fbpx fbpx fbpx
দাওয়াতুল ইসলাম ২৪
বুধবার, ১৪, অক্টোবর, ২০২৬ , ২৯ আশ্বিন ১৪৩৩
কুরআন প্রজেক্টে হাদিয়া দিন

বিজ্ঞানময় কোরআনে পানির তাৎপর্য ও ইসলামে এর গুরুত্ব

পৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্ব, মানবসভ্যতার বিকাশ, কৃষি, পরিবেশের ভারসাম্য এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষার সঙ্গে পানির সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। পানি ছাড়া মানুষের জীবন যেমন অচল, তেমনি উদ্ভিদ, প্রাণী ও অধিকাংশ পরিচিত জীবের অস্তিত্বও কল্পনা করা যায় না। আধুনিক বিজ্ঞান পানির রাসায়নিক গঠন, জীবদেহে এর ভূমিকা, বৃষ্টিপাত, জলচক্র এবং পরিবেশের ওপর এর প্রভাব সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছে।

অন্যদিকে, পবিত্র কোরআনে পানিকে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, আল্লাহর নিয়ামত এবং সৃষ্টিজগতের নিদর্শন হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। ইসলামে পানি কেবল তৃষ্ণা নিবারণ কিংবা দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানোর উপকরণ নয়। অজু, গোসল, পবিত্রতা অর্জন, ইবাদত এবং মানবকল্যাণের সঙ্গে পানির গভীর সম্পর্ক রয়েছে। হাদিসেও পানি ব্যবহারে সংযম, তৃষ্ণার্ত প্রাণীর প্রতি দয়া এবং মানুষের উপকারে এগিয়ে আসার শিক্ষা পাওয়া যায়।

তাই কোরআনের আয়াত, মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সা.)-এর হাদিস এবং আধুনিক বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের আলোকে পানির গুরুত্ব পর্যালোচনা করলে প্রকৃতির এই অমূল্য সম্পদ সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

কোরআনে পানি: জীবনের অন্যতম ভিত্তি

পানির গুরুত্ব সম্পর্কে পবিত্র কোরআনের অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্য রয়েছে সূরা আল-আম্বিয়ার ৩০ নম্বর আয়াতে। আল্লাহ বলেন, ‘আর প্রাণবান সবকিছু সৃষ্টি করলাম পানি থেকে। তবুও কি তারা ঈমান আনবে না?’

আয়াতটি জীবনের সঙ্গে পানির গভীর সম্পর্কের প্রতি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। আধুনিক জীববিজ্ঞানের দৃষ্টিতেও পানি জীবনের অপরিহার্য উপাদান। জীবদেহের কোষে বিভিন্ন রাসায়নিক বিক্রিয়া সংঘটিত হওয়া, পুষ্টি পরিবহন, দেহের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং বর্জ্য অপসারণে পানি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পৃথিবীতে পরিচিত জীবের স্বাভাবিক কার্যক্রম পানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। -

তবে আয়াতটির ধর্মীয় তাৎপর্যকে জীবনের উৎপত্তি সম্পর্কে আধুনিক বিজ্ঞানের প্রতিটি প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ উত্তর হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক নয়। কোরআনের বক্তব্য মানুষকে সৃষ্টিজগতের নিদর্শন নিয়ে চিন্তা করতে, জীবনের গুরুত্ব উপলব্ধি করতে এবং সৃষ্টিকর্তার ক্ষমতা সম্পর্কে ভাবতে আহ্বান জানায়। আর বিজ্ঞান পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষা ও গবেষণার মাধ্যমে পানির সঙ্গে জীবনের সম্পর্ক ব্যাখ্যা করে।

সূরা আন-নূরের ৪৫ নম্বর আয়াতেও পানির মাধ্যমে জীব সৃষ্টি করার কথা বলা হয়েছে। একই আয়াতে বিভিন্ন ধরনের প্রাণীর চলাচল ও সৃষ্টির বৈচিত্র্যের উল্লেখ রয়েছে। এর মাধ্যমে জীবজগতের বিস্ময়কর বৈচিত্র্য সম্পর্কে মানুষের চিন্তার সুযোগ তৈরি হয়।

