সরকারি মাদরাসা-ই-আলিয়া, ঢাকা: ২৪৬ বছরের ঐতিহ্যে উপমহাদেশের ইসলামী শিক্ষার পথচলা
বাংলাদেশের ধর্মীয় ও আধুনিক শিক্ষার ইতিহাসে সরকারি মাদরাসা-ই-আলিয়া, ঢাকা একটি ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান। কলকাতায় ১৭৮০ সালে যাত্রা শুরু করা এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দেশভাগের পর ঢাকায় স্থানান্তরিত হয়।
দীর্ঘ পথচলায় প্রতিষ্ঠানটি ইসলামী শিক্ষার পাশাপাশি ভাষা, সাধারণ শিক্ষা ও উচ্চতর জ্ঞানচর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। রাজধানীর বকশীবাজারে অবস্থিত এই মাদরাসার ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে উপমহাদেশে আলিয়া শিক্ষাব্যবস্থার বিকাশ এবং বাংলাদেশের মাদরাসা শিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক অগ্রযাত্রা।
কলকাতা থেকে ঢাকায় ঐতিহাসিক যাত্রা
সরকারি মাদরাসা-ই-আলিয়ার ইতিহাসের সূচনা ১৭৮০ সালের অক্টোবরে, তৎকালীন কলকাতায়। ব্রিটিশ শাসনামলে গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংসের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত কলকাতা আলিয়া মাদরাসার উদ্দেশ্য ছিল মুসলিম শিক্ষার্থীদের ধর্মীয় জ্ঞানের পাশাপাশি তৎকালীন প্রশাসন ও সমাজজীবনে প্রয়োজনীয় শিক্ষার সুযোগ তৈরি করা। প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ইতিহাসে বলা হয়েছে, শুরুর দিকে ভাড়া করা ভবনে মাত্র ৪০ জন শিক্ষার্থী নিয়ে পাঠদান শুরু হয়েছিল। আরবি ভাষা ও ইসলামী জ্ঞানে পারদর্শী মোল্লা মজদুদ্দিন প্রথম শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
প্রতিষ্ঠার পর ধীরে ধীরে এর পাঠ্যক্রম ও শিক্ষার পরিসর সম্প্রসারিত হয়। ধর্মীয় বিষয়ের পাশাপাশি ইংরেজি, ফারসি ও অন্যান্য বিষয়ে শিক্ষার সুযোগ যুক্ত হয়। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটি উপমহাদেশের মুসলিম সমাজে শিক্ষার প্রসার এবং আলিয়া ধারার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলার ক্ষেত্রে পরিচিতি অর্জন করে।
১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর কলকাতা আলিয়া মাদরাসা পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকায় স্থানান্তরিত হয়। প্রথম দিকে লক্ষ্মীবাজারে ইসলামিক ইন্টারমিডিয়েট কলেজের ভবনে এর কার্যক্রম পরিচালিত হতো। পরে রাজধানীর বকশীবাজারে স্থায়ী ক্যাম্পাস গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৯৫৮ সালের ১১ মার্চ নতুন ভবন ও ছাত্রাবাসের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। ১৯৬১ সালে প্রতিষ্ঠানটি বকশীবাজারের স্থায়ী ক্যাম্পাসে স্থানান্তরিত হয়।
মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর
এই স্থানান্তর ছিল শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ঠিকানা পরিবর্তন নয়; বরং পূর্ব বাংলায় আলিয়া শিক্ষার ধারাবাহিকতা রক্ষারও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। কলকাতার ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠানটি নতুন ভূখণ্ডে এসে নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের জন্য ধর্মীয় ও সাধারণ শিক্ষার সুযোগ অব্যাহত রাখে।
বকশীবাজারে ঐতিহ্যের স্থায়ী ঠিকানা
পুরান ঢাকার বকশীবাজারে অরফানেজ রোডে অবস্থিত সরকারি মাদরাসা-ই-আলিয়ার ক্যাম্পাসটি প্রতিষ্ঠানটির দীর্ঘ ইতিহাসের সাক্ষী। এর সরকারি ওয়েবসাইটে ঠিকানা হিসেবে ১ ও ২ অরফানেজ রোড, বকশীবাজার, চকবাজার, ঢাকা-১২১১ উল্লেখ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানের পরিচিতি নম্বর বা ইআইআইএন ১০৮১৫১।
