fbpx fbpx fbpx
দাওয়াতুল ইসলাম ২৪
মঙ্গলবার, ১৩, অক্টোবর, ২০২৬ , ২৮ আশ্বিন ১৪৩৩
কুরআন প্রজেক্টে হাদিয়া দিন

হাটহাজারী মাদরাসা: উপমহাদেশের কওমি শিক্ষাধারার এক ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান

চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে অবস্থিত আল-জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম বাংলাদেশের কওমি মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম পরিচিত প্রতিষ্ঠান। এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে ধর্মীয় শিক্ষা, কুরআন-হাদিসের পাঠদান এবং আলেম গড়ে তোলার ধারায় প্রতিষ্ঠানটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। স্থানীয় পরিসর ছাড়িয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের শিক্ষার্থী ও ধর্মপ্রাণ মানুষের কাছে এটি হাটহাজারী মাদরাসা নামেই সুপরিচিত। ঐতিহ্য, ধর্মীয় জ্ঞানচর্চা ও প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতার কারণে বাংলাদেশের কওমি শিক্ষার ইতিহাসে প্রতিষ্ঠানটির বিশেষ স্থান রয়েছে।

চারিয়া গ্রাম থেকে স্থায়ী প্রতিষ্ঠানে

প্রতিষ্ঠানটির ইতিহাসের সূচনা ১৮৯৭ সালে। মাদরাসার নিজস্ব ইতিহাসবিষয়ক তথ্য অনুযায়ী, হযরত মাওলানা হাবীবুল্লাহ (রহ.) চট্টগ্রামের হাটহাজারী এলাকায় দ্বীনি শিক্ষার কার্যক্রম শুরু করেন। প্রথমে হাটহাজারী উপজেলা সদর থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে চারিয়া গ্রামে স্থানীয় শিক্ষার্থীদের পাঠদান করা হতো। পরে স্থান পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় ১৮৯৯ সালের দিকে হাটহাজারী বাজারের ফকির মসজিদের কাছে মাদরাসার কার্যক্রম পরিচালিত হয়। বিভিন্ন প্রতিকূলতা পেরিয়ে ১৯০১ সালে বর্তমান স্থানে প্রতিষ্ঠানটি স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

মাদরাসা প্রতিষ্ঠার পেছনে স্থানীয় আলেমদের পাশাপাশি ধর্মপ্রাণ ও দানশীল মানুষের অবদান ছিল গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিষ্ঠানের ইতিহাসে মাওলানা আবদুল ওয়াহেদ (রহ.), মাওলানা সুফি আজীযুর রহমান (রহ.) এবং মাওলানা আবদুল হামিদ (রহ.)-এর সহযোগিতা ও পরামর্শের কথা উল্লেখ রয়েছে। স্থায়ী ভবন নির্মাণের জন্য স্থানীয় দানশীল গোলবদন জমাদারের পরিবারের পক্ষ থেকেও জমি দেওয়া হয়। তাঁদের সম্মিলিত উদ্যোগে ছোট পরিসরে শুরু হওয়া শিক্ষাকেন্দ্রটি ধীরে ধীরে একটি বড় ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রূপ নেয়।

প্রতিষ্ঠানের শুরুর সময় শিক্ষার্থীসংখ্যা ছিল অল্প। মাদরাসার নিজস্ব ইতিহাসে বলা হয়েছে, স্থায়ীভাবে কার্যক্রম শুরুর প্রথম সপ্তাহেই শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৫০-এ পৌঁছায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়তে থাকে এবং পাঠদানের পরিধিও বিস্তৃত হয়। একপর্যায়ে প্রতিষ্ঠানটি চট্টগ্রামের গণ্ডি পেরিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠে।

