fbpx fbpx fbpx
দাওয়াতুল ইসলাম ২৪
শনিবার, ০৩, অক্টোবর, ২০২৬ , ১৭ আশ্বিন ১৪৩৩

ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি: ওআইসির প্রযুক্তি শিক্ষার আন্তর্জাতিক ঠিকানা

গাজীপুরের বোর্ডবাজারে সবুজে ঘেরা পরিবেশে গড়ে উঠেছে ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি (আইইউটি)। অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কোঅপারেশনের (ওআইসি) অধীন পরিচালিত এই উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি বিজ্ঞান, প্রকৌশল, প্রযুক্তি, প্রযুক্তি ব্যবস্থাপনা এবং কারিগরি শিক্ষায় দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে কাজ করছে। বাংলাদেশে অবস্থান হলেও এর কার্যক্রমের পরিধি দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিস্তৃত।

ওআইসির সদস্যদেশগুলোর শিক্ষার্থীদের জন্য আন্তর্জাতিক উচ্চশিক্ষার সুযোগ তৈরি করেছে আইইউটি। বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়টির ক্যাম্পাসে গড়ে উঠেছে বহুজাতিক ও বৈচিত্র্যময় শিক্ষার পরিবেশ। একই সঙ্গে গবেষণা, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং ব্যবহারিক জ্ঞান অর্জনের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।

যেভাবে শুরু

ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির যাত্রা শুরু হয় প্রায় পাঁচ দশক আগে। ১৯৭৮ সালে সেনেগালের রাজধানী ডাকারে অনুষ্ঠিত ইসলামী পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের নবম সম্মেলনে কারিগরি ও প্রযুক্তিগত শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণকে এগিয়ে নিতে ‘ইসলামিক সেন্টার ফর টেকনিক্যাল অ্যান্ড ভোকেশনাল ট্রেনিং অ্যান্ড রিসার্চ’ বা আইসিটিভিটিআর প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

পরে বাংলাদেশ সরকার গাজীপুরে প্রতিষ্ঠানটির জন্য ৩০ একর জমি ওআইসিকে দেয়। ১৯৮১ সালের ২৭ মার্চ ওই জমিতে স্থাপনার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। অবকাঠামো নির্মাণের পর ১৯৮৬ সালে শুরু হয় একাডেমিক কার্যক্রম। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির পরিধি ও কার্যক্রম বাড়তে থাকে। ১৯৯৪ সালে ইসলামী পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের ২২তম সম্মেলনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আইসিটিভিটিআরের নাম পরিবর্তন করে ‘ইসলামিক ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি’ বা আইআইটি করা হয়।

পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রম আরও বিস্তৃত হয়। এর ধারাবাহিকতায় ২০০১ সালে ইসলামী পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের ২৮তম সম্মেলনে ‘ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি’ বা আইইউটি নামটি অনুমোদন পায়। এরপর থেকেই প্রতিষ্ঠানটি বর্তমান নামে পরিচিত।

প্রকৌশল ও প্রযুক্তিকেন্দ্রিক শিক্ষা

আইইউটির একাডেমিক কার্যক্রমের বড় অংশজুড়ে রয়েছে প্রকৌশল ও প্রযুক্তি শিক্ষা। বিশ্ববিদ্যালয়ে দুটি অনুষদের অধীনে সাতটি বিভাগ রয়েছে। প্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদের অধীনে রয়েছে যন্ত্র ও উৎপাদন প্রকৌশল, তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল এবং পুরকৌশল ও পরিবেশ প্রকৌশল বিভাগ।

অন্যদিকে বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষা অনুষদের অধীনে রয়েছে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা, ব্যবসা ও প্রযুক্তি ব্যবস্থাপনা এবং প্রাকৃতিক বিজ্ঞান বিভাগ। স্নাতক পর্যায়ের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি পর্যায়েও পড়াশোনার সুযোগ রয়েছে। বিভিন্ন প্রোগ্রামের মধ্যে রয়েছে প্রকৌশলে স্নাতক, ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতক, কারিগরি শিক্ষায় স্নাতক, স্নাতকোত্তর এবং পিএইচডি। প্রকৌশল ও প্রযুক্তিভিত্তিক বিষয়গুলোর পাশাপাশি ব্যবসা, প্রযুক্তি ব্যবস্থাপনা ও কারিগরি শিক্ষাকেও একাডেমিক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। ফলে প্রযুক্তিগত জ্ঞানের সঙ্গে ব্যবস্থাপনা ও শিক্ষাবিষয়ক দক্ষতা অর্জনের সুযোগ তৈরি হয়েছে শিক্ষার্থীদের জন্য।

গবেষণায় গুরুত্ব

আইইউটি শুধু শ্রেণিকক্ষের শিক্ষায় সীমাবদ্ধ নয়। গবেষণাকেও বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিশেষ করে স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা শিক্ষক ও গবেষকদের তত্ত্বাবধানে বিভিন্ন গবেষণা প্রকল্পে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পান। বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত সেমিনার, কর্মশালা, আলোচনা সভা, গবেষণা সম্মেলন, অনলাইন আলোচনা, আন্তর্জাতিক সম্মেলন ও স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। এসব আয়োজনের মাধ্যমে শিক্ষার্থী ও গবেষকদের নতুন প্রযুক্তি, গবেষণার পদ্ধতি এবং সমসাময়িক বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। প্রযুক্তিভিত্তিক বিভিন্ন প্রতিযোগিতায়ও আইইউটির শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন দল নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সাইবার নিরাপত্তা, রোবটিকস, রোবটিক রোভার ও মোটরস্পোর্টসের মতো ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছে।

