যুদ্ধকালীন সময়ে মানসিক উদ্বেগের কুরআনিক চিকিৎসা

সাহাবায়ে কেরামের দৃঢ় ঈমানের ঘটনাবলি হাদীস, সীরাত ও তারীখের কিতাবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। তাঁদের গোটা জীবনই ছিল অটল ঈমানের প্রতিচ্ছবি। ইবাদত-বন্দেগী, লেনদেন, চলাফেরা, আখলাক-চরিত্র...সর্বত্র ছিল তাঁদের সুন্দর ঈমানের ছাপ। এখানে আমরা হযরত আবু বকর (রা:) একটি ঘটনা উল্লেখ করবো।
সাহাবায়ে কেরামের জন্য মক্কার জীবন ছিল অগ্নি পরীক্ষা। কারণ যে বা যারা ইসলাম বকুল করতেন মক্কার কাফেররা তাঁর উপর অমানুষিক নির্যাতন চালাতো। কাফেরদের অত্যাচার থেকে কেউই নিরাপদ থাকেনি; এমনকি স্বয়ং নবীজীও নন। তাদের নির্যাতনের কারণে ইবাদত-বন্দেগী করা তো দূরের কথা, ঈমান নিয়ে বেঁচে থাকাই দায় ছিল।
সর্বশ্রেষ্ঠ উম্মত আবু বকর (রা:) একবার হাবাশায় হিজরতের উদ্দেশ্যে মক্কা থেকে বের হন। পথিমধ্যে মক্কার এক প্রভাবশালী নেতা ইবনুদ দাগিনার সঙ্গে দেখা হল। ইবনুগ দাগিনা জিজ্ঞাসা করল, আপনি কোথায় যাচ্ছেন? আবু বকর (রা:) বললেন, আমার সম্প্রদায় আমাকে বের করে দিয়েছে। আমি এখন ইচ্ছে করেছি, শহর-নগরে ঘুরব আর আল্লাহর ইবাদত করব। সে বলল, আপনার মত মানুষ মক্কা ছেড়ে চলে যেতে পারেন না এবং আপনার মত মানুষকে বের করে দেওয়া যায় না। আপনি নিঃস্বকে সাহায্য করেন। আত্মীয়তা রক্ষা করেন। অক্ষমের বোঝা বহন করেন। মেহমানদারি করেন। দুর্যোগে মানুষকে সাহায্য করেন। আমি আপনাকে আশ্রয় দেব। আপনি ফিরে যান এবং নিজ শহরে গিয়ে আপনার প্রতিপালকের ইবাদত করুন।
হযরত আবু বকর রা. মক্কা ফিরে এলেন। ইবনুদ দাগিনা কুরাইশের নেতাদের বলল, আবু বকরের মত মানুষ মক্কা ছেড়ে চলে যেতে পারেন না এবং তার মত মানুষকে বের করে দেওয়া যায় না। আপনারা কি এমন লোককে বের করে দিচ্ছেন, যিনি নিঃস্বকে সাহায্য করেন, গরিব এতিমের পাশে দাড়ান।
কুরাইশ নেতারা ইবনুদ দাগিনার এ প্রস্তাব মেনে নিল। কিন্তু তারা ইবনুদ দাগিনাকে বলল, তুমি আবু বকরকে বলে দাও, সে যেন নিজের ঘরে ইবাদত করে। নামায পড়ে এবং যত খুশি তিলাওয়াত করে। তবে তা দ্বারা যেন আমাদের কষ্ট না দেয় এবং প্রকাশ্যে না করে। কারণ প্রকাশ্যে করলে আমাদের স্ত্রী-পুত্ররা ফেতনায় পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা হয়।
ইবনুগ দাগিনা কথাগুলো আবু বকর রা.-কে জানিয়ে দিল। আবু বকর (রা:) নিজের ঘরেই ইবাদত করতে থাকেন। ঘর ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ্যে নামায ও তিলাওয়াত করতেন না। কিছুদিন পর তাঁর মনে অন্য এক খেয়াল এল। তিনি ঘরের আঙিনায় নামাযের জায়গা করে সেখানে নামায ও তিলাওয়াত করতে লাগলেন। কাফেরদের স্ত্রী-সন্তানরা সেখানে ভিড় জমাতে শুরু করে। তারা মুগ্ধ হয়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকত। আবু বকর (রা:) কোমল হৃদয়ের ছিলেন। তিলাওয়াতের সময় চোখের পানি ধরে রাখতে পারতেন না।
বিষয়টি কুরাইশ নেতাদের পেরেশানির কারণ হলো। তারা ইবনুগ দাগিনাকে ডেকে বলল, আমরা এই শর্তে তোমার নিরাপত্তা বহাল রেখেছিলাম যে, সে নিজের ঘরে ইবাদত করবে। কিন্তু সে তা অমান্য করে ঘরের আঙিনায় নামাযের স্থান করে সেখানে নামায ও তিলাওয়াত করছে। আমাদের আশঙ্কা হয়, এতে আমাদের স্ত্রী-পুত্ররা ফেতনার শিকার হবে। তুমি তাকে বল, সে যদি নিজের ঘরে ইবাদত করে তবে ঠিক আছে। কিন্তু প্রকাশ্যে করলে যেন তোমার নিরাপত্তা ফিরিয়ে দেয়। ইবনুগ দাগিনা আবু বকর (রা:) কে তা জানালে তিনি বললেন-
“আমি তোমার নিরাপত্তা ফেরত দিচ্ছি। আমি আল্লাহ তাআলার নিরাপত্তায় সন্তুষ্ট।” -সহীহ বুখারী
শত্রুর চতুর্মুখী হুমকি সত্ত্বেও নিরাপত্তার আশ্রয় ফিরিয়ে দেওয়া তো তাঁদের পক্ষেই সম্ভব, যাদের রয়েছে রব্বুল আলামীনের আশ্রয়ের প্রতি পূর্ণ ঈমান ও ভরসা।