আমাকে চায়ের দোকানে কেউ দেখে না

আমি একজন খতিব, একজন ইসলামি বক্তা। জুমার মিম্বারে দাঁড়িয়ে আমি যখন কথা বলি, মানুষ নীরবে শোনে। আমি তাকওয়া, ইখলাস, দুনিয়ার মোহ ত্যাগ—এসব নিয়ে এমনভাবে বয়ান করি, যেন আমার নিজের জীবনটাই তার নিখুঁত উদাহরণ। আমার কণ্ঠে যখন বলি, “দুনিয়া ক্ষণস্থায়ী, আখিরাতই চিরস্থায়ী,” তখন অনেকের চোখে পানি আসে।
কিন্তু মসজিদের মিম্বার থেকে নেমে, যখন আমি পাড়ার রাস্তায় হাঁটি, তখন একটা জায়গা আমি খুব সচেতনভাবে এড়িয়ে চলি—চায়ের দোকান।
কারণটা খুব গভীর—অন্তত বাইরে থেকে তাই মনে হয়। আমি নিজেই মাঝে মাঝে ব্যাখ্যা দিই, “অপ্রয়োজনীয় আড্ডা মানুষকে গাফেল করে দেয়, সময় নষ্ট করে।” এই কথা শুনে অনেকে মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়। তারা ভাবে—হুজুর খুব পরহেজগার মানুষ, দুনিয়ার ফালতু আড্ডা থেকে দূরে থাকেন।
কিন্তু আমার ভেতরের আসল কারণটা একটু ভিন্ন।
চায়ের বিল
চায়ের দোকানে বসলে চা খেতে হবে, আর চা খেলে বিল দিতে হবে। আর সেই বিলটাই আমার আত্মসংযমের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। আমি তাই দূরে থাকি—এমনভাবে, যেন আমি দুনিয়ার মোহ ত্যাগ করেছি; অথচ আসলে আমি এক কাপ চায়ের খরচটাই ত্যাগ করতে পারি না।
আমি দোকানের পাশ দিয়ে হেঁটে যাই, চোখ নিচু করে। যেন দৃষ্টি সংযত রাখছি। অথচ মাঝে মাঝে কান খাড়া থাকে—কে কী বলছে, কী আলোচনা চলছে। রাজনীতি, সমাজ, এমনকি ধর্ম নিয়েও সেখানে কত কথা হয়! সেগুলোর অনেকটাই পরে আমার বয়ানের উপাদান হয়ে যায়।
একদিন আমি মিম্বারে দাঁড়িয়ে বলছিলাম, “ভাইয়েরা, আমাদের মধ্যে ভণ্ডামি ঢুকে গেছে। আমরা এক কথা বলি, আরেক কাজ করি। আল্লাহ আমাদের অন্তর দেখেন, বাহ্যিকতা নয়।”
এই কথাটা বলার সময় আমার নিজের বুকের ভেতরটা কেমন যেন ধক করে উঠলো। হঠাৎ মনে হলো, এই কথাটা কি আমি নিজেকেই বলছি?
কারণ আমি জানি, আমি চায়ের দোকানে বসি না—আল্লাহর ভয় থেকে না, নিজের পকেটের ভয় থেকে।
একবার এক মুসল্লি আমাকে জিজ্ঞেস করল, “হুজুর, আপনাকে তো কখনো চায়ের দোকানে বসতে দেখি না।”
আমি গম্ভীর মুখে বললাম, “সময়টা ইবাদতে লাগানোই উত্তম।”
সে মুগ্ধ হয়ে বলল, “সুবহানাল্লাহ, কী সুন্দর কথা!”
আমি মাথা নিচু করলাম। কিন্তু ভেতরে ভেতরে একটা অদ্ভুত অস্বস্তি কাজ করছিল। কারণ আমি জানি, আমার এই ‘ইবাদতের সময়’ আসলে চায়ের বিল বাঁচানোর সময়।
আমার এই জীবনটা দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেছে—একটা মিম্বারের ওপর, আরেকটা মিম্বারের নিচে। উপরে আমি যা বলি, নিচে আমি তা সবসময় পালন করি না। আর এই ফাঁকটাই আমার ভণ্ডামির জায়গা।
তবুও আমি নিজেকে সান্ত্বনা দিই। বলি, “আমি তো খারাপ কিছু করছি না। শুধু একটু এড়িয়ে চলছি।” কিন্তু সত্যিটা হলো, আমি এড়িয়ে চলছি নিজের দায়, নিজের ছোট ছোট দায়িত্ব।
চায়ের দোকানে বসা হয়তো বড় কোনো আমল না, কিন্তু সেখানে বসে মানুষের সঙ্গে মিশে যাওয়াটা একটা সততা। আর আমি সেই সততাটা এড়িয়ে যাই—এক কাপ চায়ের দামের জন্য।
আমি মাঝে মাঝে ভাবি, যদি একদিন হঠাৎ গিয়ে বসি? এক কাপ চা অর্ডার করি, বিলটা দিই—তাহলে কি আমার কিছু কমে যাবে? নাকি বরং আমার ভেতরের এই দ্বন্দ্বটা একটু কমবে?
কিন্তু সেই সাহসটা এখনো হয়ে ওঠে না।
তাই আজও আমি বলি, “আমাকে চায়ের দোকানে কেউ দেখে না।”মানুষ ভাবে—আমি দুনিয়া থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছি। কিন্তু আমি জানি—আমি আসলে গুটিয়ে নিয়েছি আমার পকেটকে।
শেষমেশ বুঝি, আমার সবচেয়ে বড় বয়ানটা এখনো দেওয়া হয়নি। সেটা মিম্বারে নয়—নিজের ভেতরে। যেখানে আমাকে বলতে হবে, “হে নিজে, তুমি যা বলো, তা একটু হলেও পালন করো।”
সেদিন হয়তো আমাকে চায়ের দোকানেও দেখা যাবে—এক কাপ চা হাতে, আর কোনো ভণ্ডামি ছাড়া।