সরল পথ এবং বিভ্রান্তির যুগ, লিখেছেন শায়খ ফারাজ রাব্বানী

দেশ আসলে কী? কখনো মনে হয়—মানচিত্রে টানা কিছু দাগ, কাঁটাতারের ঘেরা একখণ্ড ভূমিই বুঝি দেশ। কিন্তু পরক্ষণেই সে ভাবনায় দ্বিধা জাগে। কারণ এই দাগ টানা সীমারেখার ভেতরেই সার্বভৌমত্বের দাবিতে যুগে যুগে ঝরেছে অগণিত রক্ত, হয়েছে অসংখ্য ত্যাগ। ‘স্বাধীনতা’ ও ‘সার্বভৌমত্ব’—এই শব্দগুলো কেবল রাজনৈতিক পরিভাষা নয়, এগুলো মানুষের আত্মমর্যাদা ও অস্তিত্বের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।
ইতিহাসের পাতায় কিছু জাতি নিজেদের স্বাধীনতার গল্প লিখেছে গৌরবের স্বর্ণাক্ষরে, আবার অনেক জাতির ভাগ্যে জুটেছে স্বাধীনতা হারানোর করুণ অধ্যায়—লেখা হয়েছে কালো অক্ষরে। আধুনিক ইতিহাসে এমনই এক নীরব ও বিতর্কিত অধ্যায়ের নাম সিকিম।
মাত্র ৭,০৯৬ বর্গকিলোমিটারের ছোট্ট এই পাহাড়ি রাষ্ট্রটিও স্বাধীনভাবে বাঁচতে চেয়েছিল। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা ভারত উপমহাদেশ ছেড়ে যাওয়ার সময় সিকিমে প্রশ্ন উঠেছিল—ভারতের সঙ্গে যুক্ত হবে কি না। এ প্রশ্নে অনুষ্ঠিত গণভোটে সিকিমের জনগণ স্পষ্টভাবে ভারতের সঙ্গে একীভূত হওয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। কিন্তু ত্রিশ বছরের ব্যবধানও পেরোয়নি, তার মধ্যেই বিশ্বাসঘাতকতা, কূটচাল, গোয়েন্দা ষড়যন্ত্র এবং এক রাজার সরল বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে সিকিম পরিণত হয় ভারতের একটি প্রদেশে।
সিকিম কীভাবে ভারতের অংশে পরিণত হলো, তা বুঝতে হলে ফিরে তাকাতে হয় ব্রিটিশ শাসনামলের দিকে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে সিকিম বরাবরই ছিল শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর আগ্রহের কেন্দ্রে। উনিশ শতকের শুরুতে নেপালের গোর্খা রাজ্যের নিয়মিত আক্রমণে সিকিম চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিল। একই সঙ্গে গোর্খাদের আক্রমণে বিপর্যস্ত হচ্ছিল পার্শ্ববর্তী ব্রিটিশ ভারতীয় অঞ্চলগুলোও। এই অভিন্ন শত্রুর কারণে সিকিম ও ব্রিটিশ শাসকরা একজোট হয়।
১৮১৪ সালে শুরু হওয়া ব্রিটিশ-নেপাল যুদ্ধে নেপালের পরাজয়ের পর এক চুক্তির মাধ্যমে সিকিম তার হারানো ভূখণ্ড ফিরে পায়। কিন্তু এই সুযোগেই ব্রিটিশরা ধীরে ধীরে সিকিমের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে প্রভাব বিস্তার শুরু করে। চাপ প্রয়োগ করে তারা দার্জিলিং নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়—যা একদিকে ছিল মনোরম পাহাড়ি অবকাশকেন্দ্র, অন্যদিকে তিব্বতের সঙ্গে বাণিজ্যপথের গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার। চুক্তি অনুযায়ী দার্জিলিংয়ের জন্য সিকিমকে কর দেওয়ার কথা থাকলেও, এই কর নিয়েই অচিরেই দুই পক্ষের সম্পর্কে ফাটল ধরে।
পরবর্তীতে সিকিমের বহু শ্রমজীবী মানুষ উন্নত জীবনের আশায় ব্রিটিশ অধিকৃত অঞ্চলে বসবাস শুরু করলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। রাজা জোরপূর্বক তাদের ফিরিয়ে আনতে চাইলে ব্রিটিশদের সঙ্গে সম্পর্ক চরম অবনতির দিকে যায়। ১৮৪৯ সালে দুই ব্রিটিশ কর্মকর্তা সিকিমে বন্দী হওয়ার ঘটনার পর পরিস্থিতি বিস্ফোরণের দিকে মোড় নেয়। শেষ পর্যন্ত ১৮৬১ সালে ব্রিটিশরা দার্জিলিংসহ সিকিমের বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করে নেয়। নতুন চুক্তিতে সিকিম ব্রিটিশ ভারতের আশ্রিত রাজ্যে পরিণত হয় এবং গ্যাংটকে নিযুক্ত হন ব্রিটিশ প্রতিনিধি। নামমাত্র স্বাধীনতা থাকলেও প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ চলে যায় ব্রিটিশদের হাতে।