পানির গুরুত্ব শুধু জীবদেহের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নয়। পৃথিবীর নদী, সমুদ্র, হ্রদ, জলাভূমি এবং ভূগর্ভস্থ জলাধার অসংখ্য জীবের আবাসস্থল। জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণী থেকে শুরু করে স্থলভাগের জীববৈচিত্র্য পর্যন্ত প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পানির ওপর নির্ভরশীল। এ কারণে পানিকে জীবন ও প্রকৃতির অন্যতম মৌলিক উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

বৃষ্টির পানি, কৃষি ও কোরআনের তাৎপর্য

পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন আয়াতে আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষণ, মৃতপ্রায় ভূমিকে সজীব করা এবং সেই পানির মাধ্যমে ফসল উৎপন্ন হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সূরা আয-যুমারের ২১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ আকাশ থেকে পানি বর্ষণ, তা ভূমিতে প্রবাহিত করা এবং সেই পানি দিয়ে বিভিন্ন রঙের ফসল উৎপন্ন হওয়ার কথা বলেছেন।

আয়াতটির মধ্যে প্রকৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারাবাহিকতা তুলে ধরা হয়েছে। বৃষ্টির পানি মাটিতে প্রবেশ করে, নদী-নালা ও জলাশয়কে সমৃদ্ধ করে এবং উদ্ভিদের বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। কৃষি উৎপাদন, খাদ্যনিরাপত্তা ও মানুষের জীবিকা রক্ষায় এই প্রক্রিয়ার ভূমিকা অপরিসীম। আধুনিক বিজ্ঞান বৃষ্টিপাতের প্রক্রিয়াকে জলচক্রের অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করে। সমুদ্র, নদী, হ্রদ ও মাটি থেকে পানি বাষ্পীভূত হয়ে বায়ুমণ্ডলে ওঠে। পরে ঘনীভূত হয়ে মেঘ তৈরি করে এবং উপযুক্ত পরিবেশে বৃষ্টি বা অন্য ধরনের বৃষ্টিপাত হিসেবে পৃথিবীতে ফিরে আসে। এই প্রক্রিয়া পৃথিবীর পানির পুনর্বণ্টন এবং জলজ ও স্থলজ বাস্তুতন্ত্র সচল রাখতে সাহায্য করে।

কোরআনে বৃষ্টি ও ফসলের উল্লেখ মুসলমানদের কাছে আল্লাহর নিয়ামত উপলব্ধি করার গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। কৃষকের মাঠে ফসল উৎপাদন, ফলের বাগানে ফলন এবং তৃষ্ণার্ত ভূমির সজীব হয়ে ওঠা মানুষের জীবনধারণের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। এসব নিয়ামতের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা এবং এগুলোর অপচয় না করা ইসলামের নৈতিক শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

তবে কোরআনের বর্ণনাকে আধুনিক জলচক্রের প্রতিটি বৈজ্ঞানিক ধাপের সরাসরি পাঠ্যবই হিসেবে না দেখে এর ধর্মীয় বক্তব্য, প্রকৃতির নিদর্শন এবং মানুষের চিন্তার আহ্বানকে গুরুত্ব দিয়ে বোঝা প্রয়োজন।

পানির বৈজ্ঞানিক বৈশিষ্ট্য ও জীবনের জন্য অপরিহার্যতা

পানির রাসায়নিক সংকেত H₂O। এর প্রতিটি অণুতে দুটি হাইড্রোজেন পরমাণু ও একটি অক্সিজেন পরমাণু থাকে। পানির বিশেষ ভৌত ও রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য পৃথিবীতে জীবনের বিকাশ ও টিকে থাকার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

মানবদেহের ওজনের প্রায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ পানি হতে পারে। বয়স, শারীরিক গঠন ও অন্যান্য বিষয়ের ওপর এ অনুপাত নির্ভর করে। রক্তের মাধ্যমে পুষ্টি পরিবহন, শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, হজম, বিভিন্ন রাসায়নিক বিক্রিয়া এবং কিডনির মাধ্যমে বর্জ্য অপসারণে পানি প্রয়োজন। শরীরে পানির ঘাটতি হলে তৃষ্ণা, দুর্বলতা, মাথা ঘোরা এবং গুরুতর ক্ষেত্রে বিভিন্ন অঙ্গের কার্যক্রমে জটিলতা দেখা দিতে পারে। পানি উদ্ভিদের জন্যও অপরিহার্য। উদ্ভিদ শিকড়ের মাধ্যমে মাটি থেকে পানি ও দ্রবীভূত খনিজ উপাদান গ্রহণ করে। সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় পানি ব্যবহার করে উদ্ভিদ সূর্যালোকের শক্তির সাহায্যে খাদ্য তৈরি করে এবং অক্সিজেন নির্গত করে। এই অক্সিজেন মানুষসহ অসংখ্য জীবের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয়।

