fbpx fbpx fbpx
দাওয়াতুল ইসলাম ২৪
রবিবার, ০৪, অক্টোবর, ২০২৬ , ১৯ আশ্বিন ১৪৩৩

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষায় দেশের অগ্রণী প্রতিষ্ঠান শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

দেশের উচ্চশিক্ষায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (SUST)। সিলেটের কুমারগাঁওয়ে অবস্থিত এই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিজ্ঞান, প্রকৌশল, প্রযুক্তি ও গবেষণার ক্ষেত্রে নিজস্ব অবস্থান তৈরি করেছে। সময়ের সঙ্গে একাডেমিক পরিধি বাড়ার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়টি শিক্ষার্থীদের গবেষণা, উদ্ভাবন ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার ক্ষেত্রেও গুরুত্ব দিয়ে আসছে।

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি নাম Shahjalal University of Science and Technology। সংক্ষেপে এটি SUST নামে পরিচিত। ১৯৮৬ সালে বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ১৯৮৭ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে এর একাডেমিক কার্যক্রম শুরু হয়। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর উচ্চশিক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠিত দেশের প্রথম দিকের বিশেষায়িত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটি হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির রয়েছে আলাদা পরিচিতি।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকেন্দ্রিক শিক্ষার সূচনা

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষাব্যবস্থায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির গুরুত্ব দ্রুত বাড়তে থাকে। শিল্প, কৃষি, তথ্যপ্রযুক্তি ও যোগাযোগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দক্ষ জনশক্তির প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়। সেই বাস্তবতায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিভিত্তিক উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। প্রতিষ্ঠার সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসর তুলনামূলক ছোট হলেও ধীরে ধীরে এর শিক্ষা কার্যক্রম সম্প্রসারিত হয়েছে। বিজ্ঞান ও প্রকৌশলের পাশাপাশি বর্তমানে বিভিন্ন সামাজিক বিজ্ঞান, মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষার বিষয়ও এখানে পড়ানো হয়। ফলে প্রতিষ্ঠানটি একটি বহুমাত্রিক উচ্চশিক্ষা কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

সবুজে ঘেরা ক্যাম্পাস

সিলেট নগরের কুমারগাঁও এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয়টির ক্যাম্পাস অবস্থিত। সিলেটের প্রাকৃতিক পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে গড়ে ওঠা ক্যাম্পাসটি শিক্ষার্থীদের জন্য একটি স্বতন্ত্র একাডেমিক পরিবেশ তৈরি করেছে। ক্যাম্পাসে রয়েছে বিভিন্ন একাডেমিক ভবন, প্রশাসনিক ভবন, কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার, গবেষণাগার, আবাসিক হল, খেলার মাঠ ও অন্যান্য অবকাঠামো। শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ও আবাসিক সুবিধা নিশ্চিত করতে সময়ের সঙ্গে ক্যাম্পাসের অবকাঠামোগত উন্নয়নও করা হয়েছে।

প্রযুক্তি শিক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয়ের সঙ্গে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সরাসরি যুক্ত। প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই এ দুই ক্ষেত্রে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল, সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং, ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং, গণিত, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও পরিসংখ্যানসহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিভিন্ন বিষয়ে পড়াশোনার সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল এবং সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মতো বিষয়গুলো শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করেছে। এসব বিভাগ থেকে শিক্ষা নেওয়া অনেক গ্র্যাজুয়েট দেশের প্রযুক্তিখাতসহ বিভিন্ন পেশায় কাজ করছেন।

