কুরসী- আকাশ ও জমিনের সমান প্রশস্ত
“তাহার আসন আকাশ ও পৃথিবীতে পরিব্যাপ্ত”। অত্র আয়াতের ব্যাখায় ইমাম বায়যাবী লিখেছেন, আল্লাহ তায়ালার পরাক্রম প্রকাশই এ বাক্যের উদ্দেশ্য। অন্যথায় তাঁর আসনও নেই এবং আসনে উপবেশনকারীও ন। হযরত সাঈদ ইবনে জোবায়ের রা. বলেছেন, হজরত ইবনে আব্বাসের মতে, আসন হচ্ছে এলম (জ্ঞান)। মুজাহিদের মতও তাই। কতিপয় আলেম ‘আসন’ অর্থ নিয়েছেন আল্লাহ তায়ালার অলৌকিক রাজত্ব। আমি বলি আসন অর্থ, এলেম ও অলৌকিকত্ব দুইই। এই আয়াতের প্রথম অংশে আল্লাহ তায়ালার অলৌকিকত্ব এবং শেষাংশে জ্ঞানের পরিপূর্ণতা প্রকাশ পেয়েছে। মুহাদ্দিসগণের সুবিখ্যাত বর্ণনা হলো, আসন দৈর্ঘ, প্রস্থ ও উচ্চতা বিশিষ্ট।
হযরত আবু হুরায়রা বলেন, আসন (কুরসী) হচ্ছে আরশের ছাদ যা আকাশ ও জমিনের সমান প্রশস্ত।
ইবনে মারদুবিয়া হজরত আবু হুরায়রাথেকে বর্ণনা করেছেন, হজ রাসুল সা: বলেছেন, সাত আকাশ ও সাত জমিন কুরসীর তুলনায় এ রকম, যেমন প্রকান্ড প্রান্তরে পড়ে থাকা একটি আংটি। আরশের তুলনায় কুরসীও তদ্রুপ।
হযরত ইবনে আব্বাস বলেন, কুরসীর নিকট সাত আকাশ এরকম, যেনোঢালের মধ্যে সাতটি দেরহাম।
হযরত আলী ও হযরত মুকাতিল (রা:) বর্ণনা করেন, প্রতিটি স্তম্ভ সপ্ত আকাশ ও সপ্ত জমিনের সমান । কুরসী আরশের সামনে আছে। চারজন ফেরেশতা এর বাহক। তাঁদের চারটি করে মুখ। তঁদের পা সপ্তজমিনের নিচে পাথরের উপর। এক ফেরেশতা হতে আরেক ফেরেশতার ব্যবধান দুনিয়ার পাঁচশত বৎসরের পথ। একজনের চেহারা হজরত আদম আ. এর মত তিনি মানুষের রিজিকের জন্য দোয়া করতে থাকেন। দ্বিতীয় জনের চেহারা চতুস্পদ প্রাণীর মতো অথবা গাভীর মতো। তিনি দোয়া করতে থাকেন চতুস্পদ জন্তুর রিজিকের জন্য। যখন বাছুরের পূজা করা হয় তখন তাঁর মুখ মলিন হয়ে যায়। তৃতীয় ফেরেশতা আকৃতি সিংহের মতো। হিংস্র জানোয়ারের রিজিকের জন্য দোয়া করাই তার কাজ। চতুর্থ ফেরেশতার অবয়ব শকুনের মতো। পাখিদের রিজিক প্রার্থনায় তাঁর কাজ। বিভিন্ন হাদিসে এসেছে, আরশ ও কুরসী বহনকারীদের মধ্যে সত্তরটি নূরের এবং সত্তরটি অন্ধকারের পর্দা আছে। প্রতিটি পর্দা পাঁচশত বছরের। পর্দাসমূহ না থাকলে কুরসী বহনকারীগণ আরশবহনকারীদের নূরে নিশ্চিহ্ন হয়ে যেত। প্রকৃত পক্ষে কুরসী এমন স্থান যাতে উপবেশন করা যায়। প্রশস্ত স্থানকে কুরসী বলা যায় না। কিন্তু কুরসী ও আরশ আল্লাহ তায়ালার জন্যই বিশিষ্ট। অন্য কারো জন্য শব্দ দু‘টি প্রযোজ্য হতে পারে না। অন্য কারো জন্য শব্দ দু‘টি প্রযোজ্য হতে পারে না। অন্য একটি আয়াতে উল্লেখ এ রকম, অত:পর সুবিন্যস্ত করেছেন সাতটি আকাশ’- এই বাক্যটির ব্যাখ্যায় আমরা লিখেছি আরশ বৃত্তাকার। হাদিস দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে, কুরসী আকাশসমুহকে বেষ্টন করে আছে এবং কুরসীকে বেষ্টন করে আছে আরশ। আর এক আকাশকে বেষ্টন করে আছে অন্য আকাশ। প্রত্যেক আকাশ গোলাকার। এ জন্য বিভিন্নজন বলেছেন, অষ্টম আকাশ কুরসী এবং নবম আকাশ আরশ। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা আকাশের স্যখ্যা নির্ধারণ করেছেন সাতটি। আরশ ও কুরসীকে তিনি আকাশ বলেননি। সম্ভবত এর কারণ এই যে, আরশ , কুরসী এবং আকাশের হকিকত পৃথক। আল্লাহই ভালো জানেন।
‘ইহাদের রক্ষণাবেক্ষণ তাঁহাকে ক্লান্ত করে না;- আকাশ, পৃথিবী, কুরসী এবং কুরসী যে সমস্ত কিছুকে বেষ্টন করে আছে সে সমস্তের সংরক্ষেণে তিনি ক্লান্ত নন। বিব্রতও নন। তাঁর জ্ঞান, পরাক্রম, স্থায়িত্ব এই আয়াতে প্রমাণিত হয়েছে।
হযরত আবু জর (রা:) হযরত ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেন, কুরসীর বেষ্টন কোরআনের ব্যাখ্যা দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে। গবেষণা দ্বারা নয়। কুরসী হচ্ছে আল্লাহ তায়ালার পরাক্রমের প্রকাশ। আকাশগুলো কুরসীর কাছে এতো ছোট যেমন ঢালের মধ্যে সাতটি আংঠি অথা প্রান্তরে পড়ে থাকা কোনো ক্ষুদ্র অঙ্গুরীয়। কুরসীর বেষ্টন কি আকৃতিসম্ভুত। নাকি অলোকিকতাচ্ছিাদিত। নাকি জ্ঞানাবৃত। না হুকুম ও ইচ্ছাবরিত - তা অনুমান করা সাপেক্ষ নয়। ইমানদারদের অন্তরগুলো আল্লাহ রহমানের দুই আঙ্গুলের মধ্যে - এ অবস্থাটিও অননুমানীয়। যা সম্ভব নয় দার্শনিকেরা তাই করতে চেষ্ট করেছে। তাই তারা ভ্রষ্ট। অতএব এই ফকিরের দৃষ্টিতে প্রকৃত পথ এই যে, নিজেদের অভিমতানুসারে কোরআন মজিদ ও হাদিস শরীফের ব্যাখ্যাগুলোকে যেনো মেলানোর চেষ্টা না করা হয়। হ্যা, যদি কোনো দার্শনিক কোরআনের ব্যাখ্যায় নির্ভর করে তবে তাতে দোষ নেই।
মন্তব্য