Dawatul Islam | ধৈর্য ও নামাজ দ্বারা আল্লাহর সাহায্য কামনা

শনিবার, ০৪, এপ্রিল, ২০২৬ , ২১ চৈত্র ১৪৩২

ধৈর্য ও নামাজ দ্বারা আল্লাহর সাহায্য কামনা
২৭ নভেম্বর ২০২৩ ১০:০০ মিনিট

সবর-এর তাৎপর্যঃ ‘সবর’ শব্দের অর্থ হচ্ছে সংযম অবলম্বন ও নফ্স এর উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রন লাভ করা।

কোরআন ও হাদীসের পরিভাষায় ‘সবর’ এর তিনটি শাখা রয়েছেঃ (এক) নফসকে হারাম ও নাযায়েজ বিষয়াদি থেকে বিরত রাখা, (দুই) ইবাদত ও আনুগত্যে বাধ্য করা এবং (তিন) যে কোনো বিপদ ও সংকটে ধৈর্য-ধারণ করা অর্থ্যাৎ যে সব বিপদ-আপদ এসে উপস্থিত হয় সেগুলোকে আল্লাহর বিধান বলে মেনে নেওয়া এবং এর বিনিময়ে আল্লাহর তরফ থেকে প্রতিদিন প্রাপ্তির আশা রাখা। অবশ্য কষ্টে পড়ে

যদি মুখ থেকে কোন কাতর শব্দ উচ্চারিত হয়ে যায় কিংবা অন্যের কাছে তা প্রকাশ করা হয়, তবে তা ‘সবর’- এর পরিপন্থী হবে না। (ইবনে কাসীর, সায়ীদ ইবনে জুবায়ের থেকে)

‘সবর’-এর উপরিউক্ত তিনটি শাখায় প্রত্যেক মুসলমানের অবশ্য পালনীয় তিনটি কর্তব্য। সাধারণ মানুষের ধারণায় সাধারণত তৃতীয় শাখাকেই ‘সবর’ হিসেবে গণ্য করা হয়। প্রথম দুটি শাখা যে এ ক্ষেত্রে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ সে ব্যাপারে মোটেও লক্ষ্য করা হয় না। এমনকি এ দুটি বিষয়ও যে ‘সবর’–এর অন্তর্ভুক্ত এ ধারণাও যে অনেকের নেই।

কুরআন হাদীসের পরিভাষায় ধৈর্য ধারণকারী বা ‘সাবের‘ সে সমস্ত লোককেই বলা হয়, যারা উপরিউক্ত তিন প্রকারেই ‘সবর’ অবলম্বণ করে থাকে। কোন কোন বর্ণনায় রয়েছে, হাশরের ময়দানে ঘোষণা করা হবে, “ধৈর্য ধারণকারীগণ কোথায়?” এ কথা শোনামাত্রই সেসব লোক উঠে দাড়াবে যারা তিন প্রকারে্ই ‘সবর’ করে জীবন অতিবাহিত করে গেছেন। এসব লোককে প্রথমেই বিনা হিসেবে বেহেশতে প্রবেশ করার অনুমতি দেওয়া হবে। ‘ইবনে কাসীর’ এ বর্ণনা উদ্ধৃত করে মন্তব্য করেছেন যে, কুরআনের অন্যত্রঃ

অর্থ্যাৎ সবকারী বান্দাগণকে তাদের পুরস্কার বিনা হিসেবেই প্রদান করা হবে। এ আয়াতে সেদিকেই ইশারা করা হয়েছে।

নামাযঃ মানুষের যাবতীয় সমস্যা ও সংকট দূর করা এবং যাবতীয় প্রয়োজন মেটানোর ক্ষেত্রে কুরআনে উল্লিখিত দ্বিতীয় পন্থাটি হচ্ছে নামায।

‘সবর’-এর তফসীর প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, প্রকৃতপক্ষে সর্বপ্রকার ইবাদতই ‘সবর’ এর অন্তর্ভুক্ত । কিন্তু এরপরও নামাযকে পৃথকভাবে উল্লেখ করার কারণ হচ্ছে যে, নামায এমনই একটি ইবাদত, যাতে ‘সবর’ তথা ধৈর্যের পরিপূর্ণ নমূনা বিদ্যমান।কেননা নামাযের মধ্যে একাধারে যেমন নফস তথা রিপুকে আনুগত্যে বাধ্য রাখা হয়, তেমনি যাবতীয় নিষিদ্ধ কাজ, নিষিদ্ধ চিন্তা, এমন কি অনেক হালাল ও মোবাহ বিষয় থেকেও নিজেকে সরিয়ে রাখা যায়। সে মতে নিজের নফসের উপর পরিপূর্ণ নিয়ন্ত্রন লাভ করে সর্বপ্রকার গুনাহ্ ও অশোভনীয় আচার-আচরণ থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখা এবং ইচ্ছার বিরুদ্ধে হলেও  নিজেকে আল্লাহর ইবাদতে নিয়োজিত রাখার মাধ্যমে ‘সবর’-এর যে কোন অনুশীলন করতে হয়, নামাজের মধ্যেই তার একটা পরিপূর্ণ নমুনা ফুটে উঠে।

যাবতীয় প্রয়োজন পূর্ণ করা এবং সর্বপ্রকার বিপদাপদ থেকে মুক্তি লাভ ব্যাপারে নামাযের একটা বিশেষ “তাছীর” বা প্রভাবও লক্ষ্য করা যায়। বিশেষ বিশেষ রোগে কোন কোন ওষধী গুল্ম-লতা ও ডাল-শিকড় গলায় ধারণ করায় বা মুখে রাখায় যেমন বিশেষ ফল লক্ষ্য করা যায়, লোহার প্রতি চুম্বকের বিশেষ আকর্ষন যেমন স্বাভবিক, কিন্তু কেন এরূপ হয়, তা যেমন সবিস্তারে ব্যাখ্যা করে বলা যায় না, তেমনি বিপদ-মুক্তি এবং যাবতীয় প্রয়োজন মেটানোর ক্ষেত্রে নামাযের তাছীরও ব্যাখ্যা করা যায় না। তবে এটা পরীলক্ষিত সত্য যে, যথাযথ আন্তরিকতা ও মনোযোগ সহকারে নামায আদায় করলে যেমন বিপদমুক্তি অবধারিত, তেমনি যে কোন প্রয়োজন পূরণের ব্যাপারেও এতে সুনিশ্চিত ফল লাভ করা হয়।

হুজুর (সাঃ) –এর পবিত্র অভ্যাস ছিল যে, যখনই তিনি কোন কঠিন সমস্যার সম্মুখীন হতেন, তখনই তিনি নামাজ আরম্ভ করতেন। আর আল্লাহ তায়ালা সে নামাজের বরকতেই তাঁর যাবতীয় বিপদদূর করে দিতেন। হাদীস শরীফে বর্ণিত রয়েছেঃ

অর্থ্যাৎ মহানবী (সাঃ)-কে যখনই কোন বিষয় চিন্তিত করে তুলত, তখনই তিনি নামায পড়তে শুরু করতেন।

“হে ঈমানদারগণ আল্লাহর কাছে সাহায্য চাও সবর (বা অবিচলতা) ও নামায দ্বারা। নিশ্চয়, তিনি সবরকারী ব্যক্তিদের সাথে আছেন।”

কুরআনে কারীমে সবর এর (অবিচলতা) উল্লেখে এসেছে বহু স্থানে, কারণ আল্লাহ তায়ালা ভালো করেই জানেন যে দুনিয়ায় স্বার্থের হানাহানিতে ও স্বভাবজাত বিভিন্ন ঝোঁকপ্রবণতা বা মানবসুলভ দূর্বলতায় ধৈর্য ও অবিচলতার প্রয়োজনতা সর্বাধিক। অনুরুপভাবে, বিপদ মুসিবতের সময় বা কঠিন পরিস্থিতিতে আল্লাহর দ্বীন এর প্রচার ও প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনে ধৈর্য বা অবিচলিত থাকা অত্যধিক প্রয়োজন, কেননা এ উভয়বিধ কাজের সময় বাধা বিঘ্ন ও সংকট অল্পবিস্তর আসবেই। কখনও এজন্যে আর্থিক ক্ষয়-ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে, আবার কখনও জীবনর ঝুঁকিও এসে যাবে। তাছাড়া স্বাভাবিক পরিস্থিতেও একাজ ধৈর্য ও সহনশীলতার দাবী করে, যেহেতু একটি জীবন ব্যবস্থা সমাজে শেকড় গেড়ে রয়েছে, তাকে সমূলে উৎপাদিত করে আর একটি সমাজ ব্যবস্থার ভিত গাঁড়তে গেলে পূর্ববর্তী সমাজব্যবস্থার প্রতিষ্ঠিত শেকড়গুলো তুলে ফেলা খুব চাট্টিখানি কথা নয়।

এত প্রয়োজন পরিশ্রম, সহিষ্ণুতা,কষ্টকর কাজে দীর্ঘদীন পর্যন্ত লেগে থাকা এবং একত্রিত হয়ে কাজ করার মানসিকতা। বাধা বিঘ্নের মোকাবেলায় যুক্তি প্রদর্শন, বুদ্ধিমত্তার (হেকমতের) ব্যবহার, আক্রমণ প্রতিহত করার মানবিক, শারীরিক ও অন্যান্য বস্তুগগত যোগ্যতা, দৃঢ়তা ও সর্বপ্রকার ত্যাগ স্বীকারের মানসিকতাও একাধারে ও পর্যায়ক্রমে প্রয়োজন। এ সামগ্রিক সংগ্রামে প্রথম প্রয়োজন নিজের নফসকে প্রস্তুত করা যেহেতু নফস তো ‘নগদ যা পাও হাত পেতে নাও’ এর প্রবক্তা, দীর্ঘসূত্রী কোনো অগ্রযাত্রা বা পাওনার বিরোধী। এর পর পর্যায়ক্রমে আসে পরিবার, পরিবেশ পরিজন এর পক্ষ থেকে নানা প্রকার দাবী।

সুতরাং, আল্লাহর দেয়া দায়িত্বের হক আদায় করতে গেলে অনেকে তার হক নিয়ে হাজির হয়। এসব কিছুর সাথে সামঞ্জস্য বিধান করে, সঠিক সিদ্ধান্ত ও সংগ্রামের দিকে অগ্রসর হতে প্রয়োজন প্রজ্ঞা, মানসিক দৃঢ়তা, কষ্ট সহিষ্ণুতা ও ত্যাগ তিতীক্ষা বরদাশত করার মতো সর্বপ্রকার যোগ্যতা। সুতরাং সবকিছুর মোকাবেলায় বিচলিত না হয়ে নিজ কর্তব্য নির্ধারণ করে আল্লাহর ওপর তায়াক্কুল করে অগ্রসর হওয়ার নামই হচ্ছে সবর, কিন্তু মিথ্যার সংগ্রামে যখন দীর্ঘসূত্রতা হয় তখন সবর এর বাধ ভেঙ্গে যেতে চায়। আল্লাহর দ্বীন এর ঝান্ডাকে সমুন্নত রাখার কঠিন কাজ করতে গিয়ে যখন আশপাশ থেকে কোনো সাহায্য না আসার সম্ভবনা দেখা দেয় অথবা এই বন্ধুর পথ পরিক্রমায় পথের পাথেয় ফুরিয়ে আসতে চায়, তখন স্নায়ূর উপর প্রচন্ড চাপ পড়ে। সে অবস্থায় আল্লাহর ওপর তায়াক্কুল ও ‘সবর‘ এর প্রয়োজন হয়ে পড়ে সব থেকে বেশী, আর তা অর্জিত হয় নামাজের মাধ্যমে। তাই সবর এর পর নামাযের উল্লেখ এসেছে।

নামায এমন একটি কাজ যা আল্লাহর বান্দার সরাসরি যোগাযোগ ঘটায় এবং ‘সবর’ এর জন্যে প্রেরণার উৎস হিসেবে কাজ করে। এ উৎস কখনও শূষ্ক হয়ে যাওয়া বা শেষ হবার নয়। যতোবারই বিচলিত ভাব আসে ততবারই বান্দা আল্লাহর দরবারে হাজিরা দিয়ে নতুন করে প্রেরণা হাসিল করে, সংগ্রহ করে সেই পাথেয় যা কখনও নিঃশেষ হয় না। তাই যতোবারই বান্দা নামাযে দাঁড়ায় ততোবারই তার ধৈর্যের বাধন মজবুত হওয়া সে নিবিড়ভাবে অনুভব করতে পারে। ধৈর্য ধারণ ছাড়াও নামাযের মাধ্যমে মোমেন বান্দা অন্তরের প্রফুল্লতা, মানসিক শান্তি, দৃঢ় প্রত্যয় ও আল্লাহর সন্তোষ অনুভব করে।

নশ্বর এই পৃথিবীর দূর্বল মানুষ যখন তার সীমিত শক্তি ও সাহস হারিয়ে ফেলতে বসে তখন সে অনুভব করে অবিনশ্বর ও সর্বশক্তিমান আল্লাহর কাছে হাত পাতার প্রয়োজন। তাই যতোবারই সে দূর্বলতা ও শক্তিহীনতা অনুভব করে ততোবারই আল্লাহর কাছে নামাযের মাধ্যমে ধর্ণা দেয় ও নতুন প্রেরণা লাভের জন্যে তাঁর কাছেই আকুল আবেদন জানায়। হাত পাতার প্রয়োজন সব থেকে বেশী দেখা দেয় তখন, যখন সত্য ন্যায়ের পথের পথিকদেরকে আল্লাহর দুশমনদের প্রকাশ্য ও গোপন তৎপরতার মোকাবেলায় নামতে হয়।

এ সাহায্যের প্রয়োজন তখন তীব্রভাবে অনুভুত হয় যখন লোভ-লালসা ও স্বার্থের হাতছানির টানাপড়েনে সত্যের রশিকে দৃঢ়ভাবে ধারণকরাটা অত্যন্ত কঠিন কাজ বলে অনুভুত হতে থাকে, যখন খোদাদ্রোহীদের প্রবল শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করাটা তার জন্যে দুঃসাধ্য পর্বত উত্তরণের শামিল মনে হয়, যখন সে দেখতে পায় তার সীমিত জীবনে সত্যের দীর্ঘ পথের দুঃসহ পথ পরিক্রমা, যখন সে দেখতে পায় মৃত্যু সন্নিকটে অথচ মনযিল বহুদূর, যখন সে দেখে তার জীবন সায়ান্হ সমাগত আর লক্ষ্য অর্জন সুদূর পরাহত, যখন মিথ্যা ও পাপাচারের বিজয় ডংকা গুরু গম্ভীরভাবে সে বাজতে দেখে আর  দেখে সত্যের ক্ষীণ আলো যেন নিভু নিভু প্রায়।

 এমনই সু-কঠিন অবস্থায় বান্দাকে হতাশ না হয়ে সর্বশক্তিমান আল্লাহ তায়ালা উদাত্ত কন্ঠে আহবান জানাচ্ছেন ‘হে আমার বান্দা ‘সবর’ এর রশি মজবুত করে ধরে সঁপে দাও তুমি আমার কাছে তোমার জীবন। ঢলে পড়ো আমার দরবারে সেজদাতে। সকল কঠিন অবস্থার সামাল দেয়া সেতো আমারই দায়িত্ব।’ এই সেই নামাজ যার নমুনা পাওয়া যায় আল্লাহর সিংহ হযরত আলী কাররামাল্লাহুর আত্ন নিবেদনে যখন তার পা থেকে মাংস শুদ্ধ তীর বের করে নেয়া সত্তেও অম্লান বদনে তিনি থেকেছেন সেজদানত। এই নামাযেই নশ্বর মানুষ ও অবিনশ্বর আল্লাহর সাথে যোগসূত্র কায়েম হয়। এই নামায এক অফুরন্ত নির্ঝরিনী যার উৎসমূল চিরপ্রবাহকমান। এ নামায সেই মহান ভান্ডারের চাবি যার দৌলত কোনদিন নিঃশেষ হবার নয়। এর সীমাহীন বরকতে মানুষ লাভ করে অশেষ প্রতূর্য ও পূর্ণত্ব।

এই নামাজের মাধ্যমেই বান্দা সীমাবদ্ধ জগতের সীমা পেরিয়ে সীমাহীন উর্ধজগতের সীমানায় পা রাখতে সক্ষম হয়, এ যেন চৈত্রের দুপুরের প্রচন্ড উত্তাপে সু-শীতল বায়ুর মৃদু মন্দ দোলা, এ যেন তৃষিত ও হতাশ প্রেমিকের কাছে প্রিয়তম –এর পক্ষ থেকে অমেয় আশার বাণী! তাই দেখা যায় না যে, কোনো কঠিন পরিস্থিতিতে রাসুল্লাহ (সাঃ)-এর বেলালের প্রতি আহব্বান, ”হে বেলাল, নামাযের মাধ্যমে আমাকে শান্তি দাও’। আরও দেখা যায়, যে কোন কঠিন বিষয় হাজির হলে তিনি রুজু করতেন নামাজের দিকে এবং গভীরভাবে নিজেকে সপে দিতেন আল্লাহর কাছে সেজদানত ভাবে।

গোটা ইসলামী ব্যবস্থায় হচ্ছে আল্লাহর কাছে বান্দার আনুগত্য প্রকাশ্যের ব্যবস্থা। প্রতিনিয়ত আনুগত্য প্রকাশ্যের এই নিয়তান্ত্রিক বিধান মোমেনের জীবনে এনে দেয় তার চলার পথের সুমহান পাথেয়, তার রুহের প্রশান্তি, তার অন্তর উজ্জীবিত রাখার স্বচ্ছ সমুজ্জত বাতি। প্রতিটি কঠিন দায়িত্ব পালনকালে নামায তাকে দান করে সঞ্জীবনী সুধা, যার ফলে সে অনুভব করে চরম কঠোরতার মাঝেও পরম আনন্দ। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন নবীকে তাঁর প্রতিনিধিত্বের গুরুদায়িত্ব দিতে যখন মনস্ত করলেন তাঁকে সস্নেহে ডাক দিয়ে বললেন,

“হে প্রিয় বান্দা আমার, রাতের বেলায় উঠো এবং দাঁড়াও নামাযের জন্যে রাত্রিতে, তবে কিছু সময় বাদে রাতের অর্ধেক নামাযে কাটাও অথবা আরও কিছু কম সময়ে নামাযে রত থাকো অথবা অর্ধেকের কিছু বেশী সময় নাও নামাজের জন্যে এবং পড়ো কোরআন থেমে থেমে ও স্পষ্টভাবে। নিশ্চয় আমি খুব শীঘ্রই তোমার উপর একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা নাযিল করব।”

এই রাত্রিকালে ঘুম থেকে জেগে ওঠা এবং ধীরে সুস্থে কোরআনে কারীমের সাফ সাফ তেলাওয়াত ছিলো ভারী ও গুরুত্বপূর্ণ কথার বোঝা বহন করার জন্যে এক কঠিন প্রস্তুতি যা অতি শীঘ্রই তিনি তাঁর কাছে পাঠাবেন বলে আগেভাগেই জানিয়ে দিয়েছিলেন। প্রকৃতপক্ষে এটা এক নিদৃঢ় সত্য কথা যে, আল্লাহ তায়ালা প্রদত্ত গুরুদায়িত্ব বহন করার যোগ্যতা একমাত্র তাঁর কাছ থেকেই লাভ করা যায়, আর সে যোগ্যতা হাসিল করার জন্যে সেই সময়েই তাঁর সাথেই নিবিড় সম্পর্ক স্থাপন করা প্রয়োজন যখন সুসুপ্ত রজনীর কোমল পরশে গভীর মগ্ন অন্যান্য সব মানুষেরা।

এ সময়ের নামাজ কোন সাধারণ নামায নয়, এ হলো পরম প্রিয়ের দরবারে হাজির হয়ে নিঃশেষে নিজেকে তাঁর কাছে সোপর্দ করে তার সস্নেহ পরশ অনুভব করা। এ এমন এক পরশ যা বিমুগ্ধ হৃদয়ে এনে দেয় এমন এক প্রশান্তি যা তাকে আবেগাপ্লুত করে, তার অনুভুতিকে দান করে অভুতপূর্ব এক আনন্দ যার ছোয়াচ থেমে যাক বা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাক এ যেন সে চাইতে পারে না। তাই তারই কারণে মহা প্রেমময় আল্লাহ তায়ালা তাকে নিয়ন্ত্রন করেছেন এ কথা বলে, “না সারা রাত জেগো না, তোমার শরীরেরও কিছু হক আমি দিয়েছি। সে হক আদায় করাও তোমার দায়িত্ব।” অতএব কিছু সময় তুমি বাকি রাখো নিদ্রার জন্য “। এতে বুঝা যাচ্ছে নবী করীম (সাঃ) রাতের নামাজে যে মজা পেতেন । তাকে প্রদত্ত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে যে শক্তি পেতেন. তা তাঁকে নামায হইতে বিচ্ছিন্ন হতে দিতে চাইতো না। এই কারণে আল্লাহ তায়ালা ঈমানদারদেরকে কঠিন সংগ্রামের দুঃসহ ও কষ্টকর সময়ে নামাযের জন্যে আদেশ করেছেন। ‘সবর ও সালাতের’ দিকে আকৃষ্ট করার পর পরই আল্লাহ তায়ালা আশ্বাস দিয়ে বলেছেন ,“নিশ্চয় আল্লাহ তায়ালা সবর এখতিয়ারকারীদের সাথে আছেন।” আল্লাহ তায়ালা সাথে আছেন বলতে বুঝায় অবশ্যই তিনি তাদের সাহায্য করতে রত আছেন, তাদেরকে দৃঢ়তা দিয়ে যাচ্ছেন এবং তাদেরকে শক্তি যুগিয়ে চলেছেন, আর রয়েছে তারা তাঁর একান্ত বাহু বন্ধনে। আরও বুঝা যায় যে সত্যের সংগ্রামে লিপ্ত থাকা অবস্থায় তিনি কখনও তাদেরকে নিঃসঙ্গ অবস্থায় ছেড়ে দেবেন না এবং যে কোনো সময় তাদের পথের সম্বল শেষ হয়ে গেলে সঙ্গে সঙ্গে তিনি তা যোগান দেবেন। ইসলামী জীবন ব্যবস্থা কায়েমের আন্দোলন সুদীর্ঘ হওয়া সত্বেও তিনি অবশ্যই তাদের সংকল্পে নিত্য নতুন প্রাণ সঞ্চার করতে থাকবেন। দেখুন কত স্নেহের সাথে আল্লাহর তায়ালা আয়াতের শুরুতে তাদেরকে ডাক দিয়েছেন।

‘সবর’ এর গুরুত্ব ও মর্যাদা সম্পর্কে বেশ কিছু হাদীস পাওয়া যায় তন্মধ্যে নিম্নে কয়েকটি হাদীস নিম্নে পেশ করা হলো:

“খাব্বাব ইবনে আরিত” থেকে বর্ণিত, ‘আমরা আমাদের কঠিন অবস্থা রসুল্লাহ (সাঃ) – এর কাছে পেশ করে বললাম ইয়া রাসুল্লাহ, আপনি আমাদের জন্য কি আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করবেন না, আমাদের জন্যে কি আপনি আল্লাহর কাছে দোয়া করবেন না?’

তিনি তখন একটি খেজুরের ছিলকার বালিশে হেলান দিয়ে বসেছিলেন। বললেন, দেখো তোমাদের পূর্বে এমন অবস্থাও অতিক্রান্ত হয়েছে যে, কোনো ব্যক্তিকে ধরে এনে গর্ত খোঁড়া হয়েছে এবং তার মধ্যে তাকে গেঁড়ে দিয়ে তার মাথার উপরে করাত রেখে তাকে দ্বিখন্ডিত করা হয়েছে। কখনো এমনও হয়েছে যে লোহার চিড়নী দিয়ে কাউকে এমনভাবে আচড়ানো হয়েছে যে তার হাড় থেকে মাংস আলাদা হয়ে গেছে, তা সত্ত্বেও তারা ঈমান ত্যাগ করেনি। আল্লাহর কসম, আল্লাহ তায়ালা তাঁর দ্বীনকে পূর্ণত্ব দান করবেনই এবং সত্য এই জীবন ব্যবস্থাকে অবশ্যই বিজয়ী করবেন, এমন কি কোনো ঘোড়সওয়ার বা উষ্টারোহী সান্আ থেকে হাদরামউৎ পর্যন্ত (একাকী) ভ্রমন করবে কিন্তু আল্লাহ তায়ালা ছাড়া তার আর কাউকে ভয় করা লাগবে না। অবশ্য মেষপালের ওপর নেকড়ে বাঘের হামলার সম্ভবনা থাকবেই, কিন্তু তোমরা বড্ড ব্যস্ত হয়ে পড়ছো।’

“আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)” থেকে বর্ণিত তিনি বলেছেন আমি রাসুল (সা.) – এর দিকে তাকিয়ে আছি আর তিনি একজন নবীর কাহীনি বর্ণনা করছেন। ঘটনাটি এরকম যে, এক ব্যাক্তিকে তার স্বগোত্রীয় লোকেরা মারতে মারতে রক্তাক্ত করে দিয়েছে, আর সে বলছে, হে আমার রব, আমার জাতিকে আপনি ক্ষমা করে দিন, আসলে তারা তো সঠিক কথা জানে না তারা অবুঝ। (বোখারী, মুসলিম)

“ইয়্যাহ্‌ইয়া ইবনে আসাব” থেকে বর্ণিত: তিনি বলছেন যে, “নবী (সা:)-এর একজন প্রবীণ সাহাবীর কাছ থেকে শুনেছেন, রসুলুল্লাহ (সা:) বলেছেন, ‘ওই মুসলিম ব্যাক্তি, যে মানুষেল সাথে মেলামেশা করে এবং তাদের দেয়া কষ্টকে ধৈর্য সহকারে সহ্য করে, সে ওই ব্যাক্তি থেকে ভালো  যে মানুষের সাথে মিশেও না এবং মানুষে দেয়া কষ্টকেও সহ্যও করে না।”

সূত্র:

* ফী যিলালিল কুরআন

* মা’রেফুল কুরআন

সব সংবাদ