আমাকে চায়ের দোকানে কেউ দেখে না

ইসলামের সাথে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির কোন আদাওয়াতি নেই। বরং ইসলাম ও বিজ্ঞান-প্রযুক্তি একই সূত্রে গাঁথা। আল্লাহ বলেন, ‘তিনিই সেই সত্ত্বা যিনি তোমাদের সৃষ্টি করেছেন মাটি থেকে। অতঃপর শুক্রবিন্দু হতে, অতঃপর জমাট রক্ত হতে, অতঃপর তোমাদেরকে বের করে দেন শিশুরূপে। অতঃপর তোমরা পৌঁছে যাও যৌবনে। অতঃপর বার্ধক্যে। তোমাদের কারু কারু এর পূর্বেই মৃত্যু ঘটে এবং কেউ কেউ নির্ধারিত আয়ুষ্কাল পর্যন্ত পৌঁছে যাও। যাতে তোমরা অনুধাবন কর।’ (গাফির/মুমিন ৪০/৬৭)।
উক্ত আয়াতে কারিমাতে বেহিসাব বৈজ্ঞানিক তথ্য এবং চিন্তার খোরাক আছে। আয়াতের ব্যাখ্যার দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে, কিভাবে মানুষ মাত্র একফোঁটা তরল পানি থেকে পূর্ণাঙ্গ শিশু হয়ে বের হয়ে একসময় বড় হয়ে শক্ত-সমর্থ মানুষে পরিণত হয়। তারপর এক সময় মারাও যায়।
আয়াতের মমার্থ উপলব্ধি করে, যুগে যুগে মুসলিম বিজ্ঞানীগণ জ্ঞানের চর্চা করে গেছেন এবং সেই মধ্যযুগে জ্ঞানের আলো সারাবিশ্বে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। তৎকালীন সময়ে ইউরোপ ছিল অজানা অচেনা মুসাফিরের মতো। আর মুসলিম স্পেন ছিল প্রযুক্তির ব্যবহারে সবার উপরে। মুসলিম বিজ্ঞানীগণ ছিলেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উদ্ভাবক।
রসায়ন, চিকিৎসা, ফলিত পদার্থ বিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞান প্রভৃতির উদ্ভাবক ছিলেন মুসলিম বিজ্ঞানীগণই। রসায়ন বিজ্ঞানের জনক জাবির বিন হাইয়ান, চিকিৎসা বিজ্ঞানে আল-রাযী ও ইবনে সীনা, ফলিত পদার্থ বিজ্ঞানে আল-ফারগানী, সমাজবিজ্ঞানে ইবনে খালদূন প্রমুখের নাম জগদ্বিখ্যাত হয়ে আছে। জ্ঞান-বিজ্ঞানের উন্নয়নের ক্ষেত্রে আকল বা বিচার-বুদ্ধি ও ফিকর বা চিন্তা-চেতনার গুরুত্ব অত্যধিক।
এ বিষয়টির ব্যাপারে আল-কুরআনের নির্দেশনা এসেছে যে, أَوَلَمْ يَتَفَكَّرُوْا فِيْ أَنْفُسِهِمْ مَا خَلَقَ اللهُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا إِلَّا بِالْحَقِّ وَأَجَلٍ مُسَمًّى وَإِنَّ كَثِيْرًا مِنَ النَّاسِ بِلِقَاءِ رَبِّهِمْ لَكَافِرُوْنَ- ‘তারা কি তাদের অন্তরে ভেবে দেখে না যে, আল্লাহ নভোমন্ডল, ভূমন্ডল ও এতদুভয়ের মধ্যবর্তী সবকিছু সৃষ্টি করেছেন সত্য সহকারে এবং নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য? কিন্তু অনেক মানুষ তাদের পালনকর্তার সাথে সাক্ষাতে অবিশ্বাসী’ (রূম ৩০/৮)।
আল্লাহ তায়ালার সৃষ্টির এই নিদর্শন সম্পর্কে চিন্তা করলে মানুষ বুঝতে পারবে যে, গোটা বিশ্ব সৃষ্টি এমনিতেই হয়নি। এর পিছনে এক বিরাট উদ্দেশ্য আছে এবং সবকিছুই একটি চরম পরিণতির দিকে যাচ্ছে। একসময় তাকে আল্লাহর সামনে হাযির হয়ে জবাব দিতেই হবে। যা মানুষকে আল্লাহমুখী করে। এজন্যই আল্লাহ কুরআনে ৪৯ বার ‘আকল’ ও ১৮ বার ‘ফিকর’ উল্লেখ করেছেন। এছাড়াও আল্লাহ তাঁর নিদর্শনসমূহ দেখতে সারাবিশ্ব পরিভ্রমণের নির্দেশ দিয়ে বলেন,قُلْ سِيْرُوْا فِي الْأَرْضِ فَانْظُرُوْا كَيْفَ بَدَأَ الْخَلْقَ ثُمَّ اللهُ يُنْشِئُ النَّشْأَةَ الْآخِرَةَ- ‘বল, তোমরা পৃথিবীতে ভ্রমণ কর। অতঃপর দেখ কিভাবে তিনি সৃষ্টিকর্ম শুরু করেছেন। অতঃপর আল্লাহ পরবর্তী সৃষ্টি করবেন’ (আনকাবূত ২৯/২০)।
ইসলামের প্রথম নির্দেশনা হ’ল ‘পড়’। যা আল কুরআনের সূরা আলাক্বে বর্ণিত হয়েছে। বিজ্ঞান চর্চার অন্যতম প্রধান উপায়ও হ’ল পড়া। । এমনকি সূরা আলাকের প্রথম পাঁচ আয়াতেই মানবসৃষ্টির উপাদান ‘আলাক্ব’-এর মাঝেই বিজ্ঞানের অনেক মর্ম লুকিয়ে আছে। ইসলাম বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যবহারকে কখনই নিরুৎসাহিত করে না। বরং এর সঠিক ও সুন্দর ব্যবহারকে উৎসাহিত করে।
মদীনা মুনাওয়ারায় নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জীবনে এরকম অনেক প্রযুক্তিগত ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। আহযাব বা খন্দকের যুদ্ধে যে পারসিক কৌশল ব্যবহার করা হয় তা ছিল আরবদের কাছে অপ্রচলিত প্রযুক্তি। অন্যান্য যুদ্ধগুলোতেও সামরিক দিক দিয়ে অনেক উন্নত রণকৌশলের প্রয়োগ দেখা যায়। ইসলামী সমাজের বিভিন্ন নীতিমালা যে কতটা বিজ্ঞানসম্মত তা আজ সুপ্রমাণিত। মহানবী (ছাঃ)-এর প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক মূলনীতি ছিল সর্বাধুনিক ও সর্বকালীন। তবে প্রতিটি জিনিসেরই ভালো-খারাপ দিক রয়েছে। মানুষ চাইলে তাকে যে কোন পথে ব্যবহার করতে পারে। প্রযুক্তিও তার ব্যতিক্রম নয়। এটিকে যেমন ইসলামের খেদমতে ব্যবহার করা সম্ভব। তেমনি খারাপ পথেও তা ব্যবহার করা যায়। লক্ষণীয় যে, আমরা প্রযুক্তিকে কোন কাজে ব্যবহার করছি সেটাই বিবেচ্য বিষয়। যদি প্রযুক্তিকে ইসলাম প্রচারের কাজে লাগানো যায়, তাহলে সব ধরনের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিই মানব তথা সকল সৃষ্ট জীবের জন্য কল্যাণকর হতে পারে।
ইন্টারনেটঃ ইন্টারনেট গোটা বিশ্বকে একই নেটওয়ার্কের আওতায় এনেছে। কিন্তু এটাও অপব্যবহারের শিকার। যার ফলে এই প্রযুক্তির কুফলও অধিক। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে অবুজ কিশোর কিশোরি সহজেই পর্ণোগ্রাফীসহ নানা অপকর্মে লিপ্ত হচ্ছে। ইন্টারনেটের মাধ্যমে বিভিন্ন অশ্লীল অডিও, ভিডিও প্রচারের ফলে অশ্লীলতার ব্যাপক অপব্যবহার হচ্ছে। যার কারণে নারীর শ্লীলতাহানি, ধর্ষণ, ইভটিজিং, এসিড সন্ত্রাস, হত্যা-গুম ইত্যাদি বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই প্রযুক্তির অবদানকে খুব কম মানুষই সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারছে। আগে এসব ঈমান বিধ্বংসী বিষয়গুলো অনুপস্থিত ছিল। বর্তমানে ইন্টারনেটের কল্যাণে তা হাতের মুঠোয় এসেছে। এক জরিপে জানা যায়, বিপুল সংখ্যক স্কুল শিক্ষার্থীরা পর্ণোগ্রাফীর সাথে জড়িত।
স্যোসাল মিডিয়াঃ মিডিয়াগুলোর নারী-পুরুষের অবৈধ যোগাযোগ, অর্ধনগ্ন ছবি বা ভিডিও প্রকাশের মাধ্যমে পরিণত হয়েছে। যা আমাদের সামাজিক অবক্ষয়কে ত্বরানিবত করছে। অথচ অশ্লীলতা সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন,إِنَّ الَّذِيْنَ يُحِبُّوْنَ أَنْ تَشِيْعَ الْفَاحِشَةُ فِي الَّذِيْنَ آمَنُوْا لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيْمٌ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ- ‘যারা মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতার প্রসার কামনা করে, নিশ্চয়ই তাদের জন্য ইহকালে ও পরকালে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি’ (নূর ২৪/১৯)।
প্রযুক্তি ব্যবহারের গুরুত্ব ঃ
প্রয়োজনের দরুণ দৈনন্দিন জীবনে প্রযুক্তির ব্যবহার সর্বত্র, এটা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। অপরদিকে এর অপব্যবহারের কথা বলে এটাকে পরিত্যাগ করারও কোন উপায় নেই। এর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিতকরণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ অধিক গুরুত্বপূর্ণ। প্রযুক্তির যথার্থ ব্যবহারই আদর্শ সমাজ বিনির্মাণে ভূমিকা রাখতে পারে।
নবী-রাসূলগণ তাদের যুগে তৎকালীন প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়েছিলেন এবং মহান সৃষ্টিকর্তা ও পালনকর্তা আল্লাহ তা‘আলার বিধান প্রচার-প্রসার করেছেন। উম্মতকে প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার শিখিয়েছেন। মহান আল্লাহর বাণী মানুষের কাছে পৌঁছিয়েছেন।
হযরত মূসা (আঃ)-এর সময় জাদুর প্রভাব ছিল খুব বেশি। সে যুগের প্রেক্ষাপটে আল্লাহ প্রদত্ত মুজেযা ব্যবহার করে ফেরাউন ও তার সম্প্রদায়ের নিকট দ্বীনের দাওয়াত দিয়েছেন তিনি। যার পরিপ্রেক্ষিতে অসংখ্য জাদুকর আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছিল। ঈসা (আঃ)-এর সময়ে চিকিৎসাবিদ্যার প্রচলন ছিল বেশী। তিনি তাই আল্লাহ প্রদত্ত চিকিৎসাবিদ্যার ব্যবহারের মাধ্যমে দাওয়াত দিয়েছেন। মৃতকে আল্লাহর হুকুমে জীবিত করে দেখানোর মাধ্যমে দাওয়াতী কাজ করেছেন (মায়েদাহ ৫/১১০)।
আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আল্লাহ সারা জাহানের জন্য রহমত স্বরূপ প্রেরণ করেছিলেন। তিনি এ ধরণীতে এসে মুশরিক, ইহুদী সহ সবাইকে দ্বীনের দাওয়াত দিয়েছেন। দাওয়াত দানে তিনি তৎকালীন প্রযুক্তি ব্যবহার করেছেন। ছাফা পাহাড়ে উঠে তিনি মানুষকে ইসলামের দাওয়াত দিয়েছেন। সে যুগে সাহিত্যের প্রভাব ছিল বেশী। তিনি উচ্চাঙ্গের আরবী সাহিত্যের ব্যবহার করেও মানুষকে ইসলামের দাওয়াত দিয়েছেন। একটি দেশ উন্নত রাষ্ট্র হিসাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করার প্রধান চালিকাশক্তি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি আবিষ্কারে ও ব্যবহারে অগ্রসরতা। যে জাতি যত বেশী উন্নত সে জাতি তত বেশী শিক্ষা-দীক্ষায়, জ্ঞান-বিজ্ঞানে ও প্রযুক্তি ব্যবহারে পারদর্শী। ইসলাম প্রযুক্তি ও বিজ্ঞান চর্চাকে গুরুত্ব দিয়েছে।
প্রযুক্তি ব্যবহারে আলেমদের করণীয়ঃ
মানুষের জীবন ও জীবনের মান উন্নয়নে বর্তমান তথ্য ও প্রযুক্তি বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধন করেছে। জীবন প্রবাহকে করেছ গতিশীল। আর ইসলাম মানুষের জন্য যে কোন কল্যাণকর জিনিসের সঠিক ব্যবহার সমর্থন করে। তাই তথ্য ও প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারে ইসলামের কোন নিষেধাজ্ঞা নেই।
তথ্য ও প্রযুক্তির ভুল ব্যবহার হচ্ছে। কোন জিনিসের ভুল ব্যবহার হলে তা নিষিদ্ধ হয়ে যায় না। বরং ভুল ব্যবহার বন্ধ করতে হয়। এক্ষেত্রে আমাদের আলেম সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে। তাদের দায়িত্ব মানুষকে প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার শেখানো। বর্তমানে আধুনিক প্রযুক্তি অর্থাৎ ইন্টারনেট ব্যবহার করে ইসলামের বিরুদ্ধে যে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে তার জবাব আলেমদের পক্ষ থেকেই আসা উচিত।
নতুন নতুন ফিৎনা ও মতবাদের প্রতিবাদ ইলেক্ট্রনিক মিডিয়াতে আলেম সমাজেরই করা উচিত। প্রয়োজনে জুম‘আর খুৎবায় প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারে কি করণীয় সে সম্পর্কে আলোচনা করা আবশ্যক। প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধে দুর্বল ঈমানদার ব্যক্তি যতটা তৎপর, অধিকতর ঈমানের অধিকারী আলেম সমাজ তার চেয়ে বেশী তৎপর হবেন এটা একান্ত কাম্য।
ইসলামের সুন্দর দিক বিশ্ববাসীর নিকট তুলে ধরার জন্য ইন্টারনেট, টিভি, ইলেক্ট্রনিক ও অন্যান্য মিডিয়া ব্যবহার করা নাজায়েয বলে ঘোষণা করা ‘মাথা ব্যথা হলে মাথা কেটে ফেলার’ নামান্তর। প্রযুক্তির সহজ ব্যবহারের সুযোগ নিয়ে ইসলাম বিরোধীরা অনলাইনে অপকটে মিথ্যা ছড়িয়ে দিচ্ছে। অশ্লীলতা, বেহায়াপনা, নগ্নতাকে উসকে দিচ্ছে। নাস্তিকতার প্রচার ও ধর্মে অযথা অবিশ্বাস তৈরি করছে। আধুনিক জাহেলিয়াতের এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে ইসলামের প্রকৃত বার্তা মানুষের কাছে তুলে ধরার দায়িত্ব আলেম সমাজের।
কল্যণকর অতীব জরূরী তথ্যগুলো সূত্রসহ তুলে ধরার মাধ্যমে ইসলামের বাস্তব অনুশীলনের প্রতি মানুষকে আকৃষ্ট করা যেতে পারে। আরবের আলেমরা ফেসবুক ব্যবহার করে ইসলামের দাওয়াতের ক্ষেত্রে অনেক দূর এগিয়েছেন। অসংখ্য মানুষ তাদের পেইজে ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ে লেখা প্রবন্ধগুলো পাঠ করছে। এক্ষেত্রে আমাদের আলেমরা ফেসবুককে দাওয়াতের মাধ্যম হিসাবে গ্রহণ করে ইসলামের প্রচার-প্রসারে ভূমিকা পালন করতে পারেন।
পবিত্র কুরআনের সাথে আধুনিক বিজ্ঞানের আবিষ্কৃত তত্ত্বগুলো যে সামঞ্জস্যপূর্ণ তা প্রচারে আলেমদেরকেই এগিয়ে আসতে হবে। আমাদের আলেম সমাজেরই দায়িত্ব প্রযুক্তির এই দিকহারা জাহাজের পাল টেনে ধরার। পাশাপাশি মানুষকে তার সঠিক ব্যবহার শিক্ষা দেওয়া। ইসলামের খেদমতে প্রযুক্তিকে কিভাবে আরও শক্তিশালী করা যায় তা নিয়ে কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরূরী।
ড. খালিদ বিন শাফিন