বহুজাতিক শিক্ষার পরিবেশ

আইইউটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য এর আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীসমাজ। ওআইসির সদস্যদেশগুলোর শিক্ষার্থীরা এখানে পড়াশোনার সুযোগ পান। ফলে একই ক্যাম্পাসে বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীদের একসঙ্গে শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির কারণে আইইউটির শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক পরিবেশেও বৈচিত্র্য রয়েছে। শিক্ষার্থীরা একাডেমিক কার্যক্রমের পাশাপাশি বিভিন্ন সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও প্রযুক্তিগত কর্মকাণ্ডে অংশ নেন। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তির ব্যবস্থাও রয়েছে। নির্দিষ্ট যোগ্যতা ও প্রক্রিয়া অনুসরণ করে নির্বাচিত শিক্ষার্থীরা শিক্ষাব্যয়, আবাসন, খাবার ও চিকিৎসাসহ বিভিন্ন ধরনের সহায়তা পেতে পারেন। বৃত্তির সুযোগ ও শর্ত প্রোগ্রাম এবং ভর্তি প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করে।

বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের সুযোগ

স্বাগতিক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের জন্যও আইইউটিতে পড়াশোনার সুযোগ রয়েছে। বিভিন্ন প্রোগ্রামে ভর্তির জন্য নির্ধারিত যোগ্যতা পূরণের পাশাপাশি ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়। বাংলাদেশি আবেদনকারীদের জন্য জাতীয় শিক্ষাক্রম ও ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে যোগ্যতার পৃথক কাঠামো রয়েছে। ভর্তি প্রক্রিয়ায় বিজ্ঞান ও গণিতভিত্তিক শিক্ষাগত প্রস্তুতির পাশাপাশি নির্দিষ্ট একাডেমিক যোগ্যতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। অন্যদিকে ওআইসির সদস্যদেশগুলোর শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে আলাদা আন্তর্জাতিক ভর্তি প্রক্রিয়া। বৃত্তির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশের মনোনয়ন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে আবেদন করার সুযোগ রয়েছে। নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে স্ব-অর্থায়নেও পড়াশোনার সুযোগ পাওয়া যায়।

ক্যাম্পাস ও শিক্ষার পরিবেশ

গাজীপুরের বোর্ডবাজারে অবস্থিত আইইউটির ক্যাম্পাস শিক্ষার্থীদের জন্য আবাসিক ও একাডেমিক সুবিধাসমৃদ্ধ। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে রয়েছে একাডেমিক ভবন, গবেষণাগার, গ্রন্থাগার, আবাসিক ব্যবস্থা এবং শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন প্রয়োজনীয় সুবিধা। বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ক্যাম্পাসটির নকশার সঙ্গে তুরস্কের স্থপতি পামির মেহমেতের নাম যুক্ত রয়েছে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির সাবেক শিক্ষার্থী। একাডেমিক ভবনের পাশাপাশি আধুনিক গবেষণাগার ও গ্রন্থাগার শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ও গবেষণার কাজে সহায়তা করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রমে তাত্ত্বিক জ্ঞানের পাশাপাশি ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জনের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।

দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির লক্ষ্য

ওআইসির অধীনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় আইইউটির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য সদস্যদেশগুলোর জন্য দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা। বিজ্ঞান, প্রকৌশল, প্রযুক্তি, প্রযুক্তি ব্যবস্থাপনা ও কারিগরি শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ কর্মক্ষেত্রের জন্য প্রস্তুত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। শিক্ষা ও গবেষণার পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে পরামর্শ, কারিগরি পরামর্শসেবা ও পরীক্ষামূলক সেবা দেওয়ার কার্যক্রমও রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়টির। এর মাধ্যমে একাডেমিক জ্ঞানকে বাস্তবক্ষেত্রে প্রয়োগের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। প্রতিষ্ঠার পর কয়েক দশকে একটি কারিগরি ও প্রযুক্তি প্রশিক্ষণকেন্দ্র থেকে আন্তর্জাতিক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রূপ নিয়েছে আইইউটি। বাংলাদেশে এর অবস্থান হলেও বিশ্ববিদ্যালয়টির কার্যক্রমের সঙ্গে ওআইসির সদস্যদেশগুলোর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। প্রকৌশল ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, গবেষণা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির লক্ষ্য নিয়ে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে ওআইসির প্রযুক্তি ও উচ্চশিক্ষা সহযোগিতার অন্যতম প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করছে। বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীদের একই ক্যাম্পাসে পড়াশোনার সুযোগ এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার পরিবেশ আইইউটিকে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় একটি স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত করেছে।

মন্তব্য