fbpx fbpx fbpx
দাওয়াতুল ইসলাম ২৪
সোমবার, ১২, অক্টোবর, ২০২৬ , ২৭ আশ্বিন ১৪৩৩
কুরআন প্রজেক্টে হাদিয়া দিন

ঐতিহ্য ও উচ্চতর ইসলামি শিক্ষার কেন্দ্র যাত্রাবাড়ী মাদরাসা

রাজধানী ঢাকার ব্যস্ততম এলাকাগুলোর একটি যাত্রাবাড়ী। যানবাহনের অবিরাম চলাচল, মানুষের কর্মব্যস্ততা আর নগরজীবনের কোলাহলের মাঝেই গড়ে উঠেছে দেশের পরিচিত কওমি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলূম মাদানিয়া। যাত্রাবাড়ী মাদরাসা নামে পরিচিত এই প্রতিষ্ঠানটি ১৯৬৯ সালে ছোট পরিসরে দ্বীনি শিক্ষার কার্যক্রম শুরু করে। সময়ের পরিক্রমায় তা পরিণত হয়েছে কোরআন-হাদিস, ফিকহ, আরবি ভাষা ও ইসলামি জ্ঞানচর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে।

প্রতিষ্ঠানটির ইতিহাস কেবল একটি মাদরাসার বিকাশের গল্প নয়; এটি নগরায়ণের বিস্তারের মধ্যে ধর্মীয় শিক্ষার প্রসার, প্রজন্মের পর প্রজন্ম আলেম গড়ে তোলা এবং ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাব্যবস্থাকে ধরে রাখারও একটি অধ্যায়।

ছোট মক্তব থেকে বৃহৎ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান

জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলূম মাদানিয়ার যাত্রা শুরু হয়েছিল সীমিত পরিসরে। প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ইতিহাস অনুযায়ী, ১৯৬৯ সালের শুরুর দিকে দক্ষিণ যাত্রাবাড়ী ও আশপাশের এলাকায় দ্বীনি শিক্ষার সুযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। হাফেজ আব্দুল কুদ্দুসের তত্ত্বাবধানে প্রথমে একটি প্রভাতি মক্তব চালু হয়। পরে এর সঙ্গে যুক্ত হয় হিফজ বিভাগ।

প্রাথমিক পর্যায়ে শিশুদের কোরআন শিক্ষা ও ধর্মীয় মৌলিক জ্ঞান অর্জনের সুযোগ তৈরি করাই ছিল মূল লক্ষ্য। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই প্রতিষ্ঠানটিকে আরও বিস্তৃত পরিসরে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৯৭০ সালের দিকে বিশিষ্ট আলেম আল্লামা আব্দুল্লাহ দরখাস্তি এখানে আসেন। প্রতিষ্ঠানের ইতিহাসে তার আগমনকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে মাদরাসার নাম হয় ‘দারুল উলূম মাদানিয়া’। ১৯৮১ সালে এর নামের সঙ্গে ‘জামিয়া ইসলামিয়া’ যুক্ত হয়ে বর্তমান নামটি প্রতিষ্ঠিত হয়। কয়েক দশকের ধারাবাহিকতায় প্রতিষ্ঠানটি প্রাথমিক ধর্মীয় শিক্ষা থেকে উচ্চতর ইসলামি শিক্ষার পর্যায়ে বিস্তৃত হয়েছে।

দেওবন্দি শিক্ষাধারায় পাঠদান

জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলূম মাদানিয়া দারুল উলূম দেওবন্দের শিক্ষাধারা অনুসরণ করে পরিচালিত হয়। এর শিক্ষাব্যবস্থায় কোরআন, তাফসির, হাদিস, ফিকহ, আরবি ব্যাকরণ ও সাহিত্যসহ ইসলামি জ্ঞানের বিভিন্ন শাখাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। কওমি শিক্ষাব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য হলো, এখানে ধর্মীয় জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা, ব্যক্তিগত শৃঙ্খলা, ইবাদত ও সামাজিক দায়িত্ববোধের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। যাত্রাবাড়ী মাদরাসার লক্ষ্যও ধর্মীয় শিক্ষায় দক্ষ আলেম তৈরি করা এবং তাদের দেশ-বিদেশে দ্বীনি খেদমতের উপযোগী করে গড়ে তোলা।

প্রতিষ্ঠানটির পাঠ্যক্রমে আরবি ভাষার পাশাপাশি বাংলা, ইংরেজি, গণিত, ইতিহাস, ভূগোল, অর্থনীতি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও বিজ্ঞানের মতো বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে বলে এর পরিচিতিমূলক তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ধর্মীয় জ্ঞানের পাশাপাশি সাধারণ বিষয় সম্পর্কেও ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।