পৃথিবীর তাপমাত্রা ও জলবায়ু নিয়ন্ত্রণেও পানির ভূমিকা রয়েছে। সমুদ্রের পানি বিপুল পরিমাণ তাপ ধারণ করতে পারে। সমুদ্রস্রোত ও বায়ুমণ্ডলীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাপের বণ্টন ঘটে, যা বিভিন্ন অঞ্চলের জলবায়ুকে প্রভাবিত করে। একই সঙ্গে পানি বাষ্পীভবন, ঘনীভবন ও বৃষ্টিপাতের মধ্য দিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।

পানির এসব বৈজ্ঞানিক বৈশিষ্ট্য মানুষের সামনে প্রকৃতির জটিলতা ও পারস্পরিক নির্ভরতার চিত্র তুলে ধরে। কোরআনের সৃষ্টিজগত নিয়ে চিন্তা করার আহ্বানের সঙ্গে এই উপলব্ধির একটি তাৎপর্যপূর্ণ যোগসূত্র রয়েছে। ধর্মীয় দৃষ্টিতে প্রকৃতি আল্লাহর সৃষ্টির নিদর্শন; আর বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে প্রকৃতির নিয়ম পর্যবেক্ষণ ও গবেষণার বিষয়।

ইসলামে পানি পবিত্রতা ও ইবাদতের মাধ্যম

ইসলামে পানির অন্যতম প্রধান গুরুত্ব হলো পবিত্রতা অর্জন। নামাজ আদায়ের আগে অজু করা এবং নির্দিষ্ট অবস্থায় গোসল করা মুসলমানদের ইবাদতজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পবিত্র কোরআনের সূরা আল-মায়িদার ৬ নম্বর আয়াতে অজু ও গোসলের বিধান উল্লেখ করা হয়েছে। একই আয়াতে পানি না পাওয়া কিংবা পানি ব্যবহারে অক্ষমতার পরিস্থিতিতে তায়াম্মুমের বিধানও রয়েছে।

এ থেকে বোঝা যায়, ইসলামে বাহ্যিক পবিত্রতা ও ইবাদতের মধ্যে পানির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। একই সঙ্গে পানি ব্যবহারে অক্ষম ব্যক্তির জন্য বিকল্প বিধান থাকায় ইসলামের বিধানে বাস্তব পরিস্থিতি ও মানুষের সামর্থ্যকেও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।

অজু ও গোসলের জন্য পানি ব্যবহার শুধু দৈনন্দিন পরিচ্ছন্নতার বিষয় নয়, বরং তা ধর্মীয় অনুশীলনের অংশ। ফলে পানি বিশুদ্ধ রাখা, ব্যবহারের উপযোগী রাখা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করা মুসলমানদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

হাদিসে পানির ব্যবহার সম্পর্কে সংযমের শিক্ষাও পাওয়া যায়। সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে, নবী হযরত মোহাম্মদ (সা.) অজুর জন্য এক মুদ এবং গোসলের জন্য এক সা পরিমাণ পানি ব্যবহার করতেন। এসব ঐতিহাসিক পরিমাপের আধুনিক লিটার-সমমান নির্ধারণে কিছুটা তারতম্য হতে পারে। তবে বর্ণনাটির গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, পবিত্রতা অর্জনের জন্য অতিরিক্ত পানি ব্যয় করা আবশ্যক নয়।

বর্তমান সময়ে এই শিক্ষা বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। অনেক জায়গায় সুপেয় পানির সংকট থাকলেও অজু, গোসল, রান্না ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি পানি ব্যবহার করা হয়। কল খোলা রেখে অজু করা কিংবা ব্যবহারের পর পানির কল বন্ধ না করার মতো অভ্যাস পরিবর্তনের মাধ্যমে অপচয় কমানো সম্ভব।

হাদিসে পানি দান ও জীবের প্রতি দয়া

ইসলামে মানুষের পাশাপাশি অন্যান্য জীবের প্রতিও দয়া প্রদর্শনের শিক্ষা রয়েছে। সহিহ বুখারিতে বর্ণিত হয়েছে, এক ব্যক্তি তৃষ্ণার্ত কুকুরকে পানি পান করানোর কারণে আল্লাহর ক্ষমা লাভ করেন। সাহাবিরা এ বিষয়ে জানতে চাইলে নবী হযরত মোহাম্মদ (সা.) জানান, প্রত্যেক জীবন্ত প্রাণীর সেবায় সওয়াব রয়েছে।

