Dawatul Islam | শিশুদের সহিত মহানবীর আচরণ

মঙ্গলবার, ১৯, মে, ২০২৬ , ৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

শিশুদের সহিত মহানবীর আচরণ
১৮ আগস্ট ২০২২ ১০:১৩ মিনিট

ছেলের দল ও মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম 

হযরত আনাস [রা:] বলেন, একদিন আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে পথ চলছিলাম। পথের পাশে একদল ছেলে খেলা করছিলো। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের কাছে থেমে গেলেন এবং সালাম জানালেন। পথ চলার সময় অন্যদেরকে বিশেষ করে শিশুদেরকে সালাম জানানো মহানবীর অভ্যাস ছিলো। সামুরা ও মহানবী সা্ঃ হযরত জাবের ইবনে সামুরা [রা:] তার বাল্যকালের একটি ঘটনার বর্ণনায় বলেন, ছোট সময় আমি একদিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পেছনে নামাজ আদায় করছিলাম। নামাজ শেষ করে মহানবী ঘরের দিকে অগ্রসর হন। আমিও তাঁর পিছে পিছে যেতে শুরু করি। কিছু পথ অতিক্রম করার পর হঠাৎ একদল শিশু এসে মহানবীকে ঘিরে ধরে। আমিও তাদের সঙ্গে যোগ দেই। তিনি সব শিশুকে আদর করেন, মুসাফাহা করেন, মাথায় হাত বুলান। (বর্ণনাকারী বলেন) আমাকেও তিনি আদর করেন।

উম্মে কায়েসের পুত্র ও মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম

একদিন রাসুলুল্লাহ সা্ঃ খানা খাওয়ার জন্যে বসেন। খানা তখনও শুরু করেননি। উম্মে কায়েস বিনতে মুহসিন [রা:] তার শিশু পুত্রকে কোলে করে মহানবীর সাথে দেখা করতে আসেন। শিশুটিকে দেখে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খানা ছেড়ে তার দিকে চলে আসেন, পরম আদরে শিশুটিকে কোলে তুলে নিয়ে খাবারের স্থানে গিয়ে বসলেন। শিশুটি নবীর আদর পেয়ে তাঁর কোলেই পেশাব করে ভিজিয়ে দেয়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুচকি হাসেন, চেহারা মুবারকে বিরক্তির লেশমাত্র প্রকাশ পায়নি। তিনি পানি আনার জন্য একজনকে ডাকেন। পানি আনা হলে যে যে জায়গায় পেশাব পড়ে, সেখানে পানি ঢেলে দেন।

উটের পিঠে দু‘শিশু ও মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম

একদিন দু‘শিশু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উষ্ট্রির উপর উঠে বসেছে। একজন তাঁর সামনে অপরজন পিছনে। যে শিশুটি সামনে বসে, সে পিছনের শিশুটিকে বলে, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সামনে বসেছি, আর তুমি পিছনে। পিছনে বসে থাকা শিশুটি মহানবীকে দু‘হাত দিয়ে ধরে বলে, আমিতো নবীর গায়ের সঙ্গে মিশে আছি। সামনের শিশুটি তখন মহানবীর বুকের দিকে হেলান দিয়ে বলে, আমি নবীর গায়ে হেলান দিয়ে বসে আছি। এবার পিছনের শিশুটি তার ছোট্ট হাত দিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জড়িয়ে ধরে বলে, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দু‘হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরেছি। সামনের শিশুটি এবার বলার জন্য কিছু পায়নি। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার পিঠে হাত রাখলেন, শিশুটি আরো আনন্দিত হয়।

মদিনার শিশু ও মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম

হিজরতের পর ক্লান্ত পরিশ্রান্ত মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাজির হন মদিনার উপকণ্ঠে কুবা পল্লীতে। মদিনা মুনাওয়ারার নারী, পুরুষ ও শিশু নির্বিশেষে সকলেই তাঁকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্যে বিভিন্ন জায়গায় ভীর করে। কেউ কেউ গাছের উপর চড়েও তাঁর উট কাসওয়াকে দেখার চেষ্টা করে। একই উটের পিছনে বসেন সিদ্দিকে আকবর হযরত আবু বকর [রা:]। তাদেরকে পথ চিনিয়ে আনেন আব্দুল্লাহ বিন উরাইকিত। যিনি একজন অমুসলিম ছিলেন। মক্কার কাফিরদের ১০০টি উট পুরস্কারের ঘোষণায় অনেকেই মহানবীকে ধরিয়ে দেয়ার অপচেষ্টা করে, কিন্তু ব্যর্থ সবাই হয়। কুবায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বনি আম গোত্রের কুলসুম ইবনে হাদাম এবং সাদ ইবনে খাইসামার অতিথি হন। কুবায় প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চৌদ্দদিন অবস্থান করে মদিনায় যাত্রা করেন। সেদিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুবা ত্যাগ করে মদিনার দিকে অগ্রসর হয়ে বানুনা উপত্যকায় বনি সালেম ইবনে আওফ মহল্লায় তাশরিফ আনেন এবং ঐ মহল্লায় জুমুয়ার নামাজ আদায় করেন। এটাই ছিল ইসলামের ইতিহাসে প্রথম জুমুয়ার নামাজ। মদিনার বয়স্ক নারী-পুরুষের সাথে শিশুরাও প্রিয় নবীকে দেখার জন্যে পথের পাশে ভীর করে।

