Dawatul Islam | প্রতিবেশী না প্রভু? ৫০ বছরে ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষমতার রাজনীতি

শনিবার, ১৬, মে, ২০২৬ , ২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

প্রতিবেশী না প্রভু? ৫০ বছরে ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষমতার রাজনীতি
২৩ ডিসেম্বর ২০২৫ ০৯:২১ মিনিট

১৯৭১–১৯৯০: স্বাধীনতা–উত্তর যুগে বন্ধুত্বের সূচনা ও ভারতীয় কূটনীতির ধরন

১৯৭১ সালে ভারতের সক্রিয় সহায়তায় বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করে।  পরবর্তী বছরগুলোতে শেখ মুজিবুর রহমান ও ইন্দিরা গান্ধীর মধ্যে শক্তিশালী রাজনৈতিক বন্ধুত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৭২ সালের মার্চে দুই নেতা ২৫ বছরের শান্তি ও বন্ধুত্ব চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন, যেখানে একে অপরের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ না করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় thedailystar.netএই চুক্তিতে যৌথ নদী কমিশন, বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও সীমান্ত বাণিজ্যসহ নানা ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোরও ব্যবস্থা ছিল thedailystar.net

কিন্তু ১৯৭৫ সালের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যা এবং জিয়াউর রহমানের ক্ষমতায় আগমনের পর বাংলাদেশ–ভারতের সম্পর্কে নাটকীয় পরিবর্তন আসে। নতুন প্রশাসন ভারতের বদলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও মধ্যপ্রাচ্যের সাথে ঘনিষ্ঠতা তৈরি করে। জিয়াভারত ও সাবেক সোভিয়েত ব্লকেরপরিবর্তে চীন, পাকিস্তান ও সৌদি আরবের দিকে আরও ঝুঁকেছিলেন en.wikipedia.orgসামরিক শাসনের আমলে ভারতের বিরুদ্ধে জনসাধারণের উদ্দীপনা তৈরি করে বাংলাদেশের সামরিক শাসকরা নিজেদের ক্ষমতা বৈধ করার চেষ্টা করেন ciaotest.cc.columbia.eduএই শাসক-বৃন্দ ভারত-বিরোধী অনুভূতিকে রাজনৈতিক অবস্থা টেকসই করতে ব্যবহার করে ciaotest.cc.columbia.edu ফলে ১৯৮০ এবং ৮০-এর দশকের শেষভাগে ভারতের সাথে সম্পর্ক এমন নয় যেভাবে মুক্তিযুদ্ধের পর দেখা গিয়েছিল।

১৯৯১–২০০৮: অর্থনৈতিক খোলামেলা যুগে ভারত ও বাংলাদেশের পুনরুজ্জীবন

১৯৯১ সালে ভারত ও বাংলাদেশই অর্থনৈতিক খোলামেলা নীতিতে গমন করে—ভারত নরসিংহ রাও সরকারের সময় এবং বাংলাদেশে বহুলাংশে নগদ অধিকার যুগ। এর ফলে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগে উভয় দেশই জোরালো বৃদ্ধি দেখতে পায় csep.org বাণিজ্য বৃদ্ধির পাশাপাশি যোগাযোগ ব্যবস্থাও সম্প্রসারিত হয়; ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা সরকারের অধীনে গঙ্গা নদী পানিবণ্টনের ৩০-বছরের স্থায়ী চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় thinkglobalhealth.orgউত্তর-পূর্ব ভারতের যোগাযোগ উন্নয়নে ত্রিপুরার আগরতলা-আখাউড়া রেললাইন, খুলনা-মংলা রেললাইন, ঢাকাসহ বিভিন্ন সড়ক ও রেল প্রকল্পে ভারতের বিনিয়োগ শুরু হয়। ২০০১ সালে কলকাতা–ঢাকা আন্তঃনগর বাস পরিষেবা চালু হয় এবং ২০০৮ সালে কোলকাতা-খুলনা ট্রেন চালু হয়, যা দুই দেশের মানবিক ও অর্থনৈতিক যোগসাজশ বৃদ্ধি করে।