প্রাথমিক শিক্ষা থেকে উচ্চতর গবেষণা

একটি মাদরাসার সাফল্য শুধু শিক্ষার্থীর সংখ্যা দিয়ে বিচার করা যায় না। শিক্ষার ধারাবাহিকতা, পাঠদানের মান, গবেষণার সুযোগ এবং শিক্ষার্থীদের অর্জিত দক্ষতাও গুরুত্বপূর্ণ। এসব দিক বিবেচনায় যাত্রাবাড়ী মাদরাসার শিক্ষাব্যবস্থায় রয়েছে একাধিক স্তর ও বিশেষায়িত বিভাগ। প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, শিশুদের প্রাথমিক কোরআন শিক্ষা ও নাজেরা পাঠের মাধ্যমে শিক্ষাজীবনের শুরু হয়। এরপর হিফজ বিভাগে পবিত্র কোরআন মুখস্থ করার সুযোগ রয়েছে। কিতাব বিভাগে ধাপে ধাপে আরবি ব্যাকরণ, ফিকহ, তাফসির ও হাদিসের মতো বিষয় পড়ানো হয়। উচ্চতর স্তরে দাওরায়ে হাদিস সম্পন্ন করার সুযোগও রয়েছে।

এ ছাড়া উচ্চতর ইসলামি জ্ঞানচর্চার জন্য গবেষণাভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম রয়েছে। এর মধ্যে কোরআন ও তাফসির, হাদিস এবং ইসলামি আইন ও ফিকহবিষয়ক বিশেষায়িত অধ্যয়ন উল্লেখযোগ্য। এসব বিভাগে শিক্ষার্থীরা নির্দিষ্ট বিষয়ে গভীরভাবে পড়াশোনা ও গবেষণার সুযোগ পায়।

উচ্চতর গবেষণার গুরুত্ব এখানেই যে, ধর্মীয় গ্রন্থের পাঠ ও ব্যাখ্যার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশ্লেষণী দক্ষতা অর্জনের সুযোগ তৈরি হয়। একজন শিক্ষার্থী তখন শুধু পাঠ গ্রহণেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং অর্জিত জ্ঞান ব্যাখ্যা করা, প্রাসঙ্গিক প্রশ্নের উত্তর খোঁজা এবং ইসলামি জ্ঞানচর্চায় অবদান রাখার প্রস্তুতিও নিতে পারে।

আলেম তৈরির দীর্ঘ ধারাবাহিকতা

প্রতিষ্ঠানের ইতিহাসে বিভিন্ন সময়ে দেশ-বিদেশের বিশিষ্ট আলেমের আগমন, পাঠদান ও দিকনির্দেশনার কথা উল্লেখ রয়েছে। তাদের মধ্যে আল্লামা আব্দুল্লাহ দরখাস্তি, আল্লামা হেদায়েতুল্লাহ, আল্লামা মাহমুদুল হাসানসহ আরও কয়েকজন বরেণ্য আলেমের নাম পাওয়া যায়।

প্রতিষ্ঠানটির দীর্ঘদিনের পরিচালনায় আল্লামা মাহমুদুল হাসানের ভূমিকার কথাও এর ইতিহাসে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে দায়িত্বশীলদের পরিবর্তন ও নেতৃত্বের ধারাবাহিকতার মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা কার্যক্রম এগিয়ে গেছে।

দীর্ঘদিন ধরে পরিচালিত একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ঐতিহ্য গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। পুরোনো শিক্ষকদের পাঠদানপদ্ধতি, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক এবং জ্ঞানচর্চার পরিবেশ পরবর্তী প্রজন্মের ওপর প্রভাব ফেলে। যাত্রাবাড়ী মাদরাসার ক্ষেত্রেও এই ধারাবাহিকতা প্রতিষ্ঠানটির পরিচিতি তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে।

রাজধানীর ব্যস্ত নগরে আবাসিক শিক্ষার পরিবেশ

ঢাকার মতো জনবহুল শহরে শিক্ষার্থীদের জন্য নিয়মিত পাঠদান, আবাসন ও দৈনন্দিন শিক্ষাজীবন পরিচালনা করা একটি বড় ব্যবস্থাপনাগত কাজ। কওমি মাদরাসার আবাসিক পরিবেশে শিক্ষার্থীরা সাধারণত নির্দিষ্ট সময়সূচি অনুসরণ করে পড়াশোনা, ইবাদত, পুনরাবৃত্তি ও অন্যান্য শিক্ষামূলক কাজে অংশ নেয়।

