জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলুম মাদানিয়া: ঢাকায় ইসলামী শিক্ষার এক ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান
ঢাকার ব্যস্ত নগরজীবনের মধ্যে ধর্মীয় জ্ঞানচর্চা, কোরআন-হাদিসের শিক্ষা ও আলেম গড়ার ধারায় পরিচিত একটি নাম জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলুম মাদানিয়া। রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় অবস্থিত এ প্রতিষ্ঠান কওমি মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ইসলামী জ্ঞানের চর্চা, আরবি ভাষা শিক্ষা এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের বিকাশকে কেন্দ্র করে পরিচালিত এ ধরনের প্রতিষ্ঠান দেশের ধর্মীয় ও সামাজিক পরিমণ্ডলে দীর্ঘদিন ধরে ভূমিকা রেখে চলেছে।
কওমি মাদরাসার মূল লক্ষ্য শুধু ধর্মীয় পাঠ্যবই পড়ানো নয়; বরং শিক্ষার্থীদের মধ্যে নৈতিকতা, শৃঙ্খলা, দায়িত্ববোধ ও মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তোলাও এর শিক্ষাদর্শনের অংশ। জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলুম মাদানিয়াকে ঘিরেও রয়েছে ঐতিহ্যবাহী ইসলামী শিক্ষাধারার সঙ্গে যুক্ত থাকার পরিচিতি। তবে প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাকাল, প্রতিষ্ঠাতাদের পরিচয়, বর্তমান শিক্ষার্থীসংখ্যা ও বিভাগভিত্তিক কার্যক্রমের নির্ভরযোগ্য তথ্য যাচাই করে প্রকাশ করা জরুরি।
ছোট মক্তব থেকে বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান
জামিয়ার ইতিহাসের সূচনা ১৯৬৯ সালে। প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সে সময় দক্ষিণ যাত্রাবাড়ী ও আশপাশের এলাকায় ধর্মীয় শিক্ষার সুযোগ বাড়ানোর লক্ষ্যে হাফেজ আব্দুল কুদ্দুসের তত্ত্বাবধানে একটি প্রভাতি মক্তব চালু করা হয়। পরে এর সঙ্গে যুক্ত হয় হিফজ বিভাগ। সীমিত পরিসরে শুরু হওয়া সেই উদ্যোগই পরবর্তী সময়ে পূর্ণাঙ্গ কওমি মাদরাসায় রূপ নেয়।
-----
১৯৭০ সালের দিকে প্রখ্যাত আলেম আল্লামা আব্দুল্লাহ দরখাস্তি এ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হন। তার আগমন ও দিকনির্দেশনার মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম নতুন মাত্রা পায়। তখন এর নাম রাখা হয় ‘দারুল উলুম মাদানিয়া’। পরবর্তী সময়ে কয়েকজন আলেম প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮০ সালে মাওলানা মাহমুদুল হাসান পূর্ণ মুহতামিমের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৮১ সালে প্রতিষ্ঠানের নামের সঙ্গে ‘জামিয়া ইসলামিয়া’ যুক্ত হয়ে বর্তমান নামটি প্রতিষ্ঠিত হয়।
প্রতিষ্ঠানের বিকাশের পেছনে ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি স্থানীয় মানুষের আগ্রহ, আলেমদের শ্রম এবং ধর্মপ্রাণ মানুষের সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ছোট পরিসরে শুরু হওয়া শিক্ষাকার্যক্রম সময়ের সঙ্গে সম্প্রসারিত হয়ে বিভিন্ন স্তরের পাঠদান ও বিশেষায়িত শিক্ষার সুযোগ তৈরি করেছে।
কোরআন-হাদিসভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা
জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলুম মাদানিয়ার শিক্ষাদর্শনের কেন্দ্রবিন্দু কোরআন ও সুন্নাহ। প্রতিষ্ঠানটি উপমহাদেশের ঐতিহ্যবাহী দারুল উলুম দেওবন্দের শিক্ষাধারা অনুসরণ করে। হাদিস, ফিকহ, তাফসির, আরবি ভাষা এবং ইসলামী জ্ঞানশাস্ত্রের বিভিন্ন শাখায় শিক্ষার্থীদের পাঠদান এর কার্যক্রমের অংশ।