রাজনৈতিকভাবে এই সময়ে বাংলাদেশে ক্ষমতা পাল্টায়: ১৯৯১ সালে বিএনপি, ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ, ২০০১ সালে আবার বিএনপি এবং ২০০৯ সালে পুনরায় আওয়ামী লীগ আসে। ভারত যুগপৎ সব পক্ষের সঙ্গেই যোগাযোগ রাখতে চেয়েছে, তবে মূলত আওয়ামী লীগকে বন্ধুসুলভ মনে করা হয়েছে। তথ্যমতে, নয়া দিল্লি গত দশকে বাংলাদেশের নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য প্রভাব রাখে; ২০০৮–২০০৯ বছরগুলোতে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র ও সমন্বয়করণে ভারতীয় ভূমিকা ছিল বলে অভিযোগ ওঠে thediplomat.comএ নিয়ে রাজনীতি বিশেষজ্ঞদের মতে ভারত যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নকে ঢাকায় গণতন্ত্র রক্ষার চাপ দেয়া থেকে বিরত রাখতে অনুরোধ করেছিল thediplomat.com অবশ্য এই সময়ের মধ্যে পারস্পরিক চুক্তি ও সহযোগিতা বজায় রাখার স্বার্থে দুদেশের শীর্ষনেতা নানাভাবে সম্পর্ক জোরদার করেছিল, যেমন ধর্মনিরপেক্ষতা এবং সেকুলার মূল্যবোধকে হাইলাইট করে।

২০০৯–২০২৫: আধিপত্যবাদী নীতির উত্থান, তিস্তা চুক্তি, সীমান্ত হত্যা, ভারতপন্থী রাজনৈতিক সমর্থন

২০০৯ সালে শেখ হাসিনা যখন প্রধানমন্ত্রী হন, তখন থেকে ভারতের নীতি পরিবর্তিত হয়ে আধিপত্য দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তিস্তা নদীর পানি ভাগাভাগির দীর্ঘ প্রতীক্ষার ইস্যু অমীমাংসিত থেকে যায়—পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের রাজনীতির প্রতিবন্ধকতায় ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার কোনো চুক্তি করতে পারেনি en.wikipedia.org১৯৯৬ সালের গঙ্গা চুক্তির পরেও তিস্তার পানিকে আলাদা রাখায় বাংলাদেশ গভীর হতাশায় রয়েছে। গত বছর সেপ্টেম্বরেও যোগ্য পরিকল্পনা থাকলেও চুক্তি হয়নি। এদিকে সীমান্ত ইস্যুতে গোটা সময়কালের মধ্যে সবচেয়ে টানাপোড়েনের অবস্থা বিরাজ করছে। বাংলাদেশের বিরোধী পক্ষ মনে করে ভারতের বাহিনী দেশটির অভ্যন্তরে হস্তক্ষেপ করছে এবংসংবিধান ও গণতন্ত্র পরিস্থিতিতে আনুগত্যের বিনিময়ে আওয়ামী লীগকে নীরব সমর্থন দিচ্ছে thediplomat.com

ভারতীয় নীতিবিদদের কথায়, গুল্ফ, চীন, পাকিস্তানসহ অন্যান্য বন্ধুদের সমঝোতা রক্ষা করবে সরকার। কিন্তু বাস্তবে সীমান্তে বিএসএফের কড়া পদক্ষেপ এবং অরক্ষিত গুলিতে নিহত বাংলাদেশি নাগরিকের ঘটনা সমাজে বড় ধাক্কা দিচ্ছে thedailystar.netthediplomat.comবিভিন্ন রিপোর্ট অনুযায়ী গত এক দশকে বিএসএফ গুলিতে প্রায় ৩০০-এর বেশি বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন thediplomat.comরাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ভারতের প্রতি আধিপত্যবাদিতা বৃদ্ধির ইঙ্গিত হিসেবেএই ইস্যুগুলো দেখা গেছে। সরকারের মিত্রতা হিসেবে অনেকেই স্বীকার করেন, ভারতীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠী শেখ হাসিনার প্রতি সৎ থাকলেও দেশের স্বার্থ নিয়ে অসঙ্গতি দেখা দিয়েছে thediplomat.com