এই হাদিস পানির গুরুত্বের একটি মানবিক ও নৈতিক দিক তুলে ধরে। তৃষ্ণার্ত প্রাণীকে পানি পান করানো ইসলামে দয়ার কাজ হিসেবে বিবেচিত। অর্থাৎ পানির উপকারিতা শুধু মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; অন্যান্য প্রাণীর বেঁচে থাকার জন্যও এটি অপরিহার্য।

মানুষের জন্য নিরাপদ পানির ব্যবস্থা করাও গুরুত্বপূর্ণ জনকল্যাণমূলক কাজ। সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হাদিসে সাদাকায়ে জারিয়ার কথা এসেছে, যার উপকার মৃত্যুর পরও অব্যাহত থাকে। জনসাধারণের ব্যবহারের জন্য নিরাপদ পানির উৎস, কূপ বা পানির ব্যবস্থা গড়ে তোলাকে সাদাকায়ে জারিয়ার একটি বাস্তব উদাহরণ হিসেবে দেখা যায়। তবে পানির ব্যবস্থা করার বিষয়টি ওই হাদিসে সরাসরি উল্লিখিত তালিকার অংশ নয়; বরং স্থায়ী কল্যাণের ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি প্রয়োগ।

ইসলামের ইতিহাসে কূপ খনন, পথিকের পানির ব্যবস্থা এবং জনসাধারণের ব্যবহারের জন্য জলাধার নির্মাণের গুরুত্ব দেখা যায়। বর্তমান সময়ে দরিদ্র জনগোষ্ঠী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে নিরাপদ পানির ব্যবস্থা করা একই ধরনের জনকল্যাণমূলক উদ্যোগের অন্তর্ভুক্ত। পানি অপচয় ও দূষণ রোধে ইসলামের শিক্ষা

পবিত্র কোরআনের সূরা আল-আ'রাফের ৩১ নম্বর আয়াতে পানাহার করতে এবং অপচয় না করতে বলা হয়েছে। আয়াতটির মূল শিক্ষা হলো, প্রয়োজনীয় সম্পদ ব্যবহারে সংযমী হওয়া এবং অপচয় থেকে বিরত থাকা। পানির ক্ষেত্রেও এই নীতি গুরুত্বপূর্ণ।

পানি দূষণ ও অপচয় বর্তমান বিশ্বের বড় পরিবেশগত সমস্যাগুলোর মধ্যে অন্যতম। শিল্পকারখানার অপরিশোধিত বর্জ্য, কৃষিতে ব্যবহৃত রাসায়নিক পদার্থ, প্লাস্টিক এবং পয়োনিষ্কাশনের দূষণ নদী, খাল, পুকুর ও ভূগর্ভস্থ পানির মান নষ্ট করতে পারে। দূষিত পানি মানুষের স্বাস্থ্য, কৃষি ও জলজ প্রাণীর জন্য ঝুঁকি তৈরি করে।

বাংলাদেশের মতো নদীমাতৃক দেশে পানির গুরুত্ব আরও ব্যাপক। কৃষি, মৎস্যসম্পদ, নৌপরিবহন এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবন পানির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু শুষ্ক মৌসুমে কোথাও কোথাও ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যায়। উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা সুপেয় পানির প্রাপ্যতাকে কঠিন করে তোলে। আবার বন্যা ও জলাবদ্ধতার সময় পানির প্রাচুর্য থাকলেও নিরাপদ পানির সংকট দেখা দিতে পারে।

এ অবস্থায় নদী ও জলাশয় দূষণমুক্ত রাখা, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, সেচে পানির দক্ষ ব্যবহার এবং ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমানো জরুরি। পানি সংরক্ষণে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

কোরআন ও বিজ্ঞানের সম্পর্ক: ব্যাখ্যায় প্রয়োজন ভারসাম্য

পানি নিয়ে কোরআনের আয়াত এবং আধুনিক বিজ্ঞানের আবিষ্কার আলোচনা করতে গেলে ধর্মীয় ব্যাখ্যা ও বৈজ্ঞানিক প্রমাণের পার্থক্য বোঝা জরুরি। কোরআন মানুষের বিশ্বাস, নৈতিকতা, সৃষ্টিজগত সম্পর্কে চিন্তা এবং জীবন পরিচালনার নির্দেশনা দেয়। অন্যদিকে, বিজ্ঞান পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষা, পরিমাপ ও গবেষণার মাধ্যমে প্রাকৃতিক ঘটনাবলির ব্যাখ্যা অনুসন্ধান করে। 