বকশীবাজারের এই ক্যাম্পাসে শিক্ষা কার্যক্রমের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের আবাসন, ধর্মীয় অনুশীলন ও প্রাতিষ্ঠানিক কর্মকাণ্ডের পরিবেশ গড়ে উঠেছে। সময়ের সঙ্গে অবকাঠামো সম্প্রসারণের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের ইতিহাসে ১৯৭৮ সালে বিজ্ঞানাগার, মিলনায়তন ও বড় মসজিদসহ বিভিন্ন সুবিধা সম্প্রসারণের তথ্য উল্লেখ রয়েছে।
দীর্ঘ ইতিহাসের কারণে প্রতিষ্ঠানটির পরিচিতি শুধু ঢাকা শহরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শিক্ষার্থীরা এখানে পড়াশোনার সুযোগ খোঁজেন। তবে বর্তমান শিক্ষার্থীসংখ্যা, আবাসিক আসন এবং বিভাগভিত্তিক সক্ষমতা সম্পর্কে হালনাগাদ পরিসংখ্যান প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন।
ধর্মীয় ও সাধারণ শিক্ষার সমন্বয়
আলিয়া মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো ধর্মীয় শিক্ষার সঙ্গে সাধারণ শিক্ষার সমন্বয়। সরকারি মাদরাসা-ই-আলিয়ার শিক্ষাধারাতেও কোরআন, হাদিস, ফিকহ ও আরবি ভাষার মতো ধর্মীয় বিষয়গুলোর পাশাপাশি ভাষা এবং সমসাময়িক জ্ঞানচর্চার গুরুত্ব রয়েছে। প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব পরিচিতিতে ধর্মীয় ও আধুনিক শিক্ষার সমন্বয়কে এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
কোরআন ও হাদিস অধ্যয়নের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা ইসলামের মৌলিক শিক্ষা, ধর্মীয় বিধান ও নৈতিকতার বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করেন। ফিকহের পাঠে ইসলামী আইন ও বিধিবিধান সম্পর্কে ধারণা তৈরি হয়। আরবি ভাষা শেখার মাধ্যমে মূল ধর্মীয় গ্রন্থের বক্তব্য অনুধাবনের সুযোগ বাড়ে। অন্যদিকে বাংলা, ইংরেজি, বিজ্ঞান ও অন্যান্য সাধারণ বিষয়ের পাঠ শিক্ষার্থীদের বৃহত্তর শিক্ষাজগৎ ও কর্মক্ষেত্রের সঙ্গে পরিচিত হতে সহায়তা করে।
শিক্ষার এই সমন্বিত ধারা বর্তমান সময়ে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ধর্মীয় জ্ঞানের পাশাপাশি ভাষাগত দক্ষতা, বিশ্লেষণী চিন্তা, তথ্য যাচাই এবং প্রযুক্তির ব্যবহার জানা থাকলে শিক্ষার্থীরা সমাজে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন। ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে সরকারি মাদরাসা-ই-আলিয়ার সামনে তাই নিজস্ব শিক্ষাধারা অক্ষুণ্ন রেখে আধুনিক শিক্ষার চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রাখার সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশের মাদরাসা শিক্ষাবোর্ডের সঙ্গে সম্পর্ক
সরকারি মাদরাসা-ই-আলিয়ার ইতিহাস বাংলাদেশের মাদরাসা শিক্ষার প্রশাসনিক বিকাশের সঙ্গেও যুক্ত। বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের ইতিহাস অনুযায়ী, ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর মাদরাসা শিক্ষাকে যুগোপযোগী ও কর্মমুখী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে ঢাকার সরকারি মাদরাসা-ই-আলিয়া ক্যাম্পাসে বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের কার্যক্রম শুরু হয়। ১৯৭৮ সালে মাদরাসা শিক্ষা অধ্যাদেশের মাধ্যমে বোর্ড পুনর্গঠিত হয় এবং ১৯৭৯ সালের জুনে এটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।
বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড
এই ঘটনাপ্রবাহ থেকে বোঝা যায়, প্রতিষ্ঠানটি শুধু শিক্ষার্থী গড়ে তোলার ক্ষেত্রেই নয়, দেশের আলিয়া শিক্ষাব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশের ইতিহাসেও গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের কার্যক্রমের সঙ্গে একই ক্যাম্পাসের সম্পর্ক এর ঐতিহাসিক গুরুত্বকে আরও বাড়িয়েছে।
তবে শিক্ষা বোর্ডের কার্যক্রম এবং মাদরাসার নিজস্ব পাঠদান ও প্রশাসন পৃথক বিষয়। প্রতিষ্ঠানটির ইতিহাস তুলে ধরার ক্ষেত্রে এ পার্থক্য স্পষ্ট রাখা প্রয়োজন।
