বড় হুজুর সমাচার- পর্ব-৫ মুফতি ফুলানের তৎপরতা-২
পূর্ব প্রকাশিতের পর
ধর্মকে পার্থিব স্বার্থে ব্যবহার করা একটি সুস্পষ্ট
প্রতারণা। এ প্রতারণার করালগ্রাস থেকে মুক্ত নয় আজকের কোনো ধর্মের মানুষই। হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, ইসলাম
ইত্যাদি পৃথিবীতে আজ যত ধর্ম প্রচলিত আছে তার সবই এখন ধর্মব্যবসায়ীদের হাতে
কুক্ষিগত। কেউ ধর্মের ধ্বজাধরে ধর্মীয় পুস্তকাদির মুখস্ত বিদ্যা আউড়িয়ে অর্থ
উপার্জন করছে, আবার
কেউ ধর্মকে বানাচ্ছে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের অন্যতম হাতিয়ার।
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মানুষের চিন্তার জগতকে যতটা
প্রসারিত করেছে, তারচেয়ে
অনেক বেশি সুযোগ করে দিয়েছে চিন্তার বাস্তবায়ন ঘটানোর। শিক্ষিত অশিক্ষিত সবার
কাছেই সমান অংশীদারিত্ব নিয়ে হাজির হয়েছে প্রযুক্তি। তাই মুফতি ফুলান গংদের আয়েশি
জীবন যাপনে অনেকটাই ভাটা পরেছে। বুদ্ধিমত্তা যখন জীবনের অভিজ্ঞতার সঙ্গে সংমিশ্রত হয়, তখন তা জ্ঞানের জন্ম দেয়। অভিজ্ঞতা
তার নিজের জীবন-পরিবার, সমাজ ব্যবস্থা, পড়াশোনার মাধ্যমে বা অন্যের কাছ থেকে আসতে পারে।
বহু চেষ্টা করিয়াও মুফতি
ফুলান মুসুল্লিদেরকে তার নজরে আনতে পারতেছেন না। মসজিদের মিম্বরে বসে ইঙ্গিতে
তাদেরকে বহু শাসাইলেন, বহু প্রক্রিয়া
অবলম্বন করিলেন; তথাপি মুসুল্লিরা তার
মেকমতপূর্ণ কথায় কান দিতেছেনা। অগত্যা সে খোদার নিকট হাত তুলিয়া কাঁদিয়া দিলো।
তার সে কান্নায় সেদিন বাতাস ভারি হয়েছিল। হাউমাউ করে কান্নার আওয়াজ মসজিদের দেয়ালে
প্রতিধ্বনি হয়ে দ্বিগুন হতে লাগিল। কতক মুসুল্লিও তার কান্নার সাথে তাল মিলিয়ে চোখের
পানি ঝড়াতে লাগিলেন।
আম পাবলিকের হঠাৎ কি যেন হয়ে
গেলো! মুফতি সাহেবকে কিছুটা পাশ কাটিয়ে চলতেছে তারা। বিষয়টি তার নজরে ধরা পড়েছে।
ফুলান সাহেবের বয়সে অপরাহ্নতা বিরাজ করলেও হাদিয়া তুহফা ছিল পূর্বাহ্নে। কিন্তু
বয়সের সাথে হাদিয়া তুহফার আগমনটাও যেন একাকার হয়ে অপরাহ্ন বেলায় গিয়ে ঠেকেছে। তাই
তিনি এর কারণ খুঁজতে মনোযোগি হলেন। অনেক পর্যবেক্ষণের পর জানা গেলো দেশে বেশ কিছু
ইসলামিক স্কলার্সের আবির্ভাব হয়েছে। তারা ইসলামকে আধুনিকায়ন করার কাজে বেশ তৎপর।
মিলাদ, খতম, পানি পড়া, তাবিজ-তুমার,
ঝাড় ফুঁক এগুলোর অনুপস্থিতি ফুলানকে প্রচণ্ড ভাবিয়ে তুলেছে। ১০/১২ জাতের রান্না করা
তরকারী দিয়ে ভাত খাওয়া হয় না অনেকদিন। জামা-কাপড়, সুগন্ধি, শুকনা খাবারের ঘাটতি তো
আছেই। এসব বালা মুসিবত সহসাই কেন নেমে এলো বুঝতে পারছেন না তিনি। কথার ফুলঝুড়ি, পরকালের
বয়ান, মৃত পিতা-মাতার আলোচনা এগুলোর তো কোন কমতি রাখেননি তিনি। তাহলে কেন এমন দুর্যোগ?