“আল্লাহু আকবার”, “রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এসেছেন”, “আল্লাহু আকবার, মুহাম্মদ এসেছেন”, “আল্লাহু আকবার, “আল্লাহু আকবার, জান্নাতের নেয়ামত মদিনায় এসেছেন,“শান্তির দূত আমাদের মাঝে এসেছেন,” এসব কথা বলে তাঁর জন্য অপেক্ষমান জনতা আনন্দ প্রকাশ করতে থাকে। রাসুলুল্লাহ সা্ঃ এর উটনী ‘কাসওয়া’ বনি মালিক ইবনে আন নাজ্জারের দু‘জন এতিম বালক সুহাইল ইবনে আমার [রা:] এবং সাহল ইবনে আমারের [রা:] উট বাঁধার এবং খেজুর শুকাবার স্থানে বসে পড়ে। এ দু‘ বালকের অভিভাবক ছিলেন আসাদ ইবনে জুবারা [রা:]। দশ স্বর্ণ মুদ্রা দিয়ে এই জমি ক্রয় করা হয়। কথিত আছে যে, এই স্বর্ণমুদ্রা হযরত আবু বকর [রা:] দিয়েছিলেন। অন্যান্যদের সাথে তাল মিলিয়ে শিশুরাও বলছিলো “ইয়া মুহাম্মদ! সালামু আলাইকা”, “ইয়া রাসুলাল্লাহ! সালামু আলাইকা”। শিশুদের সমবেত সুললিত কণ্ঠধ্বনি মহানবীর খুব ভালো লাগে। শিশুদের আনন্দে তিনিও আনন্দিত হন এবং উট থেকে তাদের কাছেই নেমে যান। তাদের হাত ধরেন, আদর করেন, মাথায় হাত বুলিয়ে দেন। বনি নাজ্জারের শিশুরাও কবিতা আবৃত্তি করে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে স্বাগতম জানায়।

“আমরা নাজ্জার গোত্রের মেয়ে, কি সৌভাগ্য আমাদের! মুহাম্মদ আমাদের প্রতিবেশি” এসব বলে তারা রাসুলকে খোশ আমদেদ জানায়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিশুদেরকে জিজ্ঞাসা করেন, তোমরা কি আমাকে পছন্দ করো? আমাকে ভালবাসো? শিশুরা আনন্দে আপ্লুত হয়ে জবাব দেয়, “অবশ্যই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। আমরা আপনাকে পছন্দ করি, আপনাকে আমরা ভালবাসি”। মহানবী মধুর হাসি দিয়ে তাদের দিকে হাত বাড়িয়ে দেন এবং বলেন, আমিও তোমাদেরকে পছন্দ করি, তোমাদেরকে ভালবাসি। আহ! কি জান্নাতি পরিবেশ, কি নয়নাভিরাম সে দৃশ্য!

খালেদ ইবনে সাঈদের শিশু কন্যা

জলিল কদর সাহাবী হযরত খালেদ ইবনে সাঈদ [রা:] রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দরবারে আসার জন্য ঘর থেকে বের হন, তার ছোট্ট মেয়েটি কান্না জুড়ে দেয়। কন্যা শিশুটিও মহানবীর দরবারে যাবে। শিশু কন্যার আবদার রক্ষা করার জন্য একটি লাল কাপড় পড়িয়ে তাকে নবীজির দরবারে আনা হয়। রাসুলুল্লাহ সা্ঃ শিশুটিকে দেখে খুশি হন এবং জামা কত সুন্দর বলে বাহবা দেন, আদর করে মেয়েকে রাসুলের কোলে বসান। শিশু মেয়েটি রাসুলের নবুওয়তি মোহরে ধরে টানাটানি করতে থাকে, জামার ভিতরে পিঠে হাত ঢুকিয়ে দেয়।

