fbpx fbpx fbpx
মঙ্গলবার, ০২, জুন, ২০২৬ , ১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস ও চলমান নৈরাজ্য প্রসঙ্গে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী’র অবস্থান

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম

সবুজ-শ্যামলে ঘেরা আমাদের প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশ — প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, উর্বর মাটি ও পরিশ্রমী মানুষের দেশ। এই পবিত্র ভূমি ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে লাখো শহীদের আত্মত্যাগ, অগণিত মানুষের ত্যাগ ও সংগ্রামের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জন করে বিশ্বের মানচিত্রে একটি স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। আমরা সেই মহান আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা জানাই এবং শহীদদের রূহের মাগফিরাত কামনা করি।

স্বাধীনতার চেতনা ছিল — গণতন্ত্র, সাম্য, ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদার ভিত্তিতে একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা। কিন্তু আজ, স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে, সেই স্বপ্ন ও আদর্শ গভীর সংকটে নিমজ্জিত। দেশের সর্বত্র আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, মানবাধিকার লঙ্ঘন, এবং নাগরিক স্বাধীনতার সংকোচন উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছেছে। ভিন্নমত দমন, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হওয়ার ঘটনা প্রায় নিত্যনৈমিত্তিক হয়ে উঠেছে।

বিচার বিভাগ, প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে। অভিযোগ রয়েছে— অনেক ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রযন্ত্রকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে। নিরপরাধ নাগরিকদের গ্রেফতার, রিমান্ডে নির্যাতন, এবং ‘ক্রসফায়ার’ নামে হত্যার মতো ঘটনা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্য লজ্জাজনক ও অগ্রহণযোগ্য। কারাগারগুলোতে ধারণক্ষমতার বহু গুণ বেশি বন্দি অবস্থান করছে; মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের ন্যূনতম শর্তও সেখানে লঙ্ঘিত হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলেন— যখন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়, রাজনৈতিক বিরোধিতা দমন করা হয় এবং জনগণের ভোটাধিকার হরণ করা হয়, তখন সমাজে হতাশা, ক্ষোভ ও উগ্র প্রবণতার জন্ম নেয়। এই বাস্তবতাই আজকের বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা, অবিশ্বাস ও সামাজিক বিভাজনের অন্যতম কারণ। ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি, প্রতিহিংসার সংস্কৃতি ও স্বজনপ্রীতি—জাতির অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করছে।

এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মনে করে— দেশের সঙ্কটের মূল কারণ হলো ন্যায়বিচারের অভাব ও নৈতিক শূন্যতা। গণতন্ত্র কেবল ভোটের মাধ্যমে নয়; এটি হতে হবে নৈতিকতা, জবাবদিহিতা ও জনগণের আস্থার ওপর প্রতিষ্ঠিত একটি ব্যবস্থা।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে রাষ্ট্র পরিচালনার লক্ষ্যে তাদের কার্যক্রম শুরু করে। ১৯৭৯ সালের ২৭ মে থেকে আজ পর্যন্ত দলটি সংবিধানসম্মত উপায়ে দেশের কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছে। জামায়াত বিশ্বাস করে— ইসলামী মূল্যবোধ ও মানবিক ন্যায়ের সমন্বয়ে গঠিত একটি সমাজব্যবস্থাই পারে দুর্নীতি, অন্যায় ও স্বৈরাচার থেকে জাতিকে মুক্ত করতে।

রাজনীতি ছাড়াও জামায়াত শিক্ষা, সমাজকল্যাণ ও মানবিক সহায়তার ক্ষেত্রে নিরলসভাবে কাজ করে আসছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ, দরিদ্র ও অসহায় জনগোষ্ঠীর পাশে দলীয় কর্মীরা সবসময় সক্রিয় থাকে— যা জনগণের আস্থা ও ভালোবাসা অর্জনের প্রমাণ বহন করে।

আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি— শান্তি, ন্যায় ও মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার একমাত্র পথ হলো নৈতিক রাজনীতি, সত্যভিত্তিক নেতৃত্ব ও জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।

জামায়াতে ইসলামী’র নীতিমালা ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী বিশ্বাস করে— একটি উন্নত, ন্যায়ভিত্তিক ও শান্তিপূর্ণ রাষ্ট্র গঠনের জন্য প্রয়োজন নৈতিকতার ভিত্তিতে পরিচালিত গণতন্ত্র, জনগণের অংশগ্রহণমূলক শাসনব্যবস্থা এবং আইনের প্রতি সমান শ্রদ্ধা।

দলের মৌলিক নীতি হলো:

১.আল্লাহভীতি, ন্যায়বিচার ও মানবকল্যাণের সমন্বিত প্রয়োগ।

২.দেশপ্রেম, নাগরিক অধিকার ও মানবমর্যাদার প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা।
.শান্তিপূর্ণ, সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ক্ষমতার পরিবর্তন।

৪.অহিংস রাজনীতি, সহনশীলতা ও ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল মনোভাব।

জামায়াতে ইসলামী মনে করে, কোনোভাবেই সন্ত্রাস, সহিংসতা বা রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড ইসলামের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ইসলাম শান্তি, সাম্য ও মানবিক মর্যাদার ধর্ম। তাই যারা ধর্মের নামে নিরীহ মানুষের জীবন হরণ করে, রাষ্ট্রে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সহিংসতা ব্যবহার করে— তাদের কর্মকাণ্ড ইসলামী নীতির পরিপন্থী।

জামায়াত বারবার স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে, দলটিজঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস, উগ্রবাদ ও নাশকতাএই চারটি বিষয়ের বিরোধী। ইসলামের নামে এসব অপরাধ সংঘটন করা ধর্ম ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ।

দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, জামায়াতের প্রত্যেক স্তরের নেতা-কর্মীকে শান্তিপূর্ণ রাজনীতি, মানবসেবা ও সমাজকল্যাণমূলক কাজে নিয়োজিত থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কোনো ব্যক্তি যদি দলের নীতির বাইরে গিয়ে বেআইনি কর্মকাণ্ডে জড়িত হয়, সে নিজ দায়িত্বে দায়ী—দলের নয়।

সরকার ও প্রশাসনের দায়িত্ব

রাষ্ট্রের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার কাজ হলো প্রকৃত অপরাধীদের সনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা। কিন্তু দুঃখজনকভাবে দেখা যায়— অনেক সময় রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নিরীহ মানুষ, বিশেষ করে ভিন্নমতের রাজনৈতিক কর্মীদের বিরুদ্ধে জঙ্গিবাদের মিথ্যা অভিযোগ আনা হয়। এতে প্রকৃত অপরাধীরা রেহাই পায়, আর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর দমননীতি চালানো সহজ হয়।

এ ধরনের আচরণ শুধু মানবাধিকারের পরিপন্থী নয়, বরং এটি সন্ত্রাস দমন প্রচেষ্টাকে দুর্বল করে এবং সমাজে অবিশ্বাস সৃষ্টি করে। জামায়াতে ইসলামী মনে করে— জঙ্গিবাদ দমনের নামে নিরীহ নাগরিকদের হয়রানি, গ্রেফতার বা নিখোঁজ করা একটি রাষ্ট্রীয় অন্যায় এবং মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন।

ইসলামের দৃষ্টিতে শান্তির আহ্বান

ইসলাম সর্বদা সংলাপ, যুক্তি ও ন্যায়ের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করতে নির্দেশ দেয়। কোরআনে বলা হয়েছে,

আল্লাহ ন্যায়, দয়া ও আত্মীয়স্বজনের প্রতি সদাচার করতে আদেশ করেন এবং অন্যায়, অশ্লীলতা ও জুলুম নিষেধ করেন।” (সূরা আন-নাহল: ৯০)

এই নীতির আলোকে জামায়াতে ইসলামী সমাজে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা ও ভ্রাতৃত্ববোধের পরিবেশ সৃষ্টিতে বিশ্বাস করে।

জামায়াতের লক্ষ্য—

  • এমন একটি সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলা যেখানে প্রত্যেকে নিরাপদ, সম্মানিত ও ন্যায়বিচারপ্রাপ্ত নাগরিক হবে।
  • যেখানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত থাকবে।
  • যেখানে ক্ষমতা হবে জনগণের কাছে দায়বদ্ধ এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ হবে সবার জন্য সমভাবে উন্মুক্ত।

সাম্প্রতিক পরিস্থিতি, সরকারের ভূমিকা ও জাতীয় ঐক্যের আহ্বান

সাম্প্রতিক সময়ে দেশে ঘটে যাওয়া একাধিক সহিংস ঘটনা, বিক্ষোভ দমন, এবং রাজনৈতিকভাবে প্রণোদিত গ্রেফতার ও নির্যাতনের ঘটনা জাতিকে গভীর উদ্বেগের মধ্যে ফেলেছে। এই ধরনের কর্মকাণ্ড কেবল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি জনগণের আস্থা নষ্ট করছে না, বরং সমাজে ভয়, অবিশ্বাস ও বিভাজন বাড়িয়ে তুলছে।

দেখা যাচ্ছে— রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নির্মূল করার লক্ষ্যে সরকার প্রশাসনিক ক্ষমতা ব্যবহার করছে। বিরোধী মতাবলম্বী নেতা-কর্মীদের ঘরে ঘরে তল্লাশি, নির্বিচারে গ্রেফতার এবং মিথ্যা মামলা দায়েরের ঘটনা প্রতিদিনই ঘটছে। অনেকেই গুম বা নিখোঁজ হচ্ছেন, যাদের খোঁজ আজও মেলেনি। এই অবস্থায় সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে, এবং রাষ্ট্রব্যবস্থা ক্রমে একদলীয় শাসনের দিকে ধাবিত হচ্ছে।

জামায়াতে ইসলামী দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে— ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে নয়, বরং জনগণের সেবার জন্য রাজনীতি করতে হয়। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীকে দমন নয়, বরং সংলাপ ও সহনশীলতার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানই গণতান্ত্রিক পথ।

সরকারের প্রতি আহ্বান

আমরা সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি—
১. ভিন্নমতেরপ্রতিশ্রদ্ধাপ্রদর্শনকরুনএবংরাজনৈতিকবিরোধীদেরবিরুদ্ধেদমননীতিপরিহারকরুন।
২. বিচারবহির্ভূতহত্যাকাণ্ড, গুম, এবং অন্যায় গ্রেফতার অবিলম্বে বন্ধ করুন।
৩. মতপ্রকাশেরস্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করুন।
৪. সকলদলেরঅংশগ্রহণেএকটিস্বাধীননিরপেক্ষনির্বাচনেরব্যবস্থাকরুন, যাতে জনগণ তাদের প্রকৃত প্রতিনিধি নির্বাচন করতে পারে।

আইন-শৃঙ্খলা ও সন্ত্রাস দমন

রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, কিন্তু সেটি অবশ্যই আইনের শাসন ও মানবাধিকারের পরিপন্থী না হয়ে হতে হবে। জঙ্গিবাদ দমন করা প্রয়োজন, তবে সে নামে যেন কোনো রাজনৈতিক দল বা নাগরিক সমাজের সদস্য হয়রানির শিকার না হন। প্রকৃত অপরাধীদের চিহ্নিত করে নিরপেক্ষ তদন্ত ও স্বচ্ছ বিচার নিশ্চিত করাই ন্যায়বিচারের পথ।

জামায়াতে ইসলামী মনে করে— জঙ্গিবাদ বা সহিংসতা কোনোভাবেই দেশের স্থিতিশীলতার জন্য সহায়ক নয়। বরং রাজনৈতিক সংকট সমাধানের জন্য দরকার জাতীয় সংলাপ, আস্থা পুনরুদ্ধার এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশ প্রতিষ্ঠা।

জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজন

আজ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো জাতীয় ঐক্য। ইসলামি, ধর্মনিরপেক্ষ, জাতীয়তাবাদী—সব ধারার রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজকে একসাথে বসতে হবে দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে। ভিন্ন মত থাকা স্বাভাবিক, কিন্তু দেশ ও জাতির স্বার্থে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহনশীলতার ভিত্তিতে সমঝোতার পথই শান্তি ও উন্নয়নের একমাত্র গ্যারান্টি।

আমরা বিশ্বাস করি—

যে জাতি সংলাপ ও সহনশীলতা পরিত্যাগ করে, সে জাতি নিজের ভবিষ্যৎকেই অন্ধকারে ঠেলে দেয়।”

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তাই সব নাগরিক ও রাজনৈতিক শক্তির প্রতি আহ্বান জানায়—
চলুন, আমরা বিভেদ নয়; ঐক্যের পথে হাঁটি।
ঘৃণা নয়; সংলাপ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার রাজনীতি গড়ে তুলি।
এবং এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলি যেখানে ন্যায়, মানবিক মর্যাদা, নিরাপত্তা ও শান্তি সবার জন্য নিশ্চিত হয়।


সমাপনী আহ্বান

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী দেশের জনগণের প্রতি অঙ্গীকার করছে যে—
আমরা ন্যায়ের পথে, শান্তির পথে ও গণতন্ত্রের পথে অবিচল থাকব।
আমরা সহিংসতার নয়, সংলাপের রাজনীতি বিশ্বাস করি।
আমরা চাই একটি ন্যায়ভিত্তিক, সুখী ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ—যেখানে প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার ও মর্যাদা সমানভাবে সুরক্ষিত থাকবে।

আল্লাহ আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিকে রক্ষা করুন, শান্তি ও সুবিচার প্রতিষ্ঠা করুন।
আমিন।

মন্তব্য