যুদ্ধকালীন সময়ে মানসিক উদ্বেগের কুরআনিক চিকিৎসা

(১) প্রাপ্ত বয়স্ক ও সক্ষম পুরুষদেরকে ইসলামি শরীয়ত জামাআতের সাথে নামাজ আদায়ের নির্দেশ দিয়েছে। ফরজ নামাজের জামাআত পরিত্যাগ করা থেকে হুঁশিয়ার করে দেয়া হয়েছে। যদি অন্ধ ব্যক্তিকেও হয়, তথাপি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জামাত তরক করার অনুমতি দেননি। বরং যারা জামাতে নামাজ আদায় করে না তাদেরকে জ্বলিয়ে দেয়ার ইচ্ছাও তিনি ঘোষণা করেছেন। পাক কালামে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন: وَإِذَا كُنتَ فِيهِمۡ فَأَقَمۡتَ لَهُمُ ٱلصَّلَوٰةَ فَلۡتَقُمۡ طَآئِفَةٞ مِّنۡهُم مَّعَكَ
আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন-
আর আপনি যখন তাদের মধ্যে অবস্থান করবেন তারপর তাদের সাথে সালাত কায়েম করবেন তখন তাদের একদল আপনার সাথে যেন দাঁড়ায় এবং তারা যেন সশস্ত্র থাকে। তাদের সাজদা করা হলে তারা যেন তোমাদের পিছনে অবস্থান করে; আর অপর একদল যারা সালাতে শরীক হয়নি তারা আপনার সাথে যেন সালাতে শরীক হয় এবং তারা যেন সতর্ক ও সশস্ত্র থাকে। কাফেররা কামনা করে যেন তোমরা তোমাদের অস্ত্রশস্ত্র ও আসবাবপত্র সম্বন্ধে অসতর্ক হও যাতে তারা তোমাদের উপর একেবারে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে। যদি তোমরা বৃষ্টির জন্য কষ্ট পাও বা পীড়িত থাক তবে তোমরা অস্ত্র রেখে দিলে তোমাদের কোনো দোষ নেই; কিন্তু তোমরা সতর্কতা অবলম্বন করবে। আল্লাহ কাফেরদের জন্য লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি প্রস্তুত রেখেছেন। সূরা নিসা; ৪:১০২
যখন তুমি তাদের মধ্যে থাকবে। অতঃপর তাদের জন্য সালাত কায়েম করবে, তখন যেন তাদের মধ্য থেকে একদল তোমার সাথে দাঁড়ায়। [সূরা আন-নিসা:১০২]
(২) হযরত আবু হুরায়রা (রা:) থেকে বর্ণিত এক হাদীসে এসেছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, মুনাফিকদের ওপর সব থেকে ভারি নামাজ হলো এশা ও ফজরের নামাজ। আর যদি তারা জানতো এ দুটোয় কি রয়েছে, তবে তারা হামাগুড়ি দিয়ে হলেও এ দুটোয় অংশ নিত। আর নিশ্চয় আমি ইচ্ছা করেছি, যে নামাজের ব্যাপারে নির্দেশ দেব, অতঃপর তা দাঁড় করানো হবে। এরপর আমি এক ব্যক্তিকে নির্দেশ দেব মানুষদেরকে নিয়ে নামাজ পড়তে। আর আমি কিছু লোক সংগে নিয়ে বের হয়ে যাবো, যাদের সাথে জ্বালানি কাঠের বোঝা থাকবে। অতঃপর এমন লোকদের কাছে যাব, যারা জামাতের সাথে নামাজ পড়তে আসে না। এরপর আমি তাদেরকে ভিতরে রেখেই তাদের বাড়ি-ঘর জ্বালিয়ে দেব। (মুত্তাফাকুন আলাইহি- বুখারী ও মুসলিম)
(৩) উল্লেখিত অন্ধ ব্যক্তি-বিষয়ক হাদীস, যাকে মসজিদে আনা- নেয়ার জন্য কেউ ছিল না। অতঃপর সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে অনুমতি প্রার্থনা করল। উত্তরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, «তুমি কি আযান শুনতে পাও? লোকটি বলল, হ্যাঁ, পাই। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তাহলে তুমি সাড়া দাও। (মুসলিম)
আরও পড়ুন:
(৪) হযরত ইবনে মাসউদ (রা:) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি আগামীকাল আল্লাহর সাথে মুসলমান হিসেবে সাক্ষাৎ করতে আগ্রহী, সে যেন এই নামাজগুলো সংরক্ষণ করে যেখানে এর আযান দেয়া হয়। আল্লাহ তাআলা তোমাদের নবীর জন্য হিদায়েতের নিয়মনীতি শরীয়তভুক্ত করেছেন। আর এগুলো সে হিদায়েতের নিয়মনীতির অন্তর্ভুক্ত। এতএব তোমরা যদি ঘরে নামাজ পড় যেভাবে এই পিছিয়ে-থাকা ব্যক্তি ঘরে নামাজ পড়ে, তবে তোমরা তোমাদের নবীর আদর্শ ছেড়ে দিলে। আর তোমরা যদি তোমাদের নবীর আদর্শ ছেড়ে দাও তাহলে অবশ্যই গোমরাহ হয়ে যাবে। যখন কোনো ব্যক্তি পবিত্রতা অর্জন করে, অতঃপর সুন্দরভাবে অজু করে এই মসজিদগুলোর যেকোনো একটিতে যায়, আল্লাহ তার প্রতি পদক্ষেপের বিনিময়ে একটি নেকী লিখে দেন, একটি মর্যাদা বাড়িয়ে দেন এবং একটি গুনাহ মাফ করেন। আমরা দেখতে পেরেছি যে, জামাতে নামাজ আদায় থেকে মুনাফিক ব্যক্তিই পিছিয়ে থাকে, যার নিফাক সবার কাছে জানা। আর এমনতো সময় ছিল, যখন কোনো ব্যক্তিকে অন্য দুই ব্যক্তি সাহায্য করে ধরে ধরে নিয়ে আসত এবং কাতারের মাঝে দাঁড় করিয়ে দিত। (মুসলিম)
জামাআতের সাথে নামাজ আদায়ের ফজিলত
(১) মহান আল্লাহ তায়ালার প্রতি ঈমানের সূত্রে যারা পরস্পরে ভাই ও বন্ধুতে পরিণত হয়েছে, তাদের পরস্পরে পরিচিতি লাভ। তাদের মাঝে মহব্বত ও ভালোবাসা জোরদার করে তোলা; কেননা আল্লাহ তাআলার প্রতি ঈমানের সূত্র ধরে পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা ও মহব্বত সৃষ্টি না হলে ঈমান এবং জান্নাত লাভের আশা করা অবান্তর।
(২) আর যে ব্যক্তি লাগাতার চল্লিশ দিন তাকবীরে তাহরিমা পেয়ে জামাতের সাথে নামাজ আদায় করতে সক্ষম হলো, সে জাহান্নাম ও নিফাক থেকে নিষ্কৃতি লাভে সক্ষম হলো। আনাস (রা:) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, যে ব্যক্তি জামাতের সাথে তাকবীরে উলা পেয়ে চল্লিশ দিন নামাজ আদায় করল, তার জন্য দুটি নিষ্কৃতি লিখে দেয়া হলো, একটি হলো জাহান্নাম থেকে নিষ্কৃতি, অপরটি হলো নিফাক থেকে পরিত্রাণ। (তিরমিযী)
(৩) মুসলমানদের মাঝে বিভিন্নতার অবসান ঘটিয়ে সংঘবদ্ধতা গড়ে তোলা এবং উত্তম ও ভালো কাজের প্রতি তাদের সকলের হৃদয় আকৃষ্ট করা।
(৪) মুসলমানদের মধ্যে পারস্পরিক সাহায্য সহযোগিতার মনোভাব জোরদার করা।
(৫) মুসলমানদের অন্তরসমূহ একসূত্রে বেঁধে দেয়া; কেননা একই কাতারে সাদা কালো, আরবি-আজমি, আবাল-বৃদ্ধ, ধনী-গরীব কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এক কাতারে এক ইমামের পিছনে, একই সময়ে, এক কিবলাকে সামনে নিয়ে দাঁড়িয়ে যায়।
(৬) আল্লাহর শত্রুদেরকে রোষান্বিত করা; কেননা মুসলমানরা যতদিন মসজিদে নামাজ আদায়ের ব্যাপারে যত্নবান থাকবে ততদিন তারা শক্তিমান ও সুরক্ষিত হয়ে কালযাপন করতে সক্ষম হবে।
(৭) গুনাহ মাফ হওয়া এবং দরজা বুলন্দ হওয়া। আবু হুরায়রা রাযি. বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আমি কি তোমাদেরকে এমন বিষয়ের পথ দেখাব না, যার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা গুনাহসমূহ মাফ করে দেন এবং দরজা বুলন্দ করেন? তারা বললেন, নিশ্চয় দেখাবেন হে আল্লাহর রাসূল! তিনি বললেন, কষ্ট সত্ত্বেও উত্তমরূপে অজু করা, মসজিদ পানে অধিক পদচারণা, এক নামাজের পর অন্য নামাজের অপেক্ষায় থাকা। এটাই হলো রিবাত তথা আল্লাহর ইবাদতে নিজেকে আবদ্ধ করে রাখা।(মুসলিম)
(৮) একা নামাজ পড়ার তুলনায় জামাতের সাথে নামাজ পড়ার ছাওয়াব সাতাশগুন বেশি। আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাযি. বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, জামাতের সাথে নামাজ আদায় একা নামাজ আদায়ের চেয়ে সাতাশগুন বেশি ফজিলতপূর্ণ। (বুখারী)