উচ্চতর শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার সুযোগ
সরকারি মাদরাসা-ই-আলিয়ার শিক্ষা কার্যক্রমের পরিসর উচ্চতর ধর্মীয় শিক্ষার সঙ্গেও যুক্ত। প্রতিষ্ঠানের ইতিহাসে কামিল পর্যায়ের শিক্ষার উল্লেখ রয়েছে। এর পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক গ্রন্থাগার ও পাঠ্যসহায়ক পরিবেশ শিক্ষার্থীদের অধ্যয়নকে সমৃদ্ধ করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
গ্রন্থাগার একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ধর্মীয় গ্রন্থ, ব্যাখ্যাগ্রন্থ, ইতিহাস, ভাষা ও সমসাময়িক বিষয়ে নির্ভরযোগ্য বইয়ের সংগ্রহ থাকলে শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষের পাঠের বাইরে নিজের আগ্রহ অনুযায়ী জ্ঞান অর্জন করতে পারেন। একই সঙ্গে গবেষণার প্রাথমিক ধারণা, তথ্যসূত্র যাচাই এবং বিভিন্ন মতের তুলনামূলক বিশ্লেষণের অভ্যাস গড়ে ওঠে।
এ ক্ষেত্রে গ্রন্থাগারের বর্তমান বইয়ের সংখ্যা, ডিজিটাল সুবিধা ও গবেষণার কার্যক্রম সম্পর্কে নির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিষ্ঠানটির জ্ঞানচর্চার পরিসর আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরা সম্ভব হবে।
ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিকতার চ্যালেঞ্জ
দীর্ঘ ইতিহাস থাকা একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য ঐতিহ্য সংরক্ষণের পাশাপাশি শিক্ষার মান উন্নয়নও জরুরি। বর্তমান সময়ে শিক্ষার্থীদের সামনে প্রতিযোগিতামূলক উচ্চশিক্ষা, প্রযুক্তিনির্ভর কর্মক্ষেত্র এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল তথ্যজগতের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে এগিয়ে যেতে হলে ধর্মীয় ও সাধারণ শিক্ষার ভারসাম্য বজায় রাখার পাশাপাশি পাঠদানের মান, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, গ্রন্থাগার, বিজ্ঞানচর্চা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধিতে গুরুত্ব দিতে হবে।
শিক্ষার্থীদের মধ্যে নৈতিকতা, সততা, দায়িত্ববোধ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার চর্চাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ধর্মীয় শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য কেবল পাঠ্যবিষয়ে দক্ষতা অর্জন নয়; বরং জ্ঞানকে দায়িত্বশীলভাবে কাজে লাগানোর মানসিকতা তৈরি করাও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সরকারি মাদরাসা-ই-আলিয়ার মতো ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য তাই অতীতের গৌরবের পাশাপাশি বর্তমান কার্যক্রমের স্বচ্ছতা, শিক্ষার মানের ধারাবাহিক উন্নয়ন এবং শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ প্রস্তুতিকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
কলকাতায় ১৭৮০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়ে ১৯৪৭ সালে ঢাকায় স্থানান্তরিত সরকারি মাদরাসা-ই-আলিয়া আজ উপমহাদেশের আলিয়া শিক্ষার দীর্ঘ ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। বকশীবাজারের স্থায়ী ক্যাম্পাস, ধর্মীয় ও সাধারণ শিক্ষার সমন্বিত ধারা এবং বাংলাদেশের মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের ইতিহাসের সঙ্গে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠানটির গুরুত্বকে বিশেষভাবে তুলে ধরে।
প্রতিষ্ঠানটির ঐতিহ্য সংরক্ষণের পাশাপাশি সময়োপযোগী শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এর ভূমিকা আরও বিস্তৃত হতে পারে। ইতিহাসের ধারাবাহিকতা, মানসম্মত পাঠদান এবং জ্ঞানচর্চার সমন্বয়ই পারে সরকারি মাদরাসা-ই-আলিয়াকে আগামী দিনেও দেশের ইসলামী ও সাধারণ শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে এগিয়ে নিতে।
মন্তব্য