সীমান্ত হত্যা ও বিএসএফ–বিজিবি সম্পর্ক: পরিসংখ্যান ও কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়া

 SHAPE  \* MERGEFORMAT

সীমান্তে বিএসএফ–বিজিবির দ্বন্দ্ব দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। মানবাধিকার সংগঠন আড়-ও-সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী ২০১৩-২০২৩ সালে বিএসএফের গুলিতে৩৩২ জনবাংলাদেশি নিহত হয়েছে (গড় বছরে প্রায় ৩০ জন) thediplomat.comআরও একটি হিসাব বলছে ২০০০-২০২০ সালে এসব গুলিতে কমপক্ষে,২৩৬ জননিহত হয়েছে।  সাম্প্রতিক রিপোর্ট থেকে দেখা যাচ্ছে, ২০২৩ সালে ৩১ জন এবং ২০২৪ সালে ৩০ জন বাংলাদেশিকে সীমান্তে বিএসএফ গুলি করেছে thedailystar.net

চুক্তিপত্র থাকা সত্ত্বেও ‘জিরো হত্যার’ প্রতিশ্রুতি ব্যর্থ হয়েছে। ২০১১ সালে ফেলানি হত্যার পর ভারতীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিএসএফের গুলিতে প্রাণনাশ বন্ধের কথা ঘোষণা করলেও, বর্তমানে বিএসএফ অতঃপর জীবন্ত লক্ষ্যবস্তুতে গুলি চালাচ্ছে thediplomat.comপাশাপাশি, সীমান্তের ওপারে জোর করে বাংলাদেশে লোক ঠেলেনতুন ইস্যু হিসেবে আসে: তথ্য মতে গত বছর মে থেকে প্রায় ২,০০০ জনকে আইন লঙ্ঘন করে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়েছে, যা মানবাধিকার লঙ্ঘন বলেই সমালোচিত হচ্ছে thedailystar.netএ খতিয়ে দেখা হয়েছে, ১৯৭৫ ও ২০১১ সালের দ্বিপাক্ষিক সীমান্ত নির্দেশিকা ভেঙে এসব ঘটনা ঘটেছে thedailystar.net

দ্বিপাক্ষিক সূত্রের অভিযোগ, বাংলাদেশ বারবার প্রতিবাদ জানালেও সীমান্ত হত্যা বন্ধ হচ্ছে না। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, বাংলাদেশী বাহিনী–নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কড়া পদক্ষেপ নেওয়ার অপরিহার্যতা স্বীকার করলে পরের পদক্ষেপগুলো আলোচ্য হতে পারে।  ২০১১ সালের ফেলানি হত্যার মতো ঘটনাগুলি আন্তর্জাতিকভাবে অভিযোগের বিষয় হয়, তবে বিএসএফের এমন কর্মকাণ্ড দীর্ঘ সময় ধরে সাধারণ চুক্তিবদ্ধ নীতির সীমা পেরিয়ে যাওয়ার অভিযোগ তোলা হয়েছে thediplomat.comthediplomat.com

তিস্তা ও অভিন্ন নদী চুক্তির রাজনৈতিক বাস্তবতা

তিস্তা নদী এমন একটি ইস্যু যা বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে সমাধান দাবি করছে। গঙ্গা নদী নিয়ে ১৯৯৬ সালের চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও তিস্তার পানির ভাগাভাগির আলাদা কোনো চুক্তি হয়নি thinkglobalhealth.org২০১১ সালে ভারত-বাংলাদেশের জলবিষয়ক আলোচনায় বাংলাদেশকে তিস্তা নদীর ৩৭.৫% পানির প্রস্তাব থাকলেও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীর প্রতিবাদের কারণে তা আটকে যায় en.wikipedia.orgফলে রাষ্ট্রীয় রাজনীতি নীতি স্থায়িত্ব ব্যাহত করছে।