কুরআন-হাদিসের জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র হাটহাজারী মাদরাসার শিক্ষাব্যবস্থার মূল ভিত্তি কুরআন, হাদিস ও ইসলামী শরিয়তভিত্তিক জ্ঞানচর্চা। কওমি শিক্ষাধারার প্রচলিত পাঠক্রম অনুসারে এখানে আরবি ভাষা, ইসলামী আইনশাস্ত্র, তাফসির, হাদিসসহ বিভিন্ন ধর্মীয় বিষয়ে পাঠদানের ব্যবস্থা রয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের ধর্মীয় জ্ঞান অর্জন, নৈতিকতা চর্চা এবং ব্যক্তিগত জীবনে ইসলামী আদর্শ অনুসরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষাক্রমে প্রাথমিক স্তর থেকে উচ্চতর ধর্মীয় শিক্ষা পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায় রয়েছে বলে মাদরাসার পরিচিতিমূলক তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। হিফজুল কুরআন, তাজবিদ ও কিরাত, তাফসির, হাদিস, ফিকহ এবং আরবি সাহিত্যসহ একাধিক বিষয়ে শিক্ষার সুযোগ রয়েছে। এসব বিষয়ে অধ্যয়নের মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীরা ধর্মীয় পাঠ, ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ এবং ইসলামী জ্ঞানচর্চার সঙ্গে পরিচিত হন।

দাওরায়ে হাদিস কওমি শিক্ষাব্যবস্থার উচ্চতর স্তর হিসেবে পরিচিত। হাটহাজারী মাদরাসার অন্যতম পরিচয় হলো এই স্তরে হাদিসের পাঠদান। দীর্ঘদিন ধরে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শিক্ষার্থীরা এখানে উচ্চতর ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণের জন্য আসেন। প্রতিষ্ঠানের সুনাম ও ঐতিহ্যের কারণে মাদরাসাটি কওমি শিক্ষাব্যবস্থার আলোচনায় নিয়মিত স্থান পায়।

শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও আবাসিক পরিবেশ

বৃহৎ আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে হাটহাজারী মাদরাসার কার্যক্রমে পাঠদানের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন জীবনযাপন, ইবাদত ও অধ্যয়ন গুরুত্বপূর্ণ। নির্ধারিত পাঠক্রম, শিক্ষকদের তত্ত্বাবধান এবং আবাসিক পরিবেশের মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীরা নিয়মিত পড়াশোনার সুযোগ পান। ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি শৃঙ্খলা, দায়িত্ববোধ ও নৈতিক আচরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়াও কওমি মাদরাসার প্রচলিত শিক্ষাধারার অংশ। মাদরাসার নিজস্ব পরিচিতিমূলক ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্যে প্রায় আট হাজার শিক্ষার্থী এবং ১১০ জন শিক্ষক ও কর্মকর্তার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। একই তথ্যে দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য বিনা মূল্যে বা স্বল্পমূল্যে খাবারের ব্যবস্থার কথাও বলা হয়েছে। তবে এসব সংখ্যা ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে উল্লেখ করা হচ্ছে; বর্তমান শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থী ও শিক্ষক-কর্মকর্তার সংখ্যা পরিবর্তিত হয়ে থাকতে পারে।

আবাসিক ব্যবস্থার কারণে দেশের দূরবর্তী অঞ্চল থেকে আসা শিক্ষার্থীদের জন্য এখানে পড়াশোনার সুযোগ তৈরি হয়েছে। দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীদের ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণে সহায়তা করার ক্ষেত্রে এ ধরনের আবাসিক ও খাবারের ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত সংখ্যা, আবাসন সক্ষমতা ও সহায়তা কার্যক্রমের হালনাগাদ পরিসংখ্যান জানতে প্রতিষ্ঠানের সর্বশেষ তথ্য প্রয়োজন।

আলেম তৈরিতে দীর্ঘদিনের ভূমিকা

হাটহাজারী মাদরাসার অন্যতম লক্ষ্য ধর্মীয় জ্ঞানসম্পন্ন আলেম তৈরি করা। প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব ইতিহাসে উল্লেখ করা হয়েছে, এখান থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা বহু আলেম দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মসজিদ, মাদরাসা, মক্তব ও অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁদের কেউ শিক্ষকতা, কেউ ইমামতি, আবার কেউ ধর্মীয় আলোচনা, লেখালেখি ও গবেষণার কাজে যুক্ত রয়েছেন।

একটি ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রভাব কেবল তার নিজস্ব ক্যাম্পাসে সীমাবদ্ধ থাকে না। শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা শেষে নিজ নিজ এলাকায় ফিরে শিক্ষা ও ধর্মীয় কার্যক্রমে যুক্ত হলে তাঁদের মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞান বৃহত্তর সমাজে ছড়িয়ে পড়ে। হাটহাজারী মাদরাসার দীর্ঘ ইতিহাসেও এ ধরনের বিস্তারের কথা গুরুত্বের সঙ্গে উঠে আসে।

