প্রকৌশলী স্থাপত্য ও নির্মাণপ্রযুক্তিতে বিশ্বখ্যাত মুসলিম স্থাপত্যবিদ এফ আর খান
বিশ্বের আধুনিক আকাশচুম্বী ভবনের ইতিহাসে যে কয়েকজন প্রকৌশলী স্থাপত্য ও নির্মাণপ্রযুক্তিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছেন, তাদের অন্যতম বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মুসলিম প্রকৌশলী ফজলুর রহমান খান। বিশ্বজুড়ে তিনি এফ আর খান নামে পরিচিত। তাঁর উদ্ভাবিত কাঠামোগত নকশাপদ্ধতি উঁচু ভবন নির্মাণকে করেছে আরও কার্যকর, অর্থনৈতিক ও নিরাপদ। কংক্রিট ও ইস্পাতের ব্যবহার, ভবনের ভার বহনের কৌশল এবং বাতাসের চাপ মোকাবিলার প্রকৌশলগত সমাধানে তাঁর অবদান আধুনিক স্থাপত্যের গতিপথ বদলে দিয়েছে।
একসময় আকাশচুম্বী ভবন নির্মাণকে ব্যয়বহুল ও জটিল প্রকৌশলগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হতো। এফ আর খান এমন কিছু নকশাপদ্ধতি প্রবর্তন করেন, যার মাধ্যমে তুলনামূলক কম উপকরণ ব্যবহার করে আরও উঁচু ভবন নির্মাণ সম্ভব হয়। এ কারণে তাঁকে আধুনিক আকাশচুম্বী ভবন নির্মাণের অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাঁর জীবন ও কর্ম শুধু একজন প্রকৌশলীর সাফল্যের গল্প নয়, বরং বিজ্ঞান, গণিত, সৃজনশীলতা ও মানবকল্যাণের সমন্বয়ে কীভাবে বিশ্বকে বদলে দেওয়া যায়, তারও অনন্য উদাহরণ।
শৈশব ও শিক্ষাজীবন
ফজলুর রহমান খান ১৯২৯ সালের ৩ এপ্রিল ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তার পৈতৃক নিবাস ছিল তৎকালীন ফরিদপুর অঞ্চলের ভাণ্ডারিকান্দি গ্রামে, যা বর্তমানে মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলার অন্তর্গত। তার বাবা খান বাহাদুর আবদুর রহমান খান ছিলেন একজন শিক্ষাবিদ ও সরকারি শিক্ষা কর্মকর্তা। বাবার কাছ থেকে শিক্ষা ও গণিতের প্রতি আগ্রহ তৈরির সুযোগ পান তিনি।
ঢাকার আরমানিটোলা সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষে তিনি প্রকৌশল শিক্ষায় মনোনিবেশ করেন। কলকাতার শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে পড়াশোনা করার পর ঢাকার আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) নামে পরিচিত।
উচ্চশিক্ষার জন্য ১৯৫২ সালে বৃত্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে যান ফজলুর রহমান খান। ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি কাঠামোগত প্রকৌশল এবং তাত্ত্বিক ও ফলিত বলবিদ্যায় উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন। মাত্র তিন বছরের মধ্যে দুটি স্নাতকোত্তর ডিগ্রি ও পিএইচডি সম্পন্ন করেন। এই শিক্ষাই তাকে ভবনের কাঠামো, উপকরণের কার্যকারিতা এবং জটিল গাণিতিক সমস্যার সমাধানে বিশেষ দক্ষ করে তোলে।
----------
আকাশচুম্বী ভবন নির্মাণে নতুন চিন্তা
ফজলুর রহমান খানের সবচেয়ে বড় অবদান হলো উঁচু ভবনের কাঠামোগত নকশায় নতুন ধারণার প্রবর্তন। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে আকাশচুম্বী ভবন নির্মাণে প্রচুর ইস্পাত ব্যবহার করতে হতো। ভবনের উচ্চতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাতাসের চাপ সামলানো, কাঠামোর স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং নির্মাণব্যয় নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে উঠত।
এই সমস্যার সমাধানে তিনি ভবনের বাইরের কাঠামোকে এমনভাবে নকশা করার ধারণা বিকশিত করেন, যাতে সেটি একটি শক্তিশালী নলের মতো ভবনের ওপর আসা বিভিন্ন বল মোকাবিলা করতে পারে। এই পদ্ধতি পরিচিতি পায় ‘টিউবুলার স্ট্রাকচারাল সিস্টেম’ নামে।