অত্যন্ত সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে আবার তিস্তা আলোচনায় অগ্রগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ২০২৪ সালে সরকার পরিবর্তনের পর প্রধানমন্ত্রী প্রস্তাব করেন তিস্তা আলোচনার কাজ পুনরায় শুরু করতে en.wikipedia.orgজাতিসংঘ ও বিশ্বব্যাংক যেমন নদীমাতৃক সমস্যাগুলো সমাধানে সহায়তার কথা বলছে, বাংলাদেশও জোর দিচ্ছে সমুদ্রজনিত সম্পদ রক্ষায় en.wikipedia.orgতবেদীর্ঘমেয়াদে পানিসম্পদ ন্যায্য বণ্টনের জন্যস্থিতিশীল রাজনৈতিক সমঝোতা প্রয়োজন। যদি উভয় দেশ তাদের ঐতিহ্যগত চুক্তি ও আন্তর্জাতিক আইনি ভিত্তিক নীতিকে সম্মান করে, তিস্তা ও অন্যান্য নদীর চুক্তিকে বাস্তবায়ন করা সহজ হবে।

আঞ্চলিক যোগাযোগ ও ট্রানজিট: বাংলাদেশের লাভ ও ক্ষতির তুলনামূলক বিশ্লেষণ

আঞ্চলিক সংযোগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এ যুগের তুলনায় অনেক এগিয়ে গেছে। ২০২৩ সালের মার্চে বাংলাদেশ ও ভুটান মাল্টি-মোডাল পরিবহণ চুক্তি স্বাক্ষর করে, যাতে সড়ক, রেল, জলপথ ও বায়ুপথের মাধ্যমে মালামাল চলাচলের ব্যাপারে সহযোগিতা করা হবে thedailystar.netভুটান-গণপ্রাধিকার বাণিজ্যচুক্তির আওতায় বাংলাদেশি ১০০টি পণ্য ভুটানে শুল্কমুক্ত রপ্তানি পাচ্ছে thedailystar.netএছাড়া, বাংলাদেশ-ভারত, বাংলাদেশ-নেপাল-ভারত যৌথ উদ্যোগে সমুদ্রপথ ও স্থলপথ সংযোগ বাড়ানোর পরিকল্পনা চলছে, যা উত্তর-পূর্ব ভারতের অর্থনীতিকে বড় সুবিধা দিচ্ছে।

তবে এই সুবিধাগুলো একেবারে কাজে পরিণত হচ্ছে না। সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক উত্তেজনার ফলে ভারতকেন্দ্রিক কিছু উদ্যোগ স্থগিত বা বাতিল হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে ভারত পূর্বে বাংলাদেশকে দেয়া ট্রানজিট ও রিপণ চুক্তি থেকে সরে আসে csep.orgদ্রুত অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ভারতের এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের রপ্তানিতে প্রায়৭৭০ মিলিয়ন ডলারক্ষতি করতে পারে, যা দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের প্রায় ৪২% csep.orgকারণ, সুত্রগুলো জানাচ্ছে বন্ধের ফলে বিশেষ করে পোশাক খাতের রফতানিতে বড় বাঁধা এসেছে। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই ধরনের পদক্ষেপ দক্ষিণ এশিয়ার যোগাযোগ-ব্যবস্থাকে অবিচলিত রাখতে চীন-মোদির প্রতিদ্বন্দ্বিতা চরম করছিল।

বাংলাদেশ অবশ্য চীন, পশ্চিমা দেশ ও অন্যান্য প্রতিবেশীদের সাথে সম্পর্ক বিকশিত করছে। নতুন পূর্বধারার সিদ্ধান্তে চীন ২০৫০ অবধি বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার হওয়ার পথে অগ্রসর। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নও অবকাঠামো উন্নয়ন ও প্রযুক্তি বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছে। ফলস্বরূপ, বাংলাদেশ একটা বহুপাক্ষীয় পরিবেশে ভুগছে; লাভসংশ্লিষ্ট হলেও অস্ফুট। বিগত দুই বছর ধরে সৃষ্ট রাজনৈতিক উত্তেজনা দেখিয়ে দিয়েছে ব্যবসায়িক সংযোগ কতটা প্রবল রাজনৈতিক উপাদানের হাতে।

