আমাকে চায়ের দোকানে কেউ দেখে না

সংক্ষিপ্ত পরিচিতি (Excerpt):
পশ্চিমবঙ্গের এক ভ্রাতৃত্ববোধের রাজ্যে মুসলিম শাসকের অধীনে যুগে যুগে অদ্ভুত পরিকাঠামো গড়ে তোলা হলেও স্বাধীনতার পর ১৯৪৮ সালে হায়দরাবাদের পরাজয় চমকপ্রদ অধ্যায়। এই প্রবন্ধে আমরা ঘেরা আলো জ্বলকাল হায়দরাবাদের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা, স্ট্যান্ডস্টিল চুক্তি, অপারেশন পোলো এবং তার পরের বাস্তবতার কথা তুলে ধরব – ইতিহাসের এই বিস্মৃত অধ্যায় কি আমাদের পরাধীনতা, সংবিধান এবং দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিম পরিচয়ের প্রেক্ষাপটে কী শিখিয়েছে?
ইতিহাসের প্রেক্ষাপট
১৭২৪ সালে মুঘল সাম্রাজ্যের অবসানমুখী সময় হায়দরাবাদ রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন আসাফ জাহ প্রথম (মীর ক্বামার উদ্দিন খান)। পরবর্তী দুই শতকে হায়দরাবাদ নবাবরা নিজস্ব দন্ড, বাহিনী ও প্রশাসন গড়ে তোলেন, যদিও ব্রিটিশ নীতিভুক্ত সোজারেনটির অধীনে থেকে আসেন। ১৯১১ থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত নবমনিনিয়াজাম মীর ওসমান আলী খাঁরাজত্ব করেন। ব্রিটিশরা তাঁকে ‘ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিশ্বস্ত মিত্র’ খেতাবে ভূষিত করেছিলেন en.wikipedia.org। স্বাধীনতার পূর্বের দশকে হায়দরাবাদে নানা উন্নয়নমূলক প্রকল্প বাস্তবায়িত হয় – উদাহরণস্বরূপ, হায়দরাবাদ স্টেট ব্যাংকপ্রতিষ্ঠা এবং নিজস্ব মুদ্রা ‘হায়দরাবাদি রুপি’ চালু ছিল en.wikipedia.org। ডেকান এয়ারওয়েজের জন্য ১৯৩০-এর দশকে বেগমপেট বিমানবন্দর তৈরি হয়, যা ব্রিটিশ ভারতে প্রথম বেসামরিক বিমান সংস্থা হোস্ট করতো en.wikipedia.org। বড় বন্যা এড়াতে নিযাম দুইটি বিশাল জলাধার (ওসমান সাগর ও হিমায়েত সাগর) তৈরি করেন, এবং ওসমানিয়া জেনারেল হাসপাতাল, জুবলি হল, রাজ্য গ্রন্থাগার ও পাবলিক গার্ডেনের মতো অবকাঠামো নির্মাণ করেন en.wikipedia.org। এই সব দ্বারা বোঝা যায়, স্বাধীন ভারতীয় উপমহাদেশের মধ্যেহায়দরাবাদই একমাত্র স্বতন্ত্র রাজ্য ছিল যার নিজস্ব মুদ্রা ছিল এবং যার নিজস্ব রাষ্ট্রীয় ব্যাংক ছিল en.wikipedia.org।
খোদ হায়দরাবাদি প্রশাসনও ছিল মুসলিম-নেতৃত্বাধীন: দেশীয় গবেষণায় দেখা গেছে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও বিচারকবর্গে মুসলিমদের অংশ প্রায় ৯০% এবং সামগ্রিক প্রশাসনে মুসলিমের অংশ প্রায় ৭৫% ছিল samvitkendra.org। তাছাড়া হায়দরাবাদী সংস্কৃতিতে ইসলামী ঐতিহ্য অগ্রাধিকার পেয়েছিল: উদাহরণস্বরূপ, তৎকালীন ওসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে হিন্দু ঐতিহ্যবাহী ধুতি–কুর্তা নিষিদ্ধ ছিল এবং ভারতীয় জাতীয় সঙ্গীত ‘বন্দে মাতরম’ বাজানো পর্যন্ত সম্পূর্ণরূপে প্রতিরোধ করা হতো samvitkendra.org। এসব রাজনৈতিক সংস্কার ও আধুনিকায়নকে সমালোচকদের চোখে অনেক সময় সাংস্কৃতিক শোষণ হিসেবেও দেখা হয়েছে।
১৯৪৭–৪৮: বিভাজনের প্রেক্ষাপট এবং সংকট:ব্রিটিশ ভারত ভাগের পর ১৫ আগস্ট ১৯৪৭ থেকে ব্রিটিশ পরম্পরা অতিক্রান্ত হয়। কেন্দ্রে ভারত এবং পাকিস্তান গড়ে উঠলেও হায়দরাবাদের মতো প্রায় ৫০০টি ক্ষুদ্র-বড় রজবাড়িগুলোতে তখন সিদ্ধান্তের দ্বিধা বিরাজ করছিল। ১১ জুন ১৯৪৭ হায়দরাবাদি নিজাম ঘোষণা করেন যে তিনি ভারত বা পাকিস্তানের কোনও গঠনমূলক পরিষদে যোগ দেবেন না en.wikipedia.org। বাস্তবে প্রজাতন্ত্রপ্রাপ্ত ভারতের দাবি ছিল, হায়দরাবাদের বেশির ভাগ অধিবাসী ভারতের সাথে যুক্ত হতে চায় en.wikipedia.org – কারণ নবাব মুসলিম হলেও রাজ্যের জনগণের প্রায় ৮৬% ছিল হিন্দু en.wikipedia.org। স্বৈরশাসক নিজাম নিজের পক্ষে সমর্থন বাড়াতে পাকিস্তানের নেতাদের কাছ থেকে সওয়ালেন; তাদের সমর্থনেই দেশজুড়েরাজাকারনামের একটি ইসলামপন্থী গেরিলা বাহিনী গড়ে ওঠে।
স্ট্যান্ডস্টিল চুক্তি এবং চুক্তিভঙ্গ
ভারত ও হায়দরাবাদের মধ্যে সম্পর্ক সাময়িক স্থিতিশীল রাখতেস্ট্যান্ডস্টিল চুক্তি (২৯ নভেম্বর ১৯৪৭) স্বাক্ষরিত হয়েছিল timesofindia.indiatimes.com। এই চুক্তিতে পূর্বের সব সহযোগিতা চুক্তি বজায় রাখা হবার কথা ছিল (যাদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ছিল ভারতীয় রাজ্য বাহিনী সংক্রান্ত চুক্তি)। কিন্তু স্বাতন্ত্র্যবাদী হায়দরাবাদ সরকার পরবর্তী মাসগুলোতে ভারত-বান্ধবতা দুর্বল করতে বেশকিছু পদক্ষেপ নেয়। উদাহরণস্বরূপ, নিযাম ও তাঁর মন্ত্রীরা মূল্যবান ধাতু এবং গুরুত্বপূর্ণ কৃষিপণ্য ভারত রপ্তানি সীমিত করার বিধি জারি করেন এবং ভারতীয় মুদ্রাকে অকার্যকর হিসেবে ঘোষণা করেন – এগুলো দিল্লির চোখে ‘স্ট্যান্ডস্টিল লঙ্ঘন’ হিসেবে বিবেচিত হয় timesofindia.indiatimes.com। তদুপরি, হায়দরাবাদের পক্ষ থেকে পাকিস্তানকে বিশাল ঋণ মঞ্জুর, কর্মচারী নিয়োগে কারাকী-অফিসার পাঠানো, ভারতীয় রাজ্য বাহিনী পরিকল্পনা থেকে তাত্ক্ষণিক প্রত্যাহার, ইত্যাদির মতো পদক্ষেপও নেওয়া হয়, যা কেন্দ্র সরকারকে বিভ্রান্ত করে এবং সংঘাত তীব্র করে timesofindia.indiatimes.comtimesofindia.indiatimes.com। এ প্রসঙ্গে, ইতিহাসবিদ আমরবীর সিংহের মতে, এসব সিদ্ধান্ত যথাক্রমে ‘শেষ খড়কি’ হয়ে দাঁড়িয়েছিল যারা অপারেশন পোলো’র কারণ হয়েছিল timesofindia.indiatimes.comtimesofindia.indiatimes.com।
রাজাকার বাহিনী ও প্রচারণা যুদ্ধ
রাজাকারের উগ্রবাদী আধিপত্য ও তাদের রাজনীতির বিরুদ্ধে ভারত এবং মধ্যবিত্ত হিন্দুবাহিনী ব্যাপক মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ ছড়িয়ে দেয়। উইলফ্রেড স্মিথের পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, নিযাম, ভারত সরকার ও কমিউনিস্টদের প্রতিদ্বন্দ্বিতাতিনপক্ষেই একরূপ প্রচারণা যুদ্ধ চালানো হচ্ছিল, প্রত্যেকে অন্যদলকে বিদ্বেষ ছড়াতে এবং নিজেদের কারণকে শক্তিশালী করতে চেষ্টা করতেছিল openthemagazine.com। উদাহরণস্বরূপ ভারতীয় কংগ্রেস নেতৃত্ব পশ্চিমা মহাশক্তিদের কাছে ‘কমিউনিস্ট বিপ্লবের হুমকি’ হিসেবে হায়দরাবাদের ঘটনা তুলে ধরতে মনস্থ করেছিল; এ প্রচেষ্টার পিছনে ছিল পশ্চিমাদের সমর্থন অর্জন ও কমিউনিস্টদের মোকাবেলা করার গণনা openthemagazine.com। অন্যদিকে নিযামপন্থীরা রাজাকার বাহিনীর গেরিলা তৎপরতা হাইপ করে দেখাতে চেয়েছিল যে রাজ্যের হিন্দু ও মুসলিমের মধ্যে সংঘর্ষ বাধতে বসেছে। আর কমিউনিস্ট দল অভ্যন্তরীণ নীতিবহির্ভূত গণআন্দোলনকে কেন্দ্র করে রাজাকারের হামলাকে তীব্র প্রতিবাদের আঙ্গিকে তোলে। এভাবেপ্রচারযুদ্ধহায়দরাবাদের সঙ্কটকে বহুপাক্ষিক রাজনৈতিক খেলা হিসেবে রূপ দেয়।
অপারেশন পোলো: সামরিক আক্রমণ
ভারত সরকার কোনো পথচিহ্নে দেরি করলেন না। ১৩ সেপ্টেম্বর ১৯৪৮ ভোর ৪টায় শুরু হয় ‘অপারেশন পোলো’ নামের সামরিক অভিযান, যার মাধ্যমে ভারতের সশস্ত্র বাহিনী হায়দরাবাদ রাজ্যে প্রবেশ করে en.wikipedia.org। চারদিনের মধ্যে যুদ্ধ শেষ হয়; ১৭ সেপ্টেম্বর বিকেল ৫টায় নবাবের সেনাবাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করে en.wikipedia.org। ভারতীয় সেনাবাহিনী দ্রুত হায়দরাবাদের প্রধান শহরগুলো নিয়ন্ত্রণে আনে এবং রাজ্যজুড়ে তাদের পদধ্বনি কায়েম হয়।
আত্মসমর্পণ ও পতনের পরবর্তী পর্ব
সামরিক জয়লাভের পর হায়দরাবাদের স্বায়ত্তশাসন বিলুপ্ত হয়ে যায়। নবাবের মন্ত্রিসভা পদত্যাগ করে দেয়, এবং ভারতীয় নিয়মে রাজ্যে সামরিক গভর্নর নিযুক্ত করা হয় en.wikipedia.org। অপারেশন পোলো পরিচালনাকারী মেজর জেনারেল জে.এন. চৌধুরী হায়দরাবাদ সামরিক শাসনের প্রধান হন। ২৪ নভেম্বর ১৯৪৯, নবাব এক ফরমানে জানিয়ে দেন হায়দরাবাদে ভারতের সংবিধান প্রযোজ্য হবে en.wikipedia.org। এরপর ২৫ জানুয়ারি ১৯৫০ নবাব ভারতীয় সংবিধানে যোগদানের চুক্তি স্বাক্ষর করেন এবং পরের দিন ভারত প্রজাতন্ত্র হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। নবাবকে আপাতত নতুন খেতাবে ভূষিত করে ‘রাজপ্রামুখ’ করা হয় en.wikipedia.org। এর ফলে আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয় নবাবদের আধিপত্য, হায়দরাবাদ ভারতীয় ইউনিয়নের অংশ হিসেবে মিশে যায় এবং একক স্বাধীন রাষ্ট্রের মর্যাদা হারায়।
দুর্গোপরাই:এই সামরিক অভিযানের নিরিখে স্বশাসন পতনের পর রাজ্যের মানুষদের জীবনযাত্রায় ব্যাপক প্রভাব পড়ে। সুন্দরলাল কমিশন, যিনি অভিযানের পর নিরপেক্ষতা যাচাই করেছিলেন, রিপোর্ট করেন অন্তত ২৭০০০–৪০০০০ জন নিহত হয়েছিল theindiaforum.in;বেশিরভাগ নিহত হয়নি খেতখামার শক্তি বা পুলিশের হাতে, বরং সামরিক অভিযান-পরবর্তী সাম্প্রদায়িক তান্ডবের কারণে। কমিশন অনুযায়ী, ‘পুলিস অ্যাকশনের পর’ মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ বহু গ্রামেফলিকিক হিংসাছড়িয়ে পড়ে – ধর্ষণ, অপহরণ, মসজিদ ভাঙচুর, জোরপূর্বক ধর্মান্তর, জায়গা-সম্পত্তি দখল ইত্যাদি theindiaforum.in। এসব প্রতিবেদন দেখায় যে যেসময় সরকার বারবার ‘শান্তিপূর্ণ একত্রীকরণ’ বলেছিল, বাস্তবে সেদিনগুলোতে সাধারণ মুসলিম জনগণের নিরাপত্তা কঠোর প্রশ্নের সম্মুখীন ছিল।
ইতিহাসের পরিসরে হায়দরাবাদ, কাশ্মীর ও জুনাগড়ের মিল
১৭৪৭ সালের পর উপমহাদেশে হায়দরাবাদের ঘটনাচক্রের সঙ্গেকাশ্মীর ও জুনাগড়-এর যোগসূত্র অস্বীকার করার নয়। তিনটি রাজ্যই ধর্মীয় দিক দিয়ে সংখ্যালঘু শাসক-সম্পন্ন, কিন্তু জনসংখ্যায় হিন্দু/মুসলমানের ব্যাপক পার্থক্য ছিল। কাশ্মীর-সংকটের মতোই পাকিস্তান ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘে বক্তব্য রাখে, হায়দরাবাদ এবং জুনাগড়ের অবস্থা করে তুলতে – দেখানোর চেষ্টা করে ভারতে মৌলবাদী গণভোটের দাবি দিয়ে দ্বৈতবচন কায়েম হয়েছে scroll.in। অর্থাৎ, পাকিস্তান হায়দরাবাদ ও জুনাগড়ের প্রসঙ্গ তুলে ভারতকে বলে যে রাজা নিজ সিদ্ধান্ত নিয়েছে (হায়দরাবাদএস্ট্যাটস কোতে ভারতের সাথে যোগদানের চুক্তি), যেখানে কাশ্মীরেতেও মানুষের ইচ্ছার কথা শুনতে হবে বলে দাবি করে। এ অভিযোগ আইনের বিচারে তর্কসাপেক্ষ হলেও এর ব্যতিক্রমী ব্যাখ্যা হলো – তার মানে ছিল সেই প্রেক্ষাপটেও গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্তকে উপেক্ষা করেছিল ভিন্ন মানদণ্ডে।
বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়া ও জাতিসংঘের নীরবতা
হায়দরাবাদের এই ঘটনা আন্তর্জাতিক মঞ্চেও আলোচনার বিষয় হয়। ২১ আগস্ট ১৯৪৮ হায়দরাবাদের পররাষ্ট্র দপ্তর জাতিসংঘ সিকিউরিটি কাউন্সিলে অবিলম্বে আপিল করে যে “গুরুতর বিরোধ” (grave dispute)সৃষ্টি হয়েছে cdn.un.org। ১৬ সেপ্টেম্বর ১৯৪৮ পারিসে সিকিউরিটি কাউন্সিলের বৈঠকে এ বিষয় আনতে চাওয়া হয় cdn.un.org। সেখানে হায়দরাবাদের প্রতিনিধিরা দাবি করেন, ১৫ আগস্ট ১৯৪৭ স্বাধীনতার দিন হায়দরাবাদ ‘পূর্ণ স্বাধীন রাষ্ট্র’ হয়ে গিয়েছিল এবং তারা জাতিসংঘ তত্ত্বাবধানে plebisciteচাইবে cdn.un.org। বিপরীতে ভারতের প্রতিনিধি বলেন হায়দরাবাদ প্রাক্তন ব্রিটিশ রাজ্যের অধীনেশ্বরীর অধীনে ছিল, তাই স্বাধীন রাষ্ট্র নয় cdn.un.org। নিরাপত্তা পরিষদ এ আলোচনার পর কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি; জাতিসংঘের মাধ্যেমে হায়দরাবাদের মর্যাদা পুনর্বিবেচনা হয়নি। অন্য দিকে বিশ্বের বৃহৎ শক্তিগুলিও বড় প্রভাব ব্যয় করেনি। হায়দরাবাদের বিরুদ্ধে ভারতীয় অভিযানের সময়ে ব্রিটিশ লেবার সরকার নি:সঙ্গ ছিল; নি:শাসনের যৌথ প্রার্থনা ওয়েনস্টন চার্চিল ও কনজারভেটিভদের সাড়া পাওয়ার সর্বসীমা হয়েছিল en.wikipedia.org। ওয়াশিংটনও ভারতে সংঘর্ষ উস্কে বিশ্বমঞ্চে বিব্রত করতে চাইলো না। মার্কিন দূতাবাসের রিপোর্টে উঠে এসেছে, হায়দরাবাদে গণভোট দাবি করলে “আমাদের স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর” হতে পারে, তাই ওই বিষয় নিয়ে যতটা সম্ভব নিঃশব্দ থাকা উচিত history.state.gov। ইউরোপ-আমেরিকার কূটনীতিতে হায়দরাবাদ ইস্যু হালকা হয়ে পড়ে; সংক্ষেপে, জাতিসংঘ এবং পশ্চিমা বিশ্ব ভারতকে বেশি চাপে রাখে নি।
আধুনিক দৃষ্টিকোণে স্মৃতি ও তাৎপর্য
আজকের দিনে এই ঘটনাকে ‘বিস্মৃত অধ্যায়’ বলা চলে। সমাজে আলোচনা কম, তবে সাম্প্রতিক বছরগুলিতে ইতিহাসবিদ এবং লেখকেরা হায়দরাবাদের ইতিহাসকে পুনর্বিবেচনা শুরু করেছেন। যেমন একটি সাম্প্রতিক গ্রন্থ বলছে, “এক সময় মুসলিম নিযামের রাজ্য ছিল হায়দরাবাদ; এর বাংলাদেশ সঙ্গেযোগদান বিতর্কপূর্ণ ছিল, কিন্তু ভারতের ইতিহাসে তা ছিল কাশ্মীরের ছায়ায়” theindiaforum.in। ২০১৩ সালে প্রকাশিত BBCরিপোর্ট ‘ভারতের গোপন গণহত্যা’ (India’s Hidden Massacre)এই অধ্যায়কে আলোচনায় ফেরে এবং ২০২২ সালে ভারত সরকার ঘোষণা করে ১৭ সেপ্টেম্বরকে ‘হায়দরাবাদ মুক্তি দিবস’ হিসেবে পালন করার সিদ্ধান্ত theindiaforum.intheindiaforum.in। অর্থাৎ, আনুষ্ঠানিক ভাবেও এটিকে স্বীকৃতি দেয়া হচ্ছে যে এই ঘটনাগুলোকে ইতিহাসের অংশ হিসেবেই স্মরণ করা আবশ্যক।
হায়দরাবাদের এইভুলে যাওয়া অধ্যায়আমাদের বার্তা দেয় যে উপনিবেশিক পরবর্তী যুগে সত্যিকার সার্বভৌমত্ব কেমন হয়, এই প্রশ্ন এখনো অমীমাংসিত। এখানে যে মর্যাদা ও পরাজয়ের বিবাদ উঠে আসে, তা শুধু ঐতিহাসিক কাগজপত্রে সীমাবদ্ধ নয়; আজকের মুসলিম স্বাতন্ত্র্যবাদের আলোচনায়ও এর সুর ছড়িয়ে পড়েছে। হায়দরাবাদের ঘটনার পাঠ হলো: স্বাধীনতা বা অধীনতা শুধু রাজনৈতিক দলিলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, জনতা, জাতিসত্তা ও ইতিহাসের স্মৃতিও তাতে হিসাব করে। ১৯৪৮-এর এই ঘটনায় ভারতীয় গণতন্ত্র ও সংবিধানের লক্ষ্য-সীমা পর্যালোচিত হয়েছে – বিশেষ করে সংখ্যালঘুদের সংহতি ও ক্ষমতার ভাগাভাগি নিয়ে। শেষ কথা, এই আবিষ্কৃত ইতিহাস আমাদের স্মরণ করায় ইতিহাস লেখার ক্ষমতা যেমন রাষ্ট্রের হাতে, সেই সঙ্গে জনসাধারণের স্মৃতি কত গূঢ় হতে পারে।
উৎসসমূহ:অতি প্রাসঙ্গিক ইতিহাস ও গবেষণামূলক লেখাগুলি থেকে তথ্য নেওয়া হয়েছে, যেমন ভারতীয় জাতীয় ঐতিহাসিক নথি ও স্বাধীন গবেষকদের কর্মসূচী en.wikipedia.orgtimesofindia.indiatimes.comcdn.un.orgtheindiaforum.in। (উল্লেখযোগ্য সূত্র:Hyderabad State (উইকিপিডিয়া), টাইমস অব ইন্ডিয়া, ইউনাইটেড নেশনস ইয়ারবুক, Openthemagazine.com, এবং ঐতিহাসিক দলিলাদি)