যাত্রাবাড়ী মাদরাসায়ও শিক্ষার বিভিন্ন স্তরের পাশাপাশি বোর্ডিং সুবিধা রয়েছে বলে প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে উল্লেখ করা হয়েছে। নূরানি ও নাজেরা, হিফজ, কিতাব এবং ইফতা বিভাগ এর শিক্ষা কার্যক্রমের অংশ।

আবাসিক শিক্ষার ক্ষেত্রে পাঠ্যক্রমের পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতা, স্বাস্থ্যসম্মত খাবার, নিরাপদ আবাসন, পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশও গুরুত্বপূর্ণ। এসব বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থাপনা থাকলে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনায় অধিক মনোযোগী হওয়ার সুযোগ পায়। আধুনিক সময়ে ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও এসব বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

শিক্ষার বিস্তারে প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব

যাত্রাবাড়ী মাদরাসার প্রভাব শুধু এর নিজস্ব ক্যাম্পাসে সীমাবদ্ধ নয় বলে প্রতিষ্ঠানটির পরিচিতিমূলক তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখান থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা শিক্ষার্থীরা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এবং বিদেশেও ধর্মীয় শিক্ষা ও অন্যান্য দ্বীনি কার্যক্রমে যুক্ত রয়েছেন। প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব পাঠ্যক্রম অনুসরণ করে পরিচালিত আরও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে বলেও জানানো হয়েছে।

বাংলাদেশে কওমি মাদরাসাগুলো দীর্ঘদিন ধরে ধর্মীয় শিক্ষা, কোরআন-হাদিসের পাঠদান, ইমামতি, খুতবা, ফতোয়া ও ধর্মীয় গবেষণায় ভূমিকা রেখে আসছে। এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ডেও অংশ নেন। ফলে একটি মাদরাসার কার্যক্রম মূল্যায়নের ক্ষেত্রে পাঠদান ও সনদ প্রদানের পাশাপাশি বৃহত্তর সমাজে তার শিক্ষার্থীদের ভূমিকার বিষয়টিও বিবেচনায় আসে।

তবে সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থার সামনে নতুন চ্যালেঞ্জও তৈরি হচ্ছে। প্রযুক্তিনির্ভর জীবন, কর্মসংস্থানের পরিবর্তিত বাস্তবতা, তথ্য যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তা এবং সমসাময়িক সামাজিক সমস্যাগুলো সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের ধারণা থাকা জরুরি। ধর্মীয় শিক্ষার মৌলিক কাঠামো অক্ষুণ্ণ রেখে ভাষাগত দক্ষতা, প্রযুক্তির ব্যবহার, গবেষণার পদ্ধতি ও সমসাময়িক জ্ঞানচর্চার সুযোগ বাড়ানো গেলে শিক্ষার্থীরা আরও বিস্তৃত পরিসরে অবদান রাখতে পারবেন।

ঐতিহ্য ধরে রেখে আগামীর পথে

১৯৬৯ সালে একটি ছোট মক্তবের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলূম মাদানিয়ার পথচলা কয়েক দশক পেরিয়ে আজ একটি বিস্তৃত শিক্ষাব্যবস্থায় রূপ নিয়েছে। এর ইতিহাসে রয়েছে প্রাথমিক ধর্মীয় শিক্ষা, হিফজ, কিতাব পাঠ, উচ্চতর হাদিসশিক্ষা এবং বিশেষায়িত গবেষণার ধারাবাহিকতা।

যাত্রাবাড়ীর ব্যস্ত নগরজীবনের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটি ধর্মীয় জ্ঞানচর্চার একটি পরিচিত ঠিকানা হিসেবে টিকে আছে। এর ঐতিহ্য সংরক্ষণের পাশাপাশি শিক্ষার মান উন্নয়ন, গবেষণার সুযোগ বৃদ্ধি এবং শিক্ষার্থীদের সমসাময়িক জ্ঞান ও দক্ষতার সঙ্গে পরিচিত করার উদ্যোগ ভবিষ্যতে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রকৃত সাফল্য তার ভবন বা আয়তনে নয়, বরং শিক্ষার্থীদের জ্ঞান, নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ ও সমাজে ইতিবাচক অবদানের মধ্যে প্রতিফলিত হয়। সেই বিবেচনায় যাত্রাবাড়ী মাদরাসার দীর্ঘ পথচলা বাংলাদেশের কওমি শিক্ষার ইতিহাসের একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়।

রাজধানীর দক্ষিণ যাত্রাবাড়ীতে অবস্থিত জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলূম মাদানিয়া। ১৯৬৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এই কওমি মাদরাসায় কোরআন-হাদিস, ফিকহ, আরবি ভাষা ও উচ্চতর ইসলামি শিক্ষার বিভিন্ন স্তরে পাঠদান করা হয়।

মন্তব্য