গবেষণায় গুরুত্ব

আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক গবেষণা। SUST-এ বিভিন্ন বিভাগে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা গবেষণামূলক কাজে যুক্ত রয়েছেন। বিজ্ঞান, প্রকৌশল, পরিবেশ, তথ্যপ্রযুক্তি, স্বাস্থ্য, সামাজিক বিজ্ঞানসহ নানা ক্ষেত্রে গবেষণা পরিচালিত হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কার্যক্রমের অন্যতম লক্ষ্য হলো দেশীয় সমস্যা ও সম্ভাবনাকে সামনে রেখে নতুন জ্ঞান তৈরি করা। প্রযুক্তিনির্ভর উদ্ভাবন, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার, পরিবেশগত সমস্যা এবং বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক বিষয়ে গবেষণার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বাস্তবমুখী দক্ষতা অর্জনের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের গবেষণার প্রতি আগ্রহী করতে বিভিন্ন সেমিনার, কর্মশালা, প্রতিযোগিতা ও গবেষণাভিত্তিক কার্যক্রম আয়োজন করা হয়। এতে একাডেমিক শিক্ষার পাশাপাশি বাস্তব সমস্যা সমাধানের সক্ষমতাও তৈরি হচ্ছে।

শিক্ষার্থীদের বহুমুখী কার্যক্রম

বিশ্ববিদ্যালয়জীবন শুধু শ্রেণিকক্ষের পাঠে সীমাবদ্ধ নয়। SUST-এর শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন সাংস্কৃতিক, সামাজিক, ক্রীড়া ও বিতর্কমূলক কর্মকাণ্ডে অংশ নেন। বিভিন্ন সংগঠন ও ক্লাবের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা নিজেদের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ পান। প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিযোগিতা, প্রোগ্রামিং, বিতর্ক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, খেলাধুলা ও সামাজিক কর্মকাণ্ড শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বগুণ ও দলগতভাবে কাজ করার দক্ষতা বাড়াতে সহায়তা করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সংগঠন শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা ও সামাজিক সচেতনতা বাড়াতেও ভূমিকা রাখে। ফলে একজন শিক্ষার্থী শুধু একাডেমিক জ্ঞান নয়, বরং যোগাযোগ, নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পান।

সিলেট অঞ্চলের উচ্চশিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র

সিলেট বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় উচ্চশিক্ষার অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠান। তবে শুধু সিলেট নয়, দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে শিক্ষার্থীরা এখানে ভর্তি হয়ে পড়াশোনা করেন। একটি মানসম্মত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে SUST সিলেট অঞ্চলে উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এর মাধ্যমে এই অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের দেশের অন্য প্রান্তে না গিয়েও বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

প্রযুক্তিনির্ভর

বাংলাদেশের জন্য দক্ষ জনশক্তি চতুর্থ শিল্পবিপ্লব, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিকস, ডেটা সায়েন্স ও সফটওয়্যার প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের সময়ে দক্ষ প্রযুক্তিবিদ তৈরির প্রয়োজন আরও বেড়েছে। এ বাস্তবতায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গুরুত্বও বাড়ছে। SUST-এর বিজ্ঞান ও প্রকৌশলভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম দেশের প্রযুক্তিখাতে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে ভূমিকা রাখছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা দেশ-বিদেশে উচ্চশিক্ষা ও পেশাগত ক্ষেত্রে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করছেন।

ঐতিহ্য ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

প্রতিষ্ঠার কয়েক দশকে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় দেশের উচ্চশিক্ষায় একটি স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির পাশাপাশি বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষা বিস্তারের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়টি সময়ের সঙ্গে নিজেকে পরিবর্তন করেছে। আগামী দিনে গবেষণার পরিধি বাড়ানো, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করা, প্রযুক্তিনির্ভর উদ্ভাবনকে উৎসাহ দেওয়া এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করা হলে প্রতিষ্ঠানটির সম্ভাবনা আরও বাড়বে।

বাংলাদেশ যখন জ্ঞানভিত্তিক ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন দক্ষ বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, গবেষক ও প্রযুক্তিবিদ তৈরিতে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষা, গবেষণা ও উদ্ভাবনের সমন্বয়ের মাধ্যমে SUST ভবিষ্যতেও দেশের উচ্চশিক্ষা ও প্রযুক্তিখাতে অবদান রাখার সক্ষমতা রাখে।

সিলেটের সবুজ পরিবেশে গড়ে ওঠা এই বিশ্ববিদ্যালয় তাই কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়; এটি দেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর উচ্চশিক্ষার বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যকে সামনে রেখে জ্ঞান, গবেষণা ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে প্রস্তুত করাই হতে পারে এর আগামী দিনের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা।

মন্তব্য