প্রতিষ্ঠানটিকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সময়ে ধর্মীয় শিক্ষার প্রসার ঘটেছে এবং এর শিক্ষাধারার অনুকরণে অন্যান্য স্থানেও মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে প্রতিষ্ঠানটির ইতিহাসে দাবি করা হয়েছে। এ কারণে হাটহাজারী মাদরাসাকে বাংলাদেশের কওমি শিক্ষার বিকাশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

প্রকাশনা ও ধর্মীয় জ্ঞান প্রচার

শিক্ষা কার্যক্রমের পাশাপাশি ধর্মীয় জ্ঞান প্রচারেও প্রতিষ্ঠানটির উদ্যোগ রয়েছে। মাদরাসার পরিচিতিমূলক তথ্যে ‘মাসিক মুঈনুল ইসলাম’ নামে একটি সাময়িকী প্রকাশের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এ ধরনের প্রকাশনার মাধ্যমে ধর্মীয় বিষয়, ইসলামী জীবনাচার, কুরআন-হাদিসের ব্যাখ্যা এবং সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয়ে পাঠকদের কাছে আলোচনা পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। 

ধর্মীয় শিক্ষার বিস্তারে মৌখিক পাঠদান, ওয়াজ-মাহফিল, আলোচনা ও প্রকাশনার ভূমিকা ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। হাটহাজারী মাদরাসার দীর্ঘদিনের কার্যক্রমেও এসব মাধ্যমের উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে বর্তমান সময়ে জ্ঞানচর্চাকে আরও বিস্তৃত করতে প্রকাশনার পাশাপাশি ডিজিটাল মাধ্যমে নির্ভরযোগ্য তথ্য ও শিক্ষামূলক উপকরণ প্রকাশের সুযোগও রয়েছে।

ঐতিহ্য রক্ষা ও সময়ের সঙ্গে এগিয়ে চলা

এক শতাব্দীর বেশি সময় ধরে টিকে থাকা একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য ঐতিহ্য রক্ষার পাশাপাশি পরিবর্তিত সময়ের প্রয়োজন বিবেচনা করাও গুরুত্বপূর্ণ। ধর্মীয় শিক্ষার মৌলিক বিষয়গুলো অক্ষুণ্ন রেখে ভাষাগত দক্ষতা, গবেষণামুখী পাঠাভ্যাস, তথ্য যাচাই এবং সমাজের বাস্তব সমস্যা সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের সচেতনতা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। এতে শিক্ষার্থীরা ধর্মীয় জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি বৃহত্তর সমাজের সঙ্গে গঠনমূলকভাবে যুক্ত হতে পারেন।

হাটহাজারী মাদরাসার দীর্ঘ ইতিহাস, কুরআন-হাদিসভিত্তিক পাঠদান এবং আলেম তৈরির ধারাবাহিকতা বাংলাদেশের ধর্মীয় শিক্ষার ইতিহাসে এর গুরুত্ব তুলে ধরে। ১৮৯৭ সালে শিক্ষাকার্যক্রমের সূচনা থেকে ১৯০১ সালে স্থায়ী প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠা, এরপর প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে শিক্ষার্থীদের পাঠদান, সব মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটি একটি দীর্ঘ ঐতিহাসিক পথ অতিক্রম করেছে। 

চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে গড়ে ওঠা এই মাদরাসা আজ শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম নয়; এটি বাংলাদেশের কওমি শিক্ষাধারার ইতিহাস, ধর্মীয় জ্ঞানচর্চা এবং প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি পরিচিত নাম। সময়ের পরিবর্তনের মধ্যেও শিক্ষা, নৈতিকতা ও জ্ঞানচর্চার ধারাকে এগিয়ে নেওয়াই প্রতিষ্ঠানটির সামনে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে অবস্থিত আল-জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম। ১৯০১ সালে স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত এই মাদরাসা বাংলাদেশের কওমি শিক্ষাব্যবস্থার ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি।

মন্তব্য