সহজভাবে বললে, প্রচলিত পদ্ধতিতে ভবনের ভেতরের স্তম্ভ ও কাঠামোর ওপর বেশি নির্ভর না করে ভবনের বাইরের দিকে ঘনভাবে স্থাপিত স্তম্ভ এবং সেগুলোকে যুক্ত করা বিমের মাধ্যমে ভার বহনের বড় অংশ সামলানো হয়। ফলে ভবনের ভেতরে অপেক্ষাকৃত খোলামেলা জায়গা রাখা সম্ভব হয়। একই সঙ্গে ইস্পাতের কার্যকর ব্যবহার এবং কাঠামোর দৃঢ়তা বাড়ানো যায়।
-
এ পদ্ধতির বিভিন্ন রূপ—ফ্রেমড টিউব, ট্রাসড টিউব ও বান্ডলড টিউব—আকাশচুম্বী ভবন নির্মাণে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করে। এসব উদ্ভাবনের কারণে তাকে উঁচু ভবনের ‘টিউবুলার ডিজাইনের জনক’ বলা হয়।
উইলিস টাওয়ার: প্রকৌশলবিজ্ঞানের এক বিস্ময়
ফজলুর রহমান খানের নকশাগত চিন্তার সবচেয়ে বিখ্যাত উদাহরণ শিকাগোর উইলিস টাওয়ার, যার আগের নাম ছিল সিয়ার্স টাওয়ার। ভবনটির কাঠামোগত নকশায় তিনি বান্ডলড টিউব পদ্ধতি প্রয়োগ করেন। ১৯৭৩ সালে নির্মাণ সম্পন্ন হওয়া ১১০ তলাবিশিষ্ট এই ভবনটি প্রায় ২৫ বছর বিশ্বের সর্বোচ্চ ভবনের মর্যাদা ধরে রেখেছিল।
বান্ডলড টিউব পদ্ধতিতে একাধিক কাঠামোগত নলকে একসঙ্গে যুক্ত করে একটি সমন্বিত ব্যবস্থা তৈরি করা হয়। এতে ভবনের উচ্চতা বাড়লেও কাঠামোর কার্যকারিতা বজায় রাখা যায়। ভবনের বিভিন্ন অংশকে প্রয়োজন অনুযায়ী ভিন্ন উচ্চতায় শেষ করার সুযোগও পাওয়া যায়। উইলিস টাওয়ারের বিভিন্ন উচ্চতার আয়তাকার অংশগুলো এই নকশার একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য।
এই উদ্ভাবনের গুরুত্ব শুধু একটি উঁচু ভবন নির্মাণে সীমাবদ্ধ নয়। বরং এটি প্রমাণ করে, সঠিক গাণিতিক বিশ্লেষণ ও প্রকৌশলগত পরিকল্পনার মাধ্যমে নির্মাণ উপকরণের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করে বড় স্থাপনা তৈরি করা সম্ভব।
জন হ্যানকক সেন্টারে আরেক বিপ্লব
শিকাগোর আরেক বিখ্যাত স্থাপনা জন হ্যানকক সেন্টার, বর্তমানে যার নাম ৮৭৫ নর্থ মিশিগান অ্যাভিনিউ। ১৯৬৯ সালে সম্পন্ন হওয়া ১০০ তলাবিশিষ্ট এই ভবনের কাঠামোগত নকশায় ফজলুর রহমান খান ট্রাসড টিউব পদ্ধতি প্রয়োগ করেন।
ভবনটির বাইরের দিকে দৃশ্যমান তির্যক ইস্পাতের বন্ধনগুলো শুধু নান্দনিক বৈশিষ্ট্য নয়; এগুলো কাঠামোর শক্তি ও স্থিতিশীলতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই নকশার মাধ্যমে বাতাসের কারণে সৃষ্ট পার্শ্বীয় বল মোকাবিলায় ভবনের বাইরের কাঠামোকে আরও কার্যকর করা সম্ভব হয়।
জন হ্যানকক সেন্টার দেখিয়েছে, প্রকৌশলগত প্রয়োজন ও স্থাপত্যের সৌন্দর্য পরস্পরের বিরোধী নয়। বরং কাঠামোর বৈজ্ঞানিক যুক্তিকেই ভবনের নকশার দৃশ্যমান অংশে রূপ দেওয়া যায়। আধুনিক স্থাপত্যে এই চিন্তার প্রভাব এখনো স্পষ্ট।
স্থাপত্যে বিজ্ঞান, গণিত ও প্রযুক্তির সমন্বয়
ফজলুর রহমান খানের কাজের মূল ভিত্তি ছিল গণিত, পদার্থবিজ্ঞান ও প্রকৌশলবিজ্ঞানের সমন্বিত প্রয়োগ। একটি উঁচু ভবনের ওপর মাধ্যাকর্ষণ ছাড়াও বাতাসের চাপ এবং অন্যান্য বাহ্যিক বল কাজ করে। এসব বল কীভাবে ভবনের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়ে, তা বিশ্লেষণ করে তিনি কাঠামোর নকশা তৈরি করতেন।
তিনি কম্পিউটারভিত্তিক নকশা ও বিশ্লেষণপদ্ধতির বিকাশেও অগ্রণী ভূমিকা রাখেন। জটিল ভবনের বিভিন্ন পরিস্থিতিতে কাঠামোর আচরণ বিশ্লেষণ করা, উপকরণের ব্যবহার নির্ধারণ এবং নকশার কার্যকারিতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে গণনাভিত্তিক পদ্ধতি প্রকৌশলীদের কাজকে আরও নির্ভুল করে তোলে।
এ ছাড়া তিনি শুধু ইস্পাতের কাঠামোর ওপর নির্ভর করেননি। উঁচু ভবনে রিইনফোর্সড কংক্রিটের কার্যকর ব্যবহারেও অবদান রাখেন। অর্থাৎ কোন ভবনে ইস্পাত, কোনটিতে কংক্রিট কিংবা কোথায় উভয়ের সমন্বয় উপযুক্ত, তা নির্ধারণের ক্ষেত্রে কাঠামোগত দক্ষতা ও অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে গুরুত্ব দিয়েছেন।