কোরআনে পানিকে জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত করে উল্লেখ করা হয়েছে। আধুনিক বিজ্ঞানও জীবদেহের গঠন ও কার্যক্রমে পানির অপরিহার্যতা প্রতিষ্ঠা করেছে। এই দুই দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র রয়েছে। তবে কোনো বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের সঙ্গে কোরআনের আয়াতের আংশিক মিল থাকলেই সেটিকে ওই আবিষ্কারের নির্দিষ্ট পূর্বাভাস হিসেবে দাবি করা যথাযথ নয়। আয়াতের ভাষা, প্রেক্ষাপট এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণার ফলাফল বিবেচনায় নিয়ে বিষয়গুলো ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন।

এই ভারসাম্য বজায় রাখলে কোরআনের তাৎপর্য তুলে ধরার পাশাপাশি বিজ্ঞান সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরির ঝুঁকিও কমে। একই সঙ্গে মুসলমানদের মধ্যে প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ, জ্ঞানচর্চা এবং পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ে।

পানির সংকট মোকাবিলায় করণীয়

বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে নিরাপদ পানির প্রাপ্যতা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, দূষণ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং পানির অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে অনেক এলাকায় পানির ওপর চাপ বাড়ছে। এ সংকট মোকাবিলায় ধর্মীয় মূল্যবোধের পাশাপাশি বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা প্রয়োজন।

ব্যক্তিপর্যায়ে পানির কল ব্যবহারের পর বন্ধ রাখা, অপ্রয়োজনীয় পানি প্রবাহ বন্ধ করা, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং পানির উৎস দূষণ থেকে রক্ষা করার উদ্যোগ নেওয়া যায়। কৃষিতে আধুনিক সেচপ্রযুক্তি ব্যবহার, শিল্পকারখানার বর্জ্য শোধন এবং শহরের পানি ব্যবস্থাপনার উন্নয়নও গুরুত্বপূর্ণ।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ ও সামাজিক সংগঠনগুলো পানির অপচয় রোধে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে। বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের শেখানো প্রয়োজন যে পানি সীমাহীন সম্পদ নয়। প্রকৃতির এই নিয়ামতের সঠিক ব্যবহার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবন ও পরিবেশের নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত।

পানি পৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্বের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। পবিত্র কোরআনে পানিকে জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত করে উল্লেখ করা হয়েছে এবং বৃষ্টি, ফসল ও প্রকৃতির বিভিন্ন নিদর্শনের মাধ্যমে মানুষের চিন্তাকে জাগ্রত করা হয়েছে। হাদিসে পানি ব্যবহারে সংযম, তৃষ্ণার্ত প্রাণীর প্রতি দয়া এবং মানুষের কল্যাণে কাজ করার শিক্ষা পাওয়া যায়। আধুনিক বিজ্ঞানও মানবদেহ, জীবজগৎ, কৃষি ও জলবায়ুতে পানির অপরিহার্য ভূমিকা তুলে ধরেছে।

ইসলামের দৃষ্টিতে পানির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের অর্থ শুধু মুখে আল্লাহর নিয়ামতের কথা স্বীকার করা নয়; বরং এর যথাযথ ব্যবহার ও সংরক্ষণেও দায়িত্বশীল হওয়া। অজুতে অপচয় না করা, দূষণ থেকে পানির উৎস রক্ষা করা, তৃষ্ণার্ত মানুষ ও প্রাণীর পাশে দাঁড়ানো এবং সবার জন্য নিরাপদ পানির ব্যবস্থা করতে সহযোগিতা করা এই দায়িত্ব পালনের বাস্তব উপায়।

পানির গুরুত্ব উপলব্ধি করা মানে জীবনের গুরুত্ব উপলব্ধি করা। কোরআনের শিক্ষা, হাদিসের নির্দেশনা এবং আধুনিক বিজ্ঞানের জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে পানির অপচয় ও দূষণ রোধ করা গেলে মানুষ, প্রকৃতি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আরও নিরাপদ পৃথিবী গড়ে তোলা সম্ভব।

মন্তব্য