ভারতের মিডিয়া ও সামাজিক মাধ্যমে বাংলাদেশকে ঘিরে বয়ান

ভারতীয় গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় বাংলাদেশকে নিয়ে প্রকাশিত খবরগুলিতে প্রায়শই অতিরঞ্জিত ও পক্ষপাতদুষ্ট প্রতিচ্ছবি ফুটে ওঠে। প্রতিবেদন ও বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে ইসলামবিদ্বেষী ও উত্তেজনাপূর্ণ শিরোনাম প্রায় দেখা যায়। আল–জাজিরার অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০২৪ সালের গণআন্দোলনের পর ভারতের কয়েকটি টিভি ও খবরমাধ্যম বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়কে ব্যাপক হারে “নির্যাতিত” বলে দাবি করেছিল aljazeera.comaljazeera.comবাস্তবে, আল–জাজিরার তথ্য অনুযায়ী Hasinaঅপসারণের পর মাত্র দুজন হিন্দু নাগরিক নিহত হয়েছেন aljazeera.comতবু মিথ্যা ভিডিও ও প্রতিবেদন ছড়ানো হয়, যেমন ১০ মিলিয়ন হিন্দু বাংলাদেশ ছাড়ছে বলে ভিত্তিহীন খবর দেওয়া aljazeera.comরাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এটিকে ‘ইসলামফোবিক’ চোখে দেখার অভিযোগ করেন, যেহেতু সঠিক সংবাদ না ছড়িয়ে ভীষণ কট্টর দাবি তুলে ধরা হয় aljazeera.com

ভারতীয় মিডিয়ায় বাংলাদেশে ঘটছে এমন কিছু ঘটনাকে পাকিস্তান বা চীনের ষড়যন্ত্রের সাথে যুক্ত করার গুজবও ছড়ানো হয়েছে aljazeera.comফলস্বরূপ, সাধারণ ভারতীয় নাগরিকদের মধ্যে বাংলাদেশের ব্যাপারে একটি বিভ্রান্তিমূলক ধারণা গড়ে উঠেছে। যেখানে প্রকৃত ব্যস্ততা বা গণতন্ত্রের অর্জন ব্যাখ্যা করার বদলে আন্তর্জাতিক জালিয়াতির কথাই বেশি শোনা যায়। এ অবস্থায় ঢাকা-নয়াদিল্লির মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়ার বিচ্ছিন্নতাই আরও গভীর হচ্ছে।

বাংলাদেশের জনমত ও নতুন প্রজন্মের প্রতিক্রিয়া

অনেকে বাংলাদেশের জনগণ ভারতকে মুক্তিদাতা দেশ হিসেবে সম্মান করলেও প্রতি–যুগের জনমত ভিন্ন। সাম্প্রতিক Pewরিসার্চ অনুসারে বাংলাদেশের ৫৭% মানুষ ভারতের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করে pewresearch.orgতবে রাজনৈতিক অবস্থানের ওপর নির্ভর করে এই দৃষ্টিভঙ্গি বদলায়: ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সমর্থকদের মধ্যে ভারতের প্রতি ভালবাসা বেশি (৭১% ইতিবাচক) এবং বিরোধীদের মধ্যে কম (৪৯%) pewresearch.orgশিক্ষা ও বয়স অনুসারে চিত্র আরও স্পষ্ট: শিক্ষিত তরুণরা সাধারণত ভারতে আরো ইতিবাচক, যেখানে অপরিচিত ও বিতর্কিত বিষয়গুলো নিয়ে তথ্যের ঘাটতিতে অনেকে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখায় pewresearch.orgসামাজিক মাধ্যমে নতুন প্রজন্ম দ্রুত যোগাযোগ রাখার কারণে ভুয়া খবরে প্রতিক্রিয়া বিস্তৃত হলেও উদ্বেগও বেড়েছে।