হজ টার্মিনালসহ অন্যান্য স্থাপনায় অবদান
আকাশচুম্বী ভবনের বাইরেও ফজলুর রহমান খানের প্রকৌশল প্রতিভার পরিচয় পাওয়া যায়। সৌদি আরবের জেদ্দায় কিং আবদুল আজিজ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের হজ টার্মিনাল প্রকল্পে তার গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। তাঁবুর মতো ছাদবিশিষ্ট এই স্থাপনা হজযাত্রীদের বিপুল সমাগম সামলানোর উপযোগী করে নকশা করা হয়েছিল। এর কাঠামো ও স্থাপত্যে কার্যকারিতা, বৃহৎ পরিসর এবং নান্দনিকতার সমন্বয় লক্ষ করা যায়।
এ ছাড়া বিভিন্ন বড় ভবন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ক্রীড়া স্থাপনার প্রকৌশল নকশায়ও তিনি কাজ করেছেন। তার কর্মজীবনের ব্যাপ্তি প্রমাণ করে, তিনি শুধু উঁচু ভবন নির্মাণের বিশেষজ্ঞ ছিলেন না; বরং স্থাপত্য ও কাঠামোগত প্রকৌশলের বিস্তৃত ক্ষেত্রেও অবদান রেখেছেন।
বিশ্বজুড়ে স্বীকৃতি ও সম্মান
ফজলুর রহমান খান যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোভিত্তিক প্রকৌশল ও স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান স্কিডমোর, ওউইংস অ্যান্ড মেরিলের (এসওএম) সঙ্গে দীর্ঘদিন কাজ করেন। ১৯৬৬ সালে তিনি প্রতিষ্ঠানটির অংশীদার হন। তার উদ্ভাবনী নকশা আন্তর্জাতিক প্রকৌশল অঙ্গনে ব্যাপক স্বীকৃতি পায়।
তার অবদান স্মরণীয় করে রাখতে কাউন্সিল অন টল বিল্ডিংস অ্যান্ড আরবান হ্যাবিট্যাট (সিটিবিইউএইচ) ‘ফজলুর আর. খান লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট মেডেল’ প্রবর্তন করেছে। বাংলাদেশ সরকারও তাকে মরণোত্তর স্বাধীনতা পদকে ভূষিত করে।
১৯৮২ সালের ২৭ মার্চ সৌদি আরবের জেদ্দায় ৫২ বছর বয়সে তার মৃত্যু হয়। তবে তার উদ্ভাবিত কাঠামোগত নকশাপদ্ধতি আজও বিশ্বের প্রকৌশলশিক্ষা ও ভবন নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
বাংলাদেশের গর্ব, বিশ্বের সম্পদ
ফজলুর রহমান খানের জীবন থেকে সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, বিজ্ঞান কেবল তাত্ত্বিক জ্ঞান নয়; মানুষের বাস্তব সমস্যার কার্যকর সমাধান তৈরির মাধ্যম। গণিত, পদার্থবিজ্ঞান ও সৃজনশীল চিন্তার সমন্বয়ে তিনি এমন নকশাপদ্ধতি তৈরি করেছিলেন, যা শহরের আকাশরেখা বদলে দিয়েছে।
তিনি মুসলিম ও বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত একজন প্রকৌশলী হিসেবে বিশ্বমঞ্চে বিশেষ পরিচিতি অর্জন করেছেন। তবে তার অবদানের মূল্যায়ন শুধু ধর্মীয় পরিচয় বা জাতীয় গর্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আধুনিক কাঠামোগত প্রকৌশলকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া এবং নির্মাণশিল্পে দক্ষতা বাড়ানোর জন্যই তিনি বিশ্বজুড়ে স্মরণীয়।
--------------------
আজ বিশ্বের বিভিন্ন শহরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা আকাশচুম্বী ভবনগুলোর নকশা ও নির্মাণপ্রযুক্তিতে তার চিন্তার প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ প্রভাব রয়েছে। তাই ফজলুর রহমান খান কেবল বাংলাদেশের গর্ব নন, তিনি আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রকৌশল ইতিহাসেরও এক অনন্য ব্যক্তিত্ব।
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগ, ইনস্টিটিউশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ, বাংলাপিডিয়া এবং ফজলুর রহমান খানের কর্মজীবনবিষয়ক সংরক্ষিত তথ্যভান্ডার।
মন্তব্য