অবশেষে বিষয়টি আবিষ্কার করলেন
মুফতি ফুলান। সৌদি আরব, মিশর, কাতারসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে কয়েক ডজন ইসলামিক স্কলার্স
মিডিয়ার মাধ্যমে কুরআন হাদিসের সঠিক দলিল আদিল্যা দিয়ে লেকচার দিয়ে বেড়াচ্ছেন। তাদের
এসব লেকচার সব ধরনের পাবলিম খাচ্ছে, বিশেষ করে উঠতি বয়সের পুলাপান; যারা কলেজ ভার্সিটিতে
পড়াশোনা করছে। নিজের হাতে গড়া মানুষগুলো দলে দলে দিকবিদিক ছুটে বেড়াচ্ছে আর বলছে মুফতি
ফুলান গংরা যা বলে তা নাকি বানোয়াট এবং আজগুবি। নব্য স্কলার্সগণই নাকি ইসলামের সঠিক
ব্যাখ্যা দিচ্ছে। তাই ফুলানদের অপতৎপরতা এ সমাজে আর চলবে না।
বর্তমানে পীর-ফকির, আলেম-জাহেল, কি শিক্ষিত, কি অশিক্ষিত
অনেকেই তাবিজ-কবচ, তাগা, কড়ি, সামুক, ঝিনুক ও
গাছ-গাছালির শিকর-বাকর ইত্যাদি দিয়ে বিভিন্ন রোগের চিকিৎসা করেন এবং ইহা বৈধ ও
জায়েজ মনে করেন। এ সম্পর্কে বাজারে কিছু বই পুস্তক পাওয়া যায়, সে সব বইয়ে
নির্ধারিত বিষয়ে গ্রহণ যোগ্য কোন দলিল নেই, আছে কিছু মনগড়া কিচ্ছা-কাহিনী, অসংখ্য তদবিরের
বর্ণনা ও তার বানোয়াট ফাজায়েল। এ সব বই পড়ে কেউ কেউ বিপদাপদ, দুঃখ-কষ্ট, অভাব-অনটন, রোগ, যন্ত্রণা থেকে
মুক্তি লাভের আশায় বিভিন্ন তদবির ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ হয় ও তা গ্রহণ করে। তারা এ
ধরণের চিকিৎসার মূল্যায়ন ও তার বৈধতা-অবৈধতা সম্পর্কে পুরোপুরি অজ্ঞ। এসব ভণ্ডামী
ছেড়ে সঠিকভাবে ইসলামের অনুশাসনগুলো যেনে সাধারণ পাবলিক পালন করে, এমন মিশন নিয়েই ইসলামিক
স্কলারগণ মাঠে নেমেছেন।
ইসলামিক স্কলারগণের
এসব কর্মকাণ্ডে শুধু যে মুফতি ফুলানই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তা নয়, বরং তার মতো
অসংখ্য ইসলামের ধারক-বাহক দাবীদারগণ সমানভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। কেউ যদি
প্রতিদিন এক কেজি খাবার খান, তবে কোনদিন এর চেয়ে কম খেলে তার খারাপই লাগার কথা।
কারণ, তার তো এক কেজি খেয়ে অভ্যাস হয়ে গেছে; কি করে তিনি এর কম খাবেন। এতো
কল্পনাতীত এবং অসম্ভব।
নিজেদের আয় রোজগার
হ্রাস, সামাজিকভাবে পরোক্ষ অবমূল্যায়ন, আম-জনতা বশ না মানা এসব কারবারগুলো মূলত: কি কারনে
ঘটছে, এটা প্রকাশ্যে বলা যায় না। কারণ, নিজেদের মধ্যে যথেষ্ঠ দূর্বলতা আছে, এটা খুবই
পরিষ্কার। এগুলো জাহির করার মতো নয়, জাহির করলে ধরা খেতে হবে। তাই কৌশলে এর প্রতিকার
করার নতুন এক পদ্ধতি অবলম্বন করতে চান ফুলান গং।
কথায় আছে- দোকানদারের
খাবার নষ্ট করেছে একটি সুস্থ সবল কুকুর। মুশকিল হলো কুকুরের কাণ্ডটি পাবলিকের কাছে
বলা যাবে না, বললেও কেউ কুকুরকে শায়েস্তা করার জন্য এগিয়ে আসবেনা। তাই সে হেকমতের সাথে
কাজ করার সিদ্ধান্ত নেয়। পাবলিকের কাছে প্রচার করতে থাকে যে, এ কুকুরটি পাগল, এর ধারে
কাছেও কেউ যাবেন না। দোকানদার আরও বলল, যদি সম্ভব হয় তবে চলুন! সবাই মিলে কুকুরটিকে
মেরে ফেলি। দোকানদার তার উদ্দেশ্য হাসিল করার জন্য জনগণকে ভুল তথ্য দিয়ে সুস্থ কুকুরকে
পাগল বানিয়ে দেয়।
মুফতি ফুলান গংরাও
একদল আন্তর্জাতিকমানের উচ্চশিক্ষিত ইসলামিক স্কলারদেরকে ইহুদিদের দালাল, বিদআতি, গোমরাহ
ইত্যাদি কিসিমের মিথ্যা অপবাদ দিয়ে সমাজচ্যুত ও গণবিচ্ছিন্ন করতে চায়। এর পেছনে অন্য
কোনো কারণ নেই, শুধুমাত্র ব্যক্তিস্বার্থ ছাড়া। বিনা পুঁজিতে লাভজনক রমরমা ব্যবসা,
আয়েশি জীবন যাপন, মোটা অংকের হাদিয়াসহ বিস্তর সুযোগ সুবিধা হাতছাড়া হওয়ার সমুহ সম্ভাবনাই
এর মূল কারণ।
দিনের আলো কিংবা রাতের
আঁধার হর হামেশাই জনগণকে নীতিবান লোকদের ক্ষেপিয়ে তোলার ঘৃণ্য খেলায় মেতে উঠেছে তারা।
নীতিবানরা চায়- ভেজালহীন ইসলাম সমাজের পরতে পরতে ঢুকে যাক আর ধান্ধাবাজরা চায় ভেজাল
হোক আর নির্ভেজাল হোক জাগতিক ফায়দা আমাদের চায়ই চাই। ইসলাম শুধু একটি সাইনবোর্ড ব্যতিত
আর কিছুই নয়।
মন্তব্য