বিচারব্যবস্থা, শিক্ষা, গবেষণা, সাংবাদিকতা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ব্যবসা ও বিভিন্ন পেশায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। জাতীয় পর্যায়ের বহু নীতিনির্ধারক, শিক্ষক, বিজ্ঞানী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, শিল্পী ও পেশাজীবীর শিক্ষাজীবনের সঙ্গে এ প্রতিষ্ঠান যুক্ত। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাব শুধু এর সাবেক শিক্ষার্থীদের সাফল্যে সীমাবদ্ধ নয়। দেশের বিভিন্ন সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন, গবেষণা, নীতি-আলোচনা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দীর্ঘদিন ধরে একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে আসছে।

শতবর্ষ পেরিয়ে নতুন চ্যালেঞ্জ

এক শতাব্দীর বেশি সময়ের ঐতিহ্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় শক্তি হলেও বর্তমান বিশ্বের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিকস, ডেটা সায়েন্স, জীবপ্রযুক্তি, জলবায়ু পরিবর্তন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও আন্তঃবিষয়ক গবেষণার মতো নতুন ক্ষেত্র উচ্চশিক্ষার চাহিদা বদলে দিচ্ছে। এ কারণে ঐতিহ্য ধরে রাখার পাশাপাশি গবেষণার মান উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, আধুনিক ল্যাবরেটরি, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, শিল্প খাতের সঙ্গে সম্পর্ক এবং বৈশ্বিক একাডেমিক প্রতিযোগিতায় অবস্থান শক্তিশালী করা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।

কেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আলাদা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য এর দীর্ঘ ইতিহাস, বৈচিত্র্যময় শিক্ষাব্যবস্থা এবং জাতীয় জীবনের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক। দেশের অন্য অনেক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মতো শুধু নির্দিষ্ট কোনো একটি বিষয়ে সীমাবদ্ধ না থেকে এখানে মানবিকবিদ্যা থেকে মৌলিক বিজ্ঞান, সামাজিক বিজ্ঞান থেকে ব্যবসা, আইন থেকে চারুকলা এবং জীববিজ্ঞান থেকে প্রযুক্তি পর্যন্ত বিস্তৃত জ্ঞানচর্চার সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে এর সম্পৃক্ততা প্রতিষ্ঠানটিকে বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত করেছে।

ভবিষ্যতের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

এক শতাব্দীর বেশি সময় ধরে পরিবর্তিত বাংলাদেশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ও তার একাডেমিক কাঠামো ও গবেষণার ক্ষেত্র সম্প্রসারণ করেছে। আগামী দিনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তথ্যপ্রযুক্তি, জলবায়ু বিজ্ঞান, জীবপ্রযুক্তি, জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও সামাজিক পরিবর্তনের মতো নতুন ও জটিল বিষয়ে গবেষণা বাড়ানো প্রতিষ্ঠানটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে। বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার ইতিহাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাই শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম নয়। এটি দেশের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ, জাতীয় আন্দোলন, সাংস্কৃতিক চর্চা ও জ্ঞানসৃষ্টির এক দীর্ঘ ঐতিহাসিক ধারার প্রতীক। শতবর্ষ পেরিয়েও দেশের শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব অটুট রয়েছে।

মন্তব্য