এদিকে খালেদ ইবনে সাঈদ এ অবস্থা দেখে রাগ করে মেয়েকে ধমক দেন। প্রিয়নবী তাকে শান্ত হতে বলেন এবং মেয়েটিকে বিরক্ত না করতে নিদের্শ দেন। পরবর্তী কোন এক সময়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে একটি ছোট চাদর আসে। চাদরের রং ছিল কালো। তার দুই পাশে ছিল সুন্দর আঁচল। চাদরে লতা, পাতা, ফুল ও ফলের বুনট ছিল। মহানবী চাদরটি তুলে ধরে জিজ্ঞাসা করেন- চাদরটি কাকে তিনি দিবেন? উপস্থিত সাহাবীগণ নিরব থাকেন, কোনকিছু না বলে শুধু হাসেন। তাদের মনের ধারণা হলো- রাসুলের যাকে ভালো মনে হয়, তাকেই তিনি দিবেন। বিষয়টি আঁচ করতে পেরে তিনিও হাসেন এবং বলেন- কেউ একজন খালেদ ইবনে সাঈদের মেয়েকে নিয়ে আসো। রাসুলুল্লাহ সা্ঃ বলার কথার সাথে সাথেই উক্ত মেয়েকে আনা হয়। সাথে তার দাদীও আসে।

মহানবী মেয়েটির গায়ে কালো চাদর পড়িয়ে দিয়ে এবং বলেন, এটি পড়তে পড়তে একেবারে পুরাতন করে ফেলো। ছোট্ট মেয়েটি চাদরখানা পেয়ে অত্যন্ত খুশি হয়। চাদরে যে লতা-পাতা, ফুল ফল ছিল মহানবী মেয়েটিকে সেগুলো দেখান এবং তার দাদীকে বলেন, দেখো দেখো খালিদের মা, “কত সুন্দর! কি চমৎকার এই সুন্দর লতা-পাতা এবং বুনট।”

দুই কন্যার মা

একদিন হযরত আয়েশা [রা:] এর ঘরে একজন মেয়েলোক আসে। মহিলার সাথে ছোট দু‘টি মেয়েও ছিল। সেদিন হযরত আয়েশা [রা:] এর ঘরে দেয়ার মতো কিছুই ছিল না। হযরত আয়েশা এদিক সেদিক তাকালেন কিছু পাওয়ার আশায়। দেখলেন ঘরের এক কোণায় মাটিতে একটি খেজুর পড়ে আছে। তা তুলে মুছে মহিলাকে দিলেন। মহিলাটি খেজুরটি দু‘ভাগ করে মেয়ে দু‘টিকে দিয়ে দিলেন, নিজে কিছুই খেলেন না। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘরে ফিরলে হযরত আয়শা [রা:] ঘটনাটি বর্ণনা করেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “আল্লাহ যে নারীকে সন্তানের প্রতি মমতা দান করেন, সে যদি তার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করে, সে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা পাবে”। -বুখারী

আবু উমায়ের ও মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম

হযরত আনাস [রা:] এর ছোট্ট শিশু ভাইটির নাম ছিল আবু উমায়ের [রা:]। তার লাল রঙের একটি পাখি ছিল। যা তিনি পালতেন। প্রায়ই তিনি পাখিটি নিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দরবারে আসতেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার পাখিটির খোঁজ খবর নিতেন। হঠাৎ একদিন পাখিটি মারা যাওয়ায় আবু উমায়ের খুবই শোকাবহ হয়ে পড়েন। পাখির কথা মনে হলেই তিনি কেঁদে ফেলতেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু উমায়েরের পাখি বিচ্ছেদের বেদনা ভুলে যাওয়ার জন্য বিশেষ একটি হেকমত অবলম্বন করেন। যাতে করে তার মন আর পাখির মধ্যে আটকে না থাকে। পাখি শব্দের আরবী ভাষার প্রতি শব্দ হলো নুগায়ের। উমায়ের ও নুগায়ের শব্দের মাঝে ছান্দিক মিল রয়েছে।

মহানবী উমায়ের এবং নুগায়ের দিয়ে কবিতার ছন্দ তৈরি করলেন, যার অর্থ হয়-

ওহে আবু উমায়ের!

কোথায় গেল তোমার নুগায়ের।

আবু উমায়ের ছন্দগত শ্লোকটি প্রিয়নবীর মিষ্ট কণ্ঠে শুনে পাখি মারা যাওয়ার দু:খ ভুলে হেসে দিতেন। সময়ের পরিবর্তনে আবু উমায়ের পাখি মরার শোক ভুলে গেলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পাখিটির বিষয়ে তার সঙ্গে কৌতুক করে বলতেন, হে আবু উমায়ের তোমার পাখিটি কোথায়? আবু উমায়ের হাসতে হাসতে জবাব দিতেন, মরে গেছে।

মৌসুমী ফল ও মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম

খেজুর বাগানের জন্য মদিনা অন্যতম। সাহাবীদের বাগানে ফল তোলা হলে অনেক সাহাবী নতুন ফল রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খেদমতে নিয়ে আসতেন। শিশুরা মজলিসে উপস্থিত থাকলে তিনি তাদের কাছে ডেকে সবচেয়ে ছোট্ট শিশুটির হাতে প্রথম একটি ফল তুলে দিয়ে ফল খাওয়ার উদ্বোধন করতেন।

সব সংবাদ