প্রতিষ্ঠানটির প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এখানে নূরানি ও নাজেরা, হিফজুল কোরআন, কিতাব এবং ইফতা বিভাগ রয়েছে। পাশাপাশি আবাসিক শিক্ষার ব্যবস্থাও আছে। এসব বিভাগের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা প্রাথমিক ধর্মীয় শিক্ষা থেকে শুরু করে উচ্চতর ইসলামী জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পায়।
যাত্রাবাড়ী মাদরাসা
হিফজ বিভাগে পবিত্র কোরআন মুখস্থ করার পাশাপাশি শুদ্ধ উচ্চারণ ও তিলাওয়াতের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। কিতাব বিভাগে আরবি ভাষা, ব্যাকরণ, ফিকহ, হাদিস ও অন্যান্য ইসলামী বিষয়ে ধারাবাহিক পাঠদান করা হয়। উচ্চতর পর্যায়ে শিক্ষার্থীরা নির্দিষ্ট বিষয়ে বিশেষায়িত জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পায়।
কওমি শিক্ষাব্যবস্থায় পাঠ্যজ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি শিক্ষকের সাহচর্য, নিয়মিত অধ্যয়ন, অনুশীলন ও নৈতিক প্রশিক্ষণকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। এ পদ্ধতির লক্ষ্য শিক্ষার্থীদের ধর্মীয় জ্ঞানসম্পন্ন করার পাশাপাশি দায়িত্বশীল জীবনযাপনে উদ্বুদ্ধ করা।
উচ্চতর গবেষণা ও আরবি ভাষা শিক্ষায় গুরুত্ব
প্রতিষ্ঠানটির উল্লেখযোগ্য দিকগুলোর একটি হলো উচ্চতর ইসলামী শিক্ষা ও বিশেষায়িত অধ্যয়নের সুযোগ। এর মধ্যে ইফতা বা ইসলামী আইন বিষয়ে উচ্চতর শিক্ষার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। ইফতা বিভাগে শিক্ষার্থীরা কোরআন, হাদিস, ফিকহ ও ইসলামী আইনশাস্ত্রের আলোকে বিভিন্ন ধর্মীয় প্রশ্ন বিশ্লেষণ এবং ফতোয়া প্রণয়নের পদ্ধতি সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করেন।
প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৩ সালে উচ্চতর ফিকহ ও ফতোয়া গবেষণার জন্য ‘আত-তাখাসসুস ফিল ফিকহিল ইসলামি’ বিভাগ চালু করা হয়। এ বিভাগে দাওরায়ে হাদিস সম্পন্ন করা শিক্ষার্থীদের বিশেষায়িত অধ্যয়নের সুযোগ তৈরি হয়। গবেষণাভিত্তিক পাঠক্রমে নির্দিষ্ট বিষয়ে বিস্তারিত অধ্যয়ন ও অভিসন্দর্ভ তৈরির ব্যবস্থার কথাও উল্লেখ রয়েছে।
এ ছাড়া ১৯৯৯ সালে চালু হয় আরবি ভাষা প্রশিক্ষণ কোর্স ‘দাওরাতুল লুগাতিল আরাবিয়া’। আরবি ভাষা ও সাহিত্যে দক্ষতা অর্জন, অনুবাদ, প্রবন্ধ রচনা, কথোপকথন, বক্তৃতা এবং উপস্থাপনার মতো বিষয় এ কোর্সের অন্তর্ভুক্ত। ধর্মীয় গ্রন্থ পাঠের পাশাপাশি আরবি ভাষায় যোগাযোগ ও লেখালেখির দক্ষতা বাড়ানোর ক্ষেত্রেও এ ধরনের শিক্ষা কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ।
-
আলেম তৈরির ধারাবাহিকতা
একটি কওমি মাদরাসার সাফল্য শুধু তার ভবন বা শিক্ষার্থীর সংখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়। বরং সেখান থেকে শিক্ষিত ব্যক্তিরা সমাজে কী ধরনের ভূমিকা রাখছেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলুম মাদানিয়ার ক্ষেত্রেও আলেম, শিক্ষক, ইমাম, খতিব, মুফতি ও ধর্মীয় আলোচকদের গড়ে তোলার বিষয়টি প্রতিষ্ঠানটির পরিচিতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব পরিচিতিতে বলা হয়েছে, এখান থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা বহু শিক্ষার্থী দেশে ও বিদেশে ধর্মীয় শিক্ষা ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করছেন। তবে এ বিষয়ে নির্দিষ্ট সংখ্যা বা কর্মক্ষেত্রভিত্তিক পরিসংখ্যান স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
আলেমদের একটি অংশ মসজিদে ইমামতি ও খুতবা প্রদান, মাদরাসায় পাঠদান, ধর্মীয় গবেষণা এবং সমাজে ইসলামী শিক্ষার প্রচারে যুক্ত হন। কেউ কেউ ফিকহ ও ফতোয়া বিষয়ে বিশেষায়িত জ্ঞান অর্জন করে ধর্মীয় বিষয়ে মানুষের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার দায়িত্ব পালন করেন। এসব ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, ব্যক্তিগত অধ্যবসায় ও বাস্তব অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ধর্মীয় শিক্ষা ও সামাজিক দায়িত্ব
ইসলামী শিক্ষার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো ব্যক্তিজীবন ও সমাজে নৈতিকতার চর্চা জোরদার করা। সততা, আমানতদারি, শৃঙ্খলা, দায়িত্ববোধ, মানুষের প্রতি সহমর্মিতা এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মতো মূল্যবোধ ধর্মীয় শিক্ষার আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পায়।
জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলুম মাদানিয়ার শিক্ষাধারায়ও কোরআন-সুন্নাহর শিক্ষা ও নৈতিক প্রশিক্ষণকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। আবাসিক ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন জীবন সাধারণত পাঠদান, ব্যক্তিগত অধ্যয়ন, ইবাদত ও নির্ধারিত নিয়মের মধ্যে পরিচালিত হয়। এর মাধ্যমে নিয়মিত অধ্যয়ন ও শৃঙ্খলাপূর্ণ জীবনযাপনের অভ্যাস গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হয়।
প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে মজলিসে দাওয়াতুল হকের সম্পর্কও এর ধর্মীয় কার্যক্রমের একটি উল্লেখযোগ্য দিক। এ ধারার মূল লক্ষ্য সুন্নাহর অনুসরণ, ব্যক্তিগত সংশোধন এবং সমাজে ধর্মীয় অনুশীলনকে উৎসাহিত করা।
তবে সমসাময়িক সময়ে ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি ভাষাগত দক্ষতা, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার, গবেষণার পদ্ধতি এবং সমাজের পরিবর্তিত বাস্তবতা সম্পর্কে সচেতনতাও গুরুত্বপূর্ণ। এসব ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের সক্ষমতা বাড়ানো গেলে তারা ধর্মীয় জ্ঞানচর্চার পাশাপাশি বৃহত্তর সামাজিক পরিসরেও আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবেন।
ঐতিহ্য ধরে রেখে এগিয়ে চলা
প্রতিষ্ঠার পর অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পেরিয়ে জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলুম মাদানিয়া এখন রাজধানীর পরিচিত কওমি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর একটি। ১৯৬৯ সালে একটি ছোট মক্তবের মাধ্যমে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা সময়ের সঙ্গে বিভিন্ন বিভাগ, উচ্চতর পাঠক্রম ও আবাসিক ব্যবস্থাসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানে রূপ নিয়েছে। এর ইতিহাসে স্থানীয় উদ্যোগ, আলেমদের অবদান এবং ধর্মীয় শিক্ষার প্রসারে মানুষের সহযোগিতার চিত্র উঠে আসে।
বর্তমান সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির সামনে যেমন ঐতিহ্য ধরে রাখার দায়িত্ব রয়েছে, তেমনি শিক্ষার্থীদের জ্ঞান, দক্ষতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধ বিকাশের চ্যালেঞ্জও রয়েছে। ধর্মীয় শিক্ষার গভীরতা বজায় রেখে গবেষণা, ভাষা শিক্ষা এবং সময়োপযোগী দক্ষতার বিকাশে গুরুত্ব দেওয়া গেলে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষাকার্যক্রম আরও সমৃদ্ধ হতে পারে।
ঢাকার যাত্রাবাড়ীর জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলুম মাদানিয়ার ইতিহাস তাই কেবল একটি মাদরাসার বিকাশের কাহিনি নয়; এটি বাংলাদেশের নগরাঞ্চলে কওমি শিক্ষার বিস্তার এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ধর্মীয় জ্ঞানচর্চা অব্যাহত রাখার একটি দৃষ্টান্ত। কোরআন-হাদিসের শিক্ষা, উচ্চতর ইসলামী অধ্যয়ন এবং নৈতিক জীবন গঠনের প্রত্যয় নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির পথচলা দেশের ধর্মীয় শিক্ষার বৃহত্তর ইতিহাসের সঙ্গেও যুক্ত।
মন্তব্য