fbpx fbpx fbpx
বুধবার, ০৩, জুন, ২০২৬ , ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

মুসলিম ঐতিহ্য ও মনীষীদের পদচারনায় মুখরিত উজবেকিস্তান

আজকে আমরা আলোচনা করবো মধ্য এশিয়ার মুসলমান অধ্যুষিত দেশ উজবেকিস্তান সম্পর্কে। অনেক বিশ্ব বিজয়ী বীর এবং কুশীলবদের নানামুখী তৎপরতার নীরব সাক্ষী এই দেশ। এক সময় আলেকজান্ডার ও চেঙ্গিস খানের সৈন্যরা উজবেকিস্তান দখল করেছিল। অন্যদিকে ইরান ছাড়াও অধুনালুপ্ত সোভিয়েত ইউনিয়নেরও অংশ ছিল এই দেশ। দীর্ঘ পথপরিক্রমা শেষে ১৯৯১ সালের ৩১ আগস্ট মস্কোতে ব্যর্থ অভ্যুত্থানের দিন উজবেকিস্তান স্বাধীনতা ঘোষণা করে  ১ সেপ্টেম্বর দেশটিতে স্বাধীনতা দিবস পালিত হয়।

দেশিটিতে রয়েছে ১২টি প্রদেশ, একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল এবং পৃথক সত্তায় গড়ে ওঠা রাজধানী ‘তাসখন্দ।’ উজবেকিস্তানের আয়তন বাংলাদেশের প্রায় তিন গুণ। ৪,৪৮,৯৮৭ বর্গকিলোমিটার। জনসংখ্যা প্রায় সাড়ে তিন কোটি। বিভিন্ন উপজাতি সম্প্রদায়, গোত্র, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও বহু ভাষাভাষী মানুষের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের মধ্য দিয়ে দ্রুত উন্নতির পথে এগিয়ে চলছে  মুসলিম অধ্যষিত উজবেকিস্তান।

উজকেকিস্তান অর্থনীতি মূলত খনিজ সম্পদনির্ভর। বছরে দেশটি ৮০ টন স্বর্ণ উৎপাদন করে, যা বিশ্বের স্বর্ণ উৎপাদনকারী শীর্ষ দেশগুলোর মধ্যে সপ্তম। তামা মজুদের ক্ষেত্রে দশম এবং ইউরেনিয়াম মজুদের ক্ষেত্রে দ্বাদশ অবস্থানে রয়েছে উজবেকিস্তান। অন্যদিকে প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদনের ক্ষেত্রে দেশটির অবস্থান বিশ্বের ১১ নম্বরে। পর্যটনের জন্য দেশটির সুনাম রয়েছে বিশ্বেজুড়ে।

দেশটি প্রায় সাড়ে তিন কোটি মানুষের মধ্যে ৮৮ শতাংশ বা ৩ কোটির বেশি মুসলমান। তারা সুফি ঘরানায় বিশ্বাসী ও সুন্নি মতাবলম্বী। খেলাফতের জামানায় উজবেকিস্তানে ইসলাম ছড়িয়ে পড়ে। নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর চাচাত ভাই হজরত কুসাম ইবনে আব্বাস (রা.) ইসলামের বাণী নিয়ে সপ্তম শতকে উজবেকিস্তানে পৌঁছেন এবং তৎকালীন শাসকসহ সবার মাঝে ইসলামের বার্তা পৌঁছে দেন।

৮১৯ থেকে ৮৯৯ সাল পর্যন্ত ইরানে সামানিদ বংশের শাসন চলে। সুন্নি মতাবলম্বী সামানিদ বংশের পৃষ্ঠপোষকতায় ইসলামের বাণী ও সামানিদ শাসনের পরিধি যুগপৎভাবে আফগানিস্তান ও উজবেকিস্তানসহ এ অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে বিস্তার লাভ করে।

খ্রিস্টীয় চতুর্দশ শতকের শেষ দিকে মধ্য এশিয়ায় প্রতিষ্ঠিত হয় ‘তিমুরিদ’ বংশের শাসন। এই মুসলমান বংশের প্রতিষ্ঠাতা আমির তিমুর আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ভারত ও উজবেকিস্তানসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চলে তার শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। তিমুর মুসলমান বিদ্যানদের অত্যন্ত সমাদর করতেন। ওই সময় মুসলমানদের জ্ঞান, বিজ্ঞান, শিল্প, সাহিত্য, চিকিৎসা, দর্শন আবিষ্কার প্রভৃতি এক স্বর্ণযুগ অতিক্রম করে। যার নীরব সাক্ষী উজবেকিস্তানের সমরখন্দ। ভারতবর্ষ জয়ের পর আমির তিমুর তার নতুন রাজধানী সমরখন্দে স্থাপন করেন এবং তৎকালীন বিশ্বের অন্যতম সুন্দর এবং বৃহত্তম ‘বিবি খানম মসজিদ’ নির্মাণ করেন।

উজবেকিস্তানে বিশ্বের বহু বরেণ্য মনীষী জন্মগ্রহণ করেছেন। তাই বিশ্ব সভ্যতা যতদিন টিকে থাকবে, ততদিনই উজবেকিস্তানের নাম উচ্চারিত হতে থাকবে। ৯৭৩ সালে বর্তমান উজবেকিস্তানের সীমান্তবর্তী শহর ‘বিরুনি’তে জন্মগ্রহণ করনে জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রবাদপুরুষ আবু রায়হান মোহাম্মদ ইবনে আহাম্মদ আল বিরুনি। যাকে আমরা আল বিরুনি নামে চিনি। ৭৭ বছর বেঁচে ছিলেন এই জ্ঞান তাপস। ১০৫০ সালে বর্তমান আফগানিস্তানের গজনিতে মৃত্যুবরণ করেন আল বিরুনি এবং সেখানেই তাকে সমাহিত করা হয়।

নবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্মস্থান মক্কা থেকে প্রায় চার হাজার কিলোমিটার দূরে বর্তমান উজবেকিস্তানের সমরখন্দ এলাকার তিরমিজ নামক স্থানে জন্ম নেন বিখ্যাত হাদিস সংগ্রহকারী মুহাম্মদ ইবনে ইসা আত-তিরমিজি। সংক্ষেপে ইমাম তিরমিজি (রহ.)। কেউ কউ তার জন্ম মক্কায় দাবি করলেও অধিকাংশের মতে তার জন্ম বর্তমান উজবেকিস্তানে আনুমানিক ৮২৪-২৫ সালে। তবে তার পূর্বপুরুষ অন্য দেশে বসতি স্থাপন করেছেন বলে তথ্য পাওয়া যায়।

হাদিস বিশারদ ইমাম তিরমিজি (রহ.) দীর্ঘ পাঁচ বছর ইমাম বোখারির (রহ.) সান্নিধ্যে ইরানের নিশাপুর অঞ্চলে অবস্থান করেন এবং সংগৃহীত হাদিসের বিশুদ্ধতার বিষয়ে নিশ্চিত হন। তার সংকলিত বিভিন্ন গ্রন্থের মধ্যে ৮টি গ্রন্থ বিশেষভাবে সমাদৃত। তবে তার সংকলিত বিশুদ্ধ হাদিস গ্রন্থ ‘জামে আত তিরমিজি’ মুসলিম বিশ্বে বিশেষভাবে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। এটি বিশুদ্ধ ছয়টি হাদিস গ্রন্থের অন্যতম। তার সংকলিত ৩ হাজার ৯৬২টি হাদিস শুদ্ধতার নিরিখে বিতর্কের ঊর্ধ্বে। ৮৯২ সালের ৯ অক্টোবর পরকালে পাড়ি জমান ইমাম তিরমিজি (রহ.)। তিরমিজ থেকে ৬০ কিলোমিটার দূরে শিরাবদ নামক স্থানে তাকে দাফন করা হয়। বর্তমানে সেখানে একটি স্মৃতিসৌধ রয়েছে। ১৯৯০ সালে তার জন্মের ১২০০তম বার্ষিকী উদযাপন করা হয় এই স্মৃতিসৌধে।

চিকিৎসা বিজ্ঞানের পথপ্রদর্শকদের একজন হলেন আবু আলী হোসেন ইবনে আবদুল্লাহ আল ইবনে আল হাসান ইবনে আলী ইবনে সিনা (সংক্ষেপে ইবনে সিনা)। ইবনে সিনা ৯৮০ সালে উজবেকিস্তানের বোখারা অঞ্চলের আফসান গ্রামে পিতা আবদুল্লাহ এবং মা সিমারার ঘরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি দশ বছর বয়সে কুরআন মুখস্থ করে তার প্রখর স্মৃতিশক্তি এবং প্রতিভা দেখিয়েছিলেন। তিনি ইসলামী আইনশাস্ত্র, দর্শনেও আগ্রহী ছিলেন। যাইহোক, তিনি চিকিৎসা বিজ্ঞানের অনুশীলনে বিশেষ মনোযোগ দেন এবং 18 বছর বয়সে তিনি একজন সাধারণ অনুশীলনকারী হিসাবে স্বীকৃত হন। দিনে বিনা পয়সায় রোগী দেখতেন এবং রাতে অজু করে পড়াশুনা করতেন। শেষ জীবনে তিনি দুনিয়ার সকল মায়া ত্যাগ করে ধর্ম পালনে আত্মনিয়োগ করেন। তিনি তার সমস্ত সম্পদ গরীবদের দান করেন এবং দাসদের মুক্ত করেন। সে সময় তিনি প্রতিদিন একবার করে কুরআন পড়তেন। ইবনে সিনা ১০৩৭ সালের রমজান মাসে ৫৬ বছর বয়সে মারা যান। তাকে ইরানের হামদানে সমাহিত করা হয়।

মুসলমানদের কাছে হাদিসের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে ‘সহিহ আল বোখারি’ নামক হাদিস গ্রন্থ। এই গ্রন্থের হাদিস সংগ্রহ, সংকলন ও সম্পাদনা করেছেন ইমাম বোখারি। ৮১০ সালের ২১ জুলাই বর্তমান উজবেকিস্তানের বোখারা শহরে জন্ম নেন তিনি। মাত্র ১১ বছর বয়সে তিনি অসংখ্য হাদিস মুখস্থ করেন। এরপর তিনি বাবাকে হারান এবং ১৬ বছর বয়সে সপরিবারে মক্কায় চলে আসেন। এরপর মক্কায় বসেই শুরু হয় তার হাদিস নিয়ে সাধনা। প্রায় ১০০০ ইমাম ও ইসলামি চিন্তাবিদের কাছ থেকে প্রায় ৬ লাখ হাদিস সংগ্রহ করেন। প্রখর স্মৃতিশক্তির কল্যাণে তিনি প্রথম জীবনে প্রায় ৭০ হাজার এবং শেষ দিকে প্রায় ৩ লাখ হাদিস মুখস্থ করেছিলেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে।

শেষ জীবনে তিনি জন্মভূমি বোখারায় ফেরত আসেন এবং একটি মাদরাসা স্থাপন করেন। তৎকালীন শাসক এই মাদরাসায় নিজ পুত্রকে পৃথকভাবে পড়াতে বললে তিনি তা অস্বীকার করেন। ফলে বোখারা ছেড়ে তাকে ৩০ মাইল দূরের এক দুর্গম গ্রামে আশ্রয় নিতে হয়। শেষ জীবনে তিনি তার সব পৈতৃক সম্পত্তি দান করে দেন। এ সময় দিনে ২-১টি পেস্তা বাদাম খেয়ে তার দিন অতিবাহিত হয়। ৬২ বছর বয়সে ৮৭০ সালে খারতাঙ্ক নামক সেই দুর্গম গ্রামে মৃত্যুবরণ করেন এবং সেখানেই তাকে সমাহিত করা হয়। ১৯৯৮ সালে এখানে স্মৃতিসৌধ, মসজিদ ও মাদরাসা গড়ে তোলা হয়। উজবেকিস্তানে শতশত মাজার আছে, যেগুলো দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণ করে। রয়েছে বহু পুরনো মসজিদও। সমরকন্দ এবং বোখারা শহরে এসব মসজিদ এবং মাজারের বেশিরভাগ অবস্থিত। উজবেকিস্তানের লাখ-লাখ মানুষের জন্য এসব মসজিদ এবং মাজার পবিত্র জায়গা। তবে সোভিয়েত ইউনিয়নের আমলে বেশ কিছু মাজার ও মসজিদ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। মানুষ সেখানে যেতে পারতো না। উজবেকিস্তানে কতগুলো মাজার আছে সেটির সংখ্যা কেউ জানে না। ধারণা করা হয়, মাজারের সংখ্যা দুই হাজারের কম হবে না।

মন্তব্য