এক কথায়, বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে অন্য একটি প্রবণতাও লক্ষ্য করা যায়: দেশে যখন উন্নয়ন-অগ্রগতি হচ্ছে (বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি, পোশাক খাত ইত্যাদিতে), তখন অনেকেই ভারতের সঙ্গত বন্ধুত্বশীল নীতি সহ প্যাকেজ সমালোচনার পক্ষে থাকে না। তবে সীমান্ত সুরক্ষা, সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও গণতান্ত্রিক অধিকার ইস্যুতে জনগণের মধ্যে সন্দেহ বিদ্যমান। ফলস্বরূপ, শালীন কিন্তু দৃঢ় স্বনির্ভর প্রতিবেশী সম্পর্ক’গড়ার আহ্বান ঢাকায় ক্রমেই জোরদার হচ্ছে। সাধারণ মানুষ মনে করে, ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্ব থাকতে পারে; তবে সমান অধিকার ও সম্মানের ভিত্তিতে হতে হবে।

বিকল্প কূটনৈতিক কৌশল: বহুমাত্রিক পররাষ্ট্রনীতি, চীন ও অন্য শক্তির সাথে ভারসাম্য

বহুমাত্রিক পররাষ্ট্রনীতির অধীনে বাংলাদেশ নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে শেখ হাসিনার সরকার চীনের সাথে সম্পর্ক জোরালো করেছে; পরবর্তী সরকারে আসার পর প্রধানমন্ত্রী মোঃ ইউনূসের প্রথম বিদেশ সফরচীনেহয় defencepk.comতিনি ঢাকাকে “উপ-মহাদেশের একমাত্র সমুদ্রের রক্ষক” হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন csep.org,যা বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব ও সমুদ্র সংযোগের বার্তা বহন করে। একই সাথে ঢাকা রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ অন্যান্য বিশ্বশক্তির সঙ্গেও সম্পর্ক বজায় রেখেছে। উদাহরণস্বরূপ রাশিয়ার সঙ্গেও জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা উন্নত হচ্ছে, আমেরিকার সঙ্গে সামরিক মহড়া এবং প্রযুক্তি বিনিময় অব্যাহত আছে, আর জাপানের অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পগুলো চলমান। ঢাকার লক্ষ্যনিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রেখেবহুপাক্ষিক উদ্যোগ ও বিনিয়োগ নিশ্চিত করা।

পাশাপাশি বাংলাদেশ বিভিন্ন আঞ্চলিক সংগঠনেও সক্রিয়: দক্ষিণ এশিয়ার সীমান্ত ছাড়িয়া অর্থনৈতিক সহযোগিতা (BIMSTEC, SCO,নন-অ্যালাইন্ড মুভমেন্ট) এগিয়ে নিয়েছে। চীনের ইনফ্রাস্ট্রাকচার প্রকল্পগুলো গ্রহণ করে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে শক্তি বাড়ানোর পাশাপাশি আমদানি-পুনঃরপ্তানিতে বৈচিত্র্য এনেছে। আন্তর্জাতিক মঞ্চে ঢাকায় বলছেন, সব প্রতিবেশীর সাথে সমান ধরণের আচরণ ও স্বার্থ রক্ষা করতে চাই, কোনো একদিকে বাঁক নেয়া হবে না।

সর্বোপরি, বাংলাদেশ সরকার নিজেকেস্বাধীন ও স্বনির্ভর শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতেচায়। চীন-মোদির প্রতিযোগিতায় ঢাকা চেয়েছেনিজেদের স্বার্থ হাসিল”, তবে অন্য সব অংশীদারের সহযোগিতা বিস্তার করছে csep.orgdefencepk.comএর ফলে ভারতকে বাদ না দিয়ে কিন্তু ভারতের বাইরে বিকল্প পথ গড়ে তোলার কৌশল দেখা যাচ্ছে।

ভবিষ্যতের করণীয়: আত্মমর্যাদাশীল প্রতিবেশী সম্পর্কের রূপরেখা

পরস্পরের স্বার্থ ও কর্তৃত্বকে সম্মান করে পরবর্তী দশক গড়তে হবে। দুই দেশের নেতারা স্বাধীনতা পরবর্তী যুগে যে মৌলিক বিধি-নীতির আশ্বাস দিয়েছিলেন—“উভয়ের সার্বভৌমত্ব রক্ষা, অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অযাচিত হস্তক্ষেপ এড়ানো, সমান অংশীদারিত্বে পারস্পরিক কল্যাণ”ciaotest.cc.columbia.eduভবিষ্যতেও এই নীতিবলি মেনে চলার প্রচেষ্টা করতে হবে। এর ভিত্তিতে করণীয় হচ্ছে:

  • নির্বিঘ্ন সীমান্ত শান্তি:বিএসএফ–বিজিবি মধ্যে নিয়মিত দ্বিপাক্ষিক বৈঠক ও টেকনিক্যাল কমিটি গঠন করে সীমান্ত হত্যা ও সমাধান অমীমাংসিত বিষয় নিয়ে আলোচনা চালাতে হবে। উভয় বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে সীমান্ত পাহারা কর্মীদের প্রশিক্ষণ ও নির্দেশনা কাঠামো উন্নত করতে হবে।
  • জলবণ্টন ও পরিবেশ সমঝোতা:নদীর পানিসম্পদে একত্রে কাজ নিশ্চিত করার জন্য জয়েন্ট রিভার কমিশন কার্যকরী করতে হবে। তিস্তা ও গঙ্গাসহ অভিন্ন নদীর চুক্তি নবায়ন কিংবা নতুন চুক্তির মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদী সমাধান পাওয়া জরুরি। আন্তর্জাতিক ও বৈজ্ঞানিক পরিপ্রেক্ষিত মনে রেখে পানির ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত করা যাবে।
  • গণতন্ত্র ও মানবাধিকার:দুপক্ষকে নিজেদের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় পারস্পরিক বাধ্যবাধকতা সম্মান করতে হবে। অন্য দেশের জনগণের ভোট ও মানবাধিকার বিষয়ে অকপটে কথা বলা উচিত হলেও, কোনো প্রকার চাপ প্রয়োগ করে নির্বাচনী ফল বা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা উচিৎ নয়।
  • অর্থনীতি ও যোগাযোগ:দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সহজ করার উদ্যোগ নিতে হবে। সীমান্ত বানিজ্যক্ষেত্র এবং আঞ্চলিক যোগাযোগের সুবিধা (যেমন ট্রানজিট চুক্তি, সড়ক-রেল যোগাযোগ) পূর্ণভাবে ব্যবহার করতে হবে। তথ্যপ্রযুক্তি ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের মাধ্যমে জনগণের মধ্যে বন্ধুত্ব বাড়ানো যেতে পারে।
  • বহুমুখী অংশীদারিত্ব:ভারতের পাশাপাশি চীন, আমেরিকা ও অন্যান্য মহাশক্তির সাথে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। বহুপাক্ষিক সংস্থা এবং গোষ্ঠীগুলোর (যেমন জাতিসংঘ, SAARC, BIMSTEC) সংলাপে সক্রিয় থেকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের স্বার্থ বজায় রাখতে হবে ciaotest.cc.columbia.edu

এসব প্রয়াস গ্রহণ করলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক একাত্ম স্বার্থ থেকে গড়ে ওঠা বন্ধুত্বের চেহারা ধারণ করবে। পারস্পরিক সম্মান ও স্বাধিকারের ভিত্তিতে গড়া সম্পর্কদ্বয়ে দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারবে। উল্লেখিত নীতি-নির্দেশনা ও চুক্তিসমূহ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করলে ভবিষ্যৎেও উভয়ের জন্যই মঙ্গলের পথ তৈরি হবে ciaotest.cc.columbia.edu

উৎস:আজকের পরিস্থিতি ও ইতিহাসভিত্তিক তথ্যঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ও খ্যাতিমান সংবেদনশীল সূত্রঅনুযায়ী বিশ্লেষিত হয়েছে। উপরোক্ত তথ্য-উদ্ধৃতিগুলোকে মূল সংবাদ ও গবেষণাপত্র থেকে নেওয়া হয়েছে thedailystar.netciaotest.cc.columbia.eduthediplomat.comen.wikipedia.orgthedailystar.netaljazeera.compewresearch.orgdefencepk.com

সব সংবাদ