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা উপমহাদেশ ছাড়ার সময় সিকিমকে স্বাধীন রাজতন্ত্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে যায়। সেই সময়ই ভারতের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার প্রশ্নে ঐতিহাসিক গণভোটে জনগণ স্পষ্টভাবে না বলে দেয়। কিন্তু একই সময়ে রাজতন্ত্রবিরোধী একটি রাজনৈতিক শক্তি—সিকিম স্টেট কংগ্রেস—ধীরে ধীরে সক্রিয় হয়ে ওঠে। তাদের চাপের মুখে ১৯৫০ সালে সিকিমের ১১তম চোগিয়াল থাসি নামগয়াল ভারতের সঙ্গে এক চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য হন। এই চুক্তিতে সিকিম ভারতের আশ্রিত রাজ্যে পরিণত হয়; নিরাপত্তা, পররাষ্ট্র ও যোগাযোগ ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ যায় ভারতের হাতে, যদিও অভ্যন্তরীণ প্রশাসনে সিকিম আপাত স্বাধীন থাকে। এখান থেকেই মূলত সিকিমের স্বাধীনতার ক্ষয় শুরু হয়।
এই পর্যায়ে ইতিহাসের এক বিতর্কিত চরিত্র সামনে আসে—কাজী লেন্দুপ দর্জি। সিকিমের রাজপরিবারের সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক বিরোধ ছিল। তিনি ছিলেন কট্টর রাজতন্ত্রবিরোধী। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল গড়ে তুলে শেষ পর্যন্ত তিনি ‘সিকিম ন্যাশনাল কংগ্রেস’-এর নেতৃত্বে আসেন, যার লক্ষ্য ছিল রাজতন্ত্রের অবসান।
নেহেরুর মৃত্যুর পর ইন্দিরা গান্ধীর শাসনামলে ভারতের নীতি পাল্টে যায়। ১৯৬২ সালের চীন-ভারত যুদ্ধের পর সিকিম ভারতের কাছে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ভারতের আশঙ্কা ছিল—সিকিম হয়তো জাতিসংঘে স্বাধীনতার দাবি তুলতে পারে কিংবা চীনের দিকে ঝুঁকতে পারে। এই পরিস্থিতিতে ভারত লেন্দুপ দর্জিকে কার্যত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। পরবর্তীতে তিনি নিজেই স্বীকার করেন যে, ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা থেকে তিনি অর্থ ও নির্দেশনা পেতেন।
পরিকল্পিত রাজনৈতিক অস্থিরতা, সাম্প্রদায়িক বিভাজন এবং সহিংস আন্দোলনের মাধ্যমে সিকিমকে অস্থিতিশীল করে তোলা হয়। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছে যে, বহু মানুষ রাজতন্ত্রের পরিবর্তে ভারতের সঙ্গে যুক্ত হওয়াকেই ‘নিরাপদ’ সমাধান মনে করতে শুরু করে।
১৯৭৩ সালের নির্বাচনের পর আন্দোলন চরমে ওঠে। ভারতের হস্তক্ষেপে চোগিয়ালের ক্ষমতা প্রায় সম্পূর্ণ খর্ব করা হয়। ১৯৭৪ সালের নির্বাচনে লেন্দুপ দর্জির দল প্রায় সব আসনে বিজয় লাভ করে। এরপর ১৯৭৫ সালে বিতর্কিত গণভোটের মাধ্যমে রাজতন্ত্র বিলোপ করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, এই গণভোট ছিল পুরোপুরি সাজানো এবং ভারতীয় সেনাবাহিনীর চাপেই ফল নির্ধারিত হয়।
৬ এপ্রিল ১৯৭৫ সালে চোগিয়ালের প্রাসাদ ভারতীয় সেনাবাহিনী ঘিরে ফেলে। সিকিমের পতাকা নামিয়ে উত্তোলন করা হয় ভারতের তেরঙ্গা। এরপর ভারতের সংসদে আবেদন জানানো হয় সিকিমকে প্রদেশ করার জন্য। আবারও এক ‘গণভোটে’ জনগণের সম্মতির কথা জানানো হয়। অবশেষে ২৬ এপ্রিল ১৯৭৫ সিকিম আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের ২২তম প্রদেশে পরিণত হয়।
চীনের আপত্তি ছাড়া আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই দখলদারির বিরুদ্ধে তেমন কোনো প্রতিবাদ শোনা যায়নি।
আজ সিকিম ভারতের দ্বিতীয় ক্ষুদ্রতম রাজ্য, আর গ্যাংটক একটি জনপ্রিয় পর্যটন শহর। কিন্তু ইতিহাস জানে—একসময় এটি ছিল একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। সিকিমের অনেক তরুণ আজও সেই ইতিহাস স্মরণ করে লজ্জা আর বেদনায় মাথা নত করে, যাদের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও বিশ্বাসঘাতকতার বিনিময়ে একটি স্বাধীন দেশের মানচিত্র থেকে নাম